জঙ্গলের ভেতর এমন খুপরিতেই আশ্রয় হয়েছে অভিবাসীপ্রত্যাশী মানুষদের
জঙ্গলের ভেতর এমন খুপরিতেই আশ্রয় হয়েছে অভিবাসীপ্রত্যাশী মানুষদেরআরাফাতুল ইসলাম/ডয়চে ভেলে

কতইবা বয়স হবে ছেলেটার? আঠারো কি বিশ বছর। তাঁর নিরীহ চেহারায় ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। ক্যামেরার ব্যাগ গোছাতে গোছাতেই আড়চোখে তাঁকে দেখছিলাম। কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছেন। কিছু বলছেন না। বসনিয়ায় তিন দিনের সফরের শেষ দিন। গাড়িতে কিছু হালকা খাবার অবশিষ্ট ছিল। একটা চকলেট তাঁর হাতে দিয়ে জানতে চাইলাম, ‘গেম মারছ (সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা)?’

‘হ্যাঁ’ সূচক উত্তর দিলেন তিনি। তবে জানালেন, ক্রোয়েশিয়া ঢুকতে পারেননি। উল্টো প্রায় ৩৭ কিলোমিটার পথ হেঁটে ফিরতে হয়েছে। পথে তেমন কিছু খাওয়াও হয়নি। জঙ্গলের শিবিরে ফিরে খাবার খুঁজবেন।

তাঁর নাম মনে নেই, তবে ছবি তুলেছিলাম কয়েকটা, সেগুলো রয়ে গেছে। তিন দিনে তাঁর মতো অসংখ্য বাংলাদেশিকে দেখেছি বসনিয়ার ভেলিকা ক্লাদুসায়। ক্রোয়েশিয়া সীমান্ত থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে থাকেন তাঁরা। এক পাহাড়ের ঢালে প্লাস্টিকের খুপরিতে কোনোরকমে ঘুমানোর ব্যবস্থা করে নিয়েছেন ছয় শতাধিক বাংলাদেশি। প্রায় সবার বাড়ি সিলেটে। তাদের দেখলে নেহাত দরিদ্র পরিবারের সন্তান মনে হয় না। বরং পোশাকে, চলনে মধ্যবিত্তের ছাপ স্পষ্ট। গড়পড়তায় পনেরো থেকে আঠারো লাখ টাকা খরচ করে বাংলাদেশ থেকে বসনিয়া অবধি এসে আটকে গেছেন তাঁরা। এই পথ পেরোতে কারও লেগেছে কয়েক মাস, কারও কয়েক বছর।

বিজ্ঞাপন
default-image

বন থেকে ভেলিকা ক্লাদুসা

তাঁদের দুর্দশার কথা জানতে, জানাতে জার্মানি থেকে বসনিয়ায় গিয়েছিলাম গত ১৭ অক্টোবর। ফিরেছি ২০ অক্টোবর। করোনাকালে সেই যাত্রাও এক ইতিহাস। জার্মান প্রতিষ্ঠানগুলোতে করোনাবিষয়ক বিধিনিষেধ বেশ কড়াভাবে মানা হয়। সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলেও ব্যতিক্রম নয়। তবে শরণার্থী বিষয়টি জার্মানির আন্তর্জাতিক এই সম্প্রচারকেন্দ্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই অনুমতি মিলতে বেগ পেতে হয়নি। সমস্যা হয়েছে অন্যত্র। বিদেশিদের বসনিয়া প্রবেশের ক্ষেত্রে করোনার নমুনা পরীক্ষা বাধ্যতামূলক। সেই পরীক্ষা করাতে হবে দেশটিতে প্রবেশের আগের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে। এর ব্যত্যয় হলে প্রবেশ করা যাবে না।

ওদিকে জার্মানিতে সাধারণত করোনা পরীক্ষার ফলাফল তিন দিনের আগে পাওয়া যায় না। তবে কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম আছে। সেই ব্যতিক্রমী পথে নমুনা পরীক্ষা করিয়ে ফল হাতে পাওয়ার পর বসনিয়া পৌঁছাতে সময় অবশিষ্ট ছিল ৩৬ ঘণ্টার মতো।

জার্মানির বন থেকে বসনিয়ার ভেলিকা ক্লাদুসার দূরত্ব প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার। সহকর্মী অনুপম দেব কানুনজ্ঞসহ অফিসের গাড়ি নিয়েই যাত্রা করলাম। জার্মানি থেকে অস্ট্রিয়া, স্লোভেনিয়া, ক্রোয়েশিয়া অতিক্রম করে পৌঁছাতে হবে বসনিয়ায়। সমস্যায় পড়লাম ক্রোয়েশিয়া-বসনিয়া সীমান্তে এসে। ঘণ্টাখানেক আমাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো—কেন যেতে চাই, কোথায় যেতে চাই, সঙ্গে কী আছে, যা আছে সব নিয়েই আবার ফিরব কি না—এসব নানা কথা জানতে চেয়েছে সীমান্ত পুলিশ। শেষমেশ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফেরার শর্তে রাজি করিয়ে আমাদের প্রবেশ করতে দেওয়া হয়েছে।

শরণার্থীদের সন্ধানে

বসনিয়ার ভেলিকা ক্লাদুসা ছোট্ট শহর, বাসিন্দা হাজার চল্লিশেক। শহরে প্রবেশ করতেই দেখলাম, আমাদের দেশের মতোই রাস্তায় অসংখ্য নেড়ি কুকুর ঘুরে বেড়াচ্ছে। শহরটাতে আভিজাত্যের কোনো ছাপ নেই। তবে ঠান্ডা ছিল বেশ। রাতের খাবারটা হোটেল নিচেই এক রেস্তোরাঁয় সারলাম।

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ বসনিয়ায় ভোরে ঘুম ভাঙল আজানের ধ্বনিতে। সকাল সকাল শরণার্থীদের খোঁজে যাত্রা করলাম। শহরের এক পাশে দক্ষিণ এশীয় আশ্রয়প্রার্থী, আরও সহজ করে বললে বাংলাদেশি, পাকিস্তানি এবং আফগানদের দেখা মিলতে বেশি সময় লাগল না। পশ্চিম বসনিয়ার পাহাড়ি শহরটির প্রধান সড়কের এক পাশ ধরে মাথা নিচু করে হাঁটতে দেখলাম কয়েকজনকে, হাতে হলুদ রঙের বাজারের ব্যাগ। তাদের কাছে জিজ্ঞাসা করতেই জানালেন, আরও খানিকটা গেলে একটি শরণার্থীশিবির চোখে পড়বে। তবে সেই শিবিরের ভেতরের চেয়ে বাইরে দক্ষিণ এশীয় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সংখ্যা বেশি। শিবিরের পাশের এক পাহাড়ের ঢালে রয়েছেন অনেক বাংলাদেশি।

বিজ্ঞাপন
default-image

ঘরছাড়াদের দুঃখগাথা

পাহাড়ের সেই অস্থায়ী বাসিন্দাদের অধিকাংশই বয়সে তরুণ। তাঁদের প্লাস্টিকের খুপরিতে সোজা হয়ে বসারও উপায় নেই, দাঁড়ানোর তো প্রশ্নই আসে না। সেখানে নেই বিদ্যুৎ, পানি কিংবা শৌচাগারব্যবস্থা। রাতে মোমবাতি জ্বালিয়ে আলোর ব্যবস্থা করেন তাঁরা। জঙ্গলের একাংশ ব্যবহার করেন প্রাকৃতিক কর্ম সারতে। পাহাড়ের নিচের একটা নালায় কাপড় ধোয়া, গোসল করা হয়৷

খাবারদাবারের আয়োজন নিজেদেরই করতে হয়। এ জন্য দেশ থেকে নানাভাবে টাকা আনেন কেউ কেউ। এক শ ইউরো আনালে হাতে পান আশি ইউরো। বাকিটা হুন্ডি চক্র নিয়ে নেয়। সেই টাকায় সুপারমার্কেট থেকে চাল, ডাল কিনে জঙ্গলে খড়ি জ্বালিয়ে রান্না হয়। সবার আবার টাকা আনার সাধ্য নেই। যারা পারেন না, তাঁরা চেয়েচিন্তে খান কিংবা অপেক্ষায় থাকেন কখনো কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা বা স্থানীয়দের। কালেভদ্রে আন্তর্জাতিক কিছু সংস্থা তাঁদের খাবার দেয়। এমনই খাবার, যা খেয়ে অভ্যস্ত নয় দক্ষিণ এশীয়রা।

প্রথম দিন সেই জঙ্গলের খবর প্রকাশের পর অবশ্য জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা আইওএম এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নকে (ইইউ) বেশ সক্রিয় হতে দেখেছি। পরদিন জঙ্গলের ছয় শ বাসিন্দার জন্য স্লিপিং ব্যাগ এবং খাবার নিয়ে কয়েকটি গাড়ি হাজির হয়েছিল। সবাই পেয়েছিলেন সেই স্লিপিং ব্যাগ। জানতাম এই উদ্যোগ সাময়িক। তবু ভালো লেগেছিল যে প্রচণ্ড ঠান্ডার মধ্যে কিছুদিন অন্তত তাঁরা একটু শান্তিতে ঘুমাতে পারবেন।

সবচেয়ে খারাপ লেগেছে সেদিন বিকেলে। বসনিয়া-ক্রোয়েশিয়া সীমান্তে শরণার্থী ও অভিবাসনপ্রত্যাশীদের যে নির্মমভাবে পেটানো হয়, সে কথা শুনেছিলাম। কিন্তু সেদিন চোখের সামনে দেখলাম সেই নির্মমতার কিছু নমুনা। এক বাংলাদেশির সঙ্গে দেখা হলো, যাকে কিছুক্ষণ আগেই সীমান্তে নির্দয়ভাবে পেটানো হয়েছে। তাঁর কপাল দিয়ে রক্ত ঝরছিল। ক্ষতের মধ্য দিয়ে হাড় দেখা যাচ্ছিল আর সারা শরীরে ছিল পেটানোর দাগ।

এ রকম আরও কয়েকজন আহতকে তখন অ্যাম্বুলেন্স এবং আইওএমের গাড়ি এসে নিয়ে গিয়েছিল। এভাবে গুরুতর আহতরা দীর্ঘ মেয়াদে চিকিৎসার সুযোগ পান। সেই সময়টা তাঁরা আইওএম পরিচালিত শিবিরে থাকতে পারেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) গোটা বিশ্বে মানবাধিকার রক্ষার কথা বলে, অথচ তাদের সীমান্তেই এভাবে নির্যাতিত হচ্ছেন আশ্রয়প্রার্থীরা। নিজের চোখে না দেখলে হয়তো আমার পক্ষে বিশ্বাস করাই কঠিন হতো বিষয়টি। আশার কথা হচ্ছে, বিষয়টি ইইউর নজরে আনার পর তারা তদন্ত করবে বলে জানিয়েছে। জোটটির সীমান্তে কোনো আশ্রয়প্রার্থীকে এভাবে পেটানোর নিয়ম নেই, বরং কেউ আশ্রয় নিতে চাইলে সেটির কারণ জানতে এবং সেই ব্যক্তি আসলেই আশ্রয় পাওয়ার উপযুক্ত কি না, তা যাচাই করতে হবে। আর যাচাইবাছাইয়ের এই সময়টায় সেই ব্যক্তিকে ইইউভুক্ত কোনো এক দেশে আশ্রয় দিতে হবে। মোটা দাগে নিয়ম এটাই। বসনিয়া-ক্রোয়েশিয়া সীমান্তে সেই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটছে বলেই অভিযোগ আশ্রয়প্রার্থীদের।

default-image

উন্নত জীবনের টানে

কেন বাংলাদেশিরা এভাবে বিপৎসংকুল পথ পাড়ি দিয়ে ইতালি, ফ্রান্স, পর্তুগালসহ ইউরোপের দেশগুলোতে প্রবেশ করতে চাচ্ছেন—এই প্রশ্ন করেছি অনেককে। কারও কারও কাছে বিষয়টি পুরোপুরি অর্থনৈতিক। তাঁরা নিজের এবং পরিবারের উন্নতির আশায় এভাবে ইউরোপমুখী হয়েছেন। ক্ষেত্রবিশেষে মানব পাচারকারীদের মিষ্টি কথায় প্রলুব্ধ হয়েছেন তাঁরা। তবে কেউ কেউ এটাও জানিয়েছেন, রাজনীতি করায় মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে তাঁদের, ফলে দেশে থাকার বা কিছু করার মতো পরিস্থিতি আর নেই।

বসনিয়ায় আশ্রয় নেওয়া এই মানুষেরা যেকোনো মূল্যে ইউরোপীয় দেশে প্রবেশ করতে চান। এ জন্য সুযোগ পেলেই তাঁরা পুলিশের পিটুনি, কুকুরের কামড়ের ভয় উপেক্ষা করে সীমান্ত পাড়ি দিতে রওনা হন। তাঁদের ভাষায় এই চেষ্টাকে বলে ‘গেম মারা’। কেউ দু–চারবার গেম মেরেই পৌঁছে যেতে পারেন ইতালি, পর্তুগাল কিংবা ফ্রান্সে। কেউ কেউ বিশ-ত্রিশবার গেম মেরেও ব্যর্থ। তবু আশায় থাকেন, কোনো একদিন হয়তো খুলবে ভাগ্যের চাকা।

লেখক: সাংবাদিক, ডয়চে ভেলে

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0