ফুল বিজু, মূল বিজু আর গোজ্যেপোজ্যে দিনের কথা

চৈত্র মাসের শেষ দিনকে চাকমা সম্প্রদায়ের আমরা বলি মূল বিজু। এর আগের দিনকে ফুল বিজু, আর পয়লা বৈশাখ পরিচিত গোজ্যেপোজ্যে দিন হিসেবে। এ দিন কেউ কোনো কাজ করে না, পাড়ায় ঘুরে বেড়িয়ে দিনটি পার করে।

বাংলা বছরের শেষ দুই দিন ও নববর্ষের প্রথম দিন বিজু পালন করা হয়। চাকমা সম্প্রদায়ে বিজু আদিকাল থেকেই চলে আসছে। বিজু মানে আনন্দ, হইহুল্লোড়, বিজু মানে দল বেঁধে ঘুরে বেড়ানো। বিজু মানে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সৃষ্টি করা, সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করা, সর্বোপরি বিজু মানে হলো মিলনমেলা।

পার্বত্য অঞ্চলের প্রতিটি সম্প্রদায় বিভিন্ন সময় বিভিন্ন উৎসব পালন করে। তবে বিজু উৎসব সবাই একই সময় পালন করে। বিজু প্রতিটি সম্প্রদায়ের কাছে আলাদা নামে পরিচিত। আমরা বলি বিজু, মারমারা বলে সাংগ্রাই, ত্রিপুরারা বলে বৈসুক। শহরাঞ্চলে যা ‘বৈসাবি’ নামে পরিচিত। ত্রিপুরাদের বৈসুক থেকে ‘বৈ’, মারমাদের সাংগ্রাই থেকে ‘সা’, আর চাকমাদের বিজু থেকে ‘বি’, এককথায় ‘বৈ-সা-বি’ নামে পরিচিতি পেয়েছে শহুরে জীবনে।

বিজ্ঞাপন
default-image

ফুল বিজুর দিনে খুব ভোরে উঠে ফুল তুলে নদীতে ভাসিয়ে দিই। সারা বছরের সব দুঃখ-কষ্ট ভুলে গিয়ে নব উদ্যমে বছর শুরু করার প্রত্যয় নিয়ে আমরা প্রার্থনা করি। এরপর শুরু হয় বিজুর ধুম। বিজুর আমেজ শুধু আমাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এ দিন আমরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে গৃহপালিত পশুপাখিদের খাবার দিয়ে থাকি, বিশেষ করে হাঁস-মুরগিকে ধান খেতে দিই। নদীতে ফুল ভাসানোর পর আমরা ঘর সাজিয়ে থাকি হরেক রকম ফুল দিয়ে। তারপরই গ্রামের বৃদ্ধদের স্নান করিয়ে দিই। এতে আমাদের বন্ধন দৃঢ় হয় এবং অশেষ পুণ্য সঞ্চিত হয় বলে জানি।

মূল বিজুর দিনে আমাদের প্রধান আকর্ষণ হলো পাজন। পাজন মূলত অনেক রকম সবজির মিশ্রণে তৈরি করা তরকারি। আমরা ৩২ রকম সবজি দিয়ে এটি রান্না করি। বিজুর দিন সাত ঘরের পাজন খাওয়া একটা প্রথা। প্রচলিত আছে, সাত ঘরের পাজন খেলে নাকি কোনো অসুখ আমাদের আক্রমণ করতে পারে না। বিজুর দিনে আমরা সবার বাড়িতে যাই। কারণ, বিজুর দিন কেউ কাউকে নিমন্ত্রণ করে না, যদিও আজকাল নিমন্ত্রণের রীতিও চলে আসছে। একে-অপরের বাড়িতে বেড়ানোর ফলে আমাদের সম্পর্ক গভীর হয়। মূলত বিজু আমাদের সামাজিক হওয়ার প্রেরণা জোগায়। এদিন পাজনের পাশাপাশি চালের আটার পিঠা বানানো হয় আর পানীয়স্বরূপ জগরা তৈরি করে পরিবেশন করা হয়।

এরপর গোজ্যেপোজ্যে। মানে পয়লা বৈশাখ। এদিন সবাই বিহারে গিয়ে সব জীবের প্রতি মৈত্রী ও মঙ্গল কামনা করি। কেউ–বা ঘরে ধর্মীয় গুরুকে ডেকে মঙ্গলসূত্র শ্রবণ করেন। এদিন নতুন চালের ভাত ও মাছ-মাংস দিয়ে ভোজন সারা হয়। বিশ্বাস করা হয়, এদিন যদি ভোজন ভালো হয়, তাহলে পুরো বছরের ভোজনে কোনো রকম কমতি হবে না।

এই তিন দিন সন্ধ্যায় ঘরের মূল খুঁটির সামনে, নদী এবং গৃহপালিত পশু-পাখিদের সামনে মোমবাতি প্রজ্বলন করা হয়।

এই আমাদের বিজু, এই আমাদের প্রধান উৎসব।

বিজ্ঞাপন
প্র ছুটির দিনে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন