বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

উপলব্ধি থেকে উদ্যোগ

ফাইরুজ ফাইজা বিথারের স্কুল-কলেজ ছিল নিজ শহর খুলনায়। কলেজ পেরিয়ে ২০১৬ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য গিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ায়। সেখানকার ম্যাককোয়াইরি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিও হয়েছিলেন। কিন্তু মাকে ছাড়া দূর দেশে থাকেন কী করে! ছয় মাসের মাথায় ফিরে আসেন খুলনায়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন। ভর্তি হলেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স বিষয়ে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ার সময়ই ফাইরুজ খুলনায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক আয়োজিত ‘আমরা নতুন নেটওয়ার্ক’-এর প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছিলেন। এই প্রশিক্ষণ কর্মশালায় একটি সমস্যার লক্ষণ থেকে প্রধান সমস্যা নির্ধারণ করতে হয়। সেশন শেষে ফাইরুজদের ছোট ছোট দলে ভাগ করে স্থানীয় একটি সমস্যাকে বিশ্লেষণ করতে বলা হয়। এই ছোট দলগুলোর মধ্যেই একটি দলে ছিলেন ফাইরুজ ফাইজা বিথার, রাগিব শাহরিয়ার, আরিফ ইসলাম, মুহিব উল্লাহ ও মাহবুবুর রহমান। সেদিন সেই দলের সবাই একমত হন খুলনায় মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার অপ্রতুলতার ব্যাপারে। এভাবেই শুরু হয় মনের স্কুলের ভিত গড়ার কাজ। একদিন যা ছিল এক কিশোরীর জীবনের উপলব্ধি, তা-ই যেন হয়ে এল উদ্যোগ হয়ে।

ফাইরুজ বলেন, ‘বাবাকে হারানোর পর থেকে প্রতিটা মুহূর্তে বুঝতে পেরেছি একজন মানুষের কঠিন সময়গুলোতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা কত জরুরি। আর আমাদের খুলনায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা খুবই অপ্রতুল। তাই সেদিন এই সমস্যাই বেছে নিই আমরা।’

শুরু হলো মনের যত্ন

default-image

মনের স্কুলের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথমে ফাইরুজ ফাইজাদের ইচ্ছা ছিল খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় এবং খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) কয়েকটি বিভাগের সামনে একটি করে বাক্স বসানো। শিক্ষার্থীরা তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক সমস্যার কথা চিরকুটে লিখে সেখানে ফেলবেন। মনের স্কুল দলের সদস্যরা চিরকুট সংগ্রহ করে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে কাউন্সেলিং সুবিধা দেবেন।

কিন্তু ভাবনা তো সব সময় বাস্তবের রূপ পায় না। ফাইরুজরা দেখলেন এক রূঢ় বাস্তবতা। তাঁদের রেখে আসা অধিকাংশ বাক্সই খালি পড়ে থাকছে। অথচ অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে মানসিক চাপে থাকার কথা অবলীলায় বলেন, ফাইরুজও শোনেন ঘনিষ্ঠ মানুষদের একান্ত কথা। তিনি বুঝলেন, শিক্ষার্থীরা মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক সমস্যার কথা কাছের মানুষ ছাড়া কারও কাছে বলতে চান না। তাই অপরিচিত মানুষের পরামর্শ বা কাউন্সেলিং নিতে দ্বিধায় থাকেন।

এবার মনের স্কুলের সদস্যরা একটু ভিন্নভাবে ভাবলেন। ফাইরুজ বলেন, ‘চিকিৎসাক্ষেত্রে প্যারামেডিক নামে একটি ধারণা আছে। এই ধারণা অনেকটা এমন—একজন ব্যক্তিকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যেন তাঁর আশপাশে কেউ অসুস্থ হলে তিনি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দিতে পারেন এবং রোগীর অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে পারেন। আমরা সেটাই বেছে নিলাম।’

মনের স্কুলের সদস্যরা চিন্তা করলেন, যেহেতু শিক্ষার্থীরা তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক সমস্যা বা চাপের কথা কাছের মানুষদের কাছেই সাধারণত বলে থাকেন, তাই তাঁদের কাছের মানুষদেরই যদি প্রাথমিক পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাবিষয়ক কাউন্সেলিং বিষয়টি শেখানো যায়, তাহলে কেমন হয়? এই চিন্তা থেকে মনের স্কুল ২০১৯ সালে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ও কুয়েটের কিছু শিক্ষার্থীর জন্য প্যারাকাউন্সেলিং প্রশিক্ষণের আয়োজন করে। যেখানে অংশ নেন ২০ জন শিক্ষার্থী। ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে তাঁদের কার্যক্রম। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে মনের স্কুলের ক্যাম্পাস দূত হিসেবে যুক্ত আছেন ৩০ জন শিক্ষার্থী। প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী ও তরুণকে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দিয়েছেন তাঁরা। এ ছাড়া অন্তত ১০০ জনকে অভিজ্ঞ কাউন্সেলরের সাহায্য নিতে উদ্বুদ্ধ করেছেন এবং যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছেন।

করোনাকালে মনের খবর

ফাইরুজের মনের স্কুলের কার্যক্রম যেন নতুন মাত্রা পেল ২০২০ সালে। করোনা মহামারি শুরু হলো। মানুষ ঘরবন্দী হয়ে পড়ল। আলোচিত বিষয়ে পরিণত হলো মানসিক স্বাস্থ্য। ঘরে থাকার দিনে মনের স্কুলও কৌশল বদলাল। অনলাইনে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করল প্রতিষ্ঠানটি। এখনো প্রতিদিন ১০ জন প্যারাকাউন্সেলর বর্তমানে মনের স্কুলের প্রশিক্ষণ নিয়ে সক্রিয় আছেন, যাঁরা সম্পূর্ণ বিনা খরচে মানুষকে প্রাথমিক কাউন্সেলিং সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। মানসিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে ফাইরুজ ও তাঁর দল ফেসবুক গ্রুপে প্রশ্ন-উত্তর পর্ব শুরু করেছে। বর্তমানে গ্রুপটির সদস্যসংখ্যা প্রায় ১০ হাজার।

এল স্বীকৃতি

মানুষের মনের খবর রাখে ফাইরুজ ফাইজা বিথারের মনের স্কুল। সুস্বাস্থ্য ও মানুষের ভালো থাকার বিষয়টি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের (এসডিজি) একটি। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যাঁরা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ও মানুষের উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন, দাতব্য প্রতিষ্ঠান বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন তাঁদের ‘গোলকিপার্স গ্লোবাল গোলস’ পুরস্কারের মাধ্যমে প্রতিবছর সম্মানিত করে। এবার সেই সম্মাননার ‘চেঞ্জমেকার অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন বাংলাদেশের ফাইরুজ। ২১ সেপ্টেম্বর বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে ফাইরুজের নাম ঘোষণা করা হয়। তিনি ছাড়াও তিনটি শ্রেণিতে জাতিসংঘের নারী শাখার সাবেক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল এবং নির্বাহী পরিচালক ফুমজিলে মলাম্বো নকুকা, কলম্বিয়ার জেনিফার কলপাস ও লাইবেরিয়ার সাট্টা শেরিফ এই পুরস্কার পেয়েছেন।

বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের মতো প্রতিষ্ঠানের বৈশ্বিক এই স্বীকৃতি যে ফাইরুজের স্বপ্নকে নতুনতর উচ্চতায় নিয়ে গেছে, তা সেদিন তাঁর সঙ্গে কথা বলার সময় অনুভব করছিলাম।

লেখক: আমরা নতুন নেটওয়ার্কের সাবেক প্রকল্প সমন্বয়ক

প্র ছুটির দিনে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন