বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

দিনাজপুরের ফুলবাড়ী থেকে ভারতের শিলিগুড়ি সবচেয়ে কাছে, তাই ভিসা করানোর সময় আমরা সবাই সে পথই দিয়েছিলাম। সীমান্ত পার হয়ে একটা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ঠিক করে চলে এলাম হোটেল সেন্ট্রাল প্লাজার সামনে। সময় নষ্ট না করে তাড়াতাড়ি একটি জিপ রিজার্ভ করলাম মানেভাঞ্জন পর্যন্ত। দশে মিলে জিপে গেলে বেশ খরচ বাঁচানো যায়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আমরা টাকার দিকে না তাকিয়ে সময় বাঁচানোর চিন্তা করলাম।

আমাদের গাড়ি সীমানা শুখিয়া পোখারি হয়ে যখন মানেভাঞ্জন পৌঁছাল, তখন বিকেল গড়িয়ে তিনটা। হোটেলে ব্যাকপ্যাক রেখে দৌড় দিলাম ট্যুরিস্ট এন্ট্রি পয়েন্টে পাসপোর্ট এন্ট্রি করাতে। এর বিপরীত পাশেই সোসাইটি ফর হাইল্যান্ডার গাইডস অ্যান্ড পোর্টারস ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের কার্যালয়। এখান থেকে গাইড নিতে হবে, যা বাধ্যতামূলক। যথাসম্ভব তৈরি হয়ে মানেভাঞ্জনের আশপাশটা ঘুরতে বের হলাম।

মানেভাঞ্জন শব্দটা নেপালি। নেপাল-ভারত সীমান্তবর্তী ছোট পাহাড়ি গ্রাম মানেভাঞ্জন, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা ছয় হাজার ফুটের ওপরে। ট্রেকিং ও পর্যটন এই এলাকার মানুষের আয়ের প্রধান উৎস। বেশ কিছু ছোট দোকান আছে এই এলাকায়। চা খুঁজতে খুঁজতে কখন যে নেপালে ঢুকে পড়েছি, বুঝতে পারিনি। কোনটা নেপাল আর কোনটা ভারত, বোঝা মুশকিল। হোটেলে ফিরে প্রচণ্ড উত্তেজনা নিয়ে বিছানার কোলে ঢলে পড়লাম। কখন শুরু হবে আমাদের বহুল প্রতীক্ষিত সান্দাকফু ট্রেক। আদৌ পারব কি না, ১০ হাজার ফুটের ওপরে শরীর কেমন প্রতিক্রিয়া করবে, এই সব চিন্তা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়লাম। পরদিন সকাল থেকে শুরু হবে স্বপ্ন পূরণের দিকে পথচলা।

default-image

সিঙ্গালিলা এলাকা যা এখন দার্জিলিংয়ের অন্তর্গত, সিকিম রাজার কাছ থেকে কিনে নিয়েছিল ব্রিটিশরা ১৮৮২ সালে এবং সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করে এবং ১৯৯২ সালে সিঙ্গালিলাকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করে পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হয়।

পথ কমানোর উদ্দেশ্যে ট্রেকিংয়ের পথ ধরে এগোতে থাকলাম। এতে পথ কিছুটা সংক্ষিপ্ত হলেও কষ্ট গেল বেড়ে। গাড়ির পথের চেয়ে বিকল্প পথটা বেশি খাড়া মনে হলো। পাইনবনের মাঝে সূর্যের আলোর মনোমুগ্ধকর লুকোচুরি খেলা দেখতে দেখতে আঁকাবাঁকা, কখনো উঁচু, কখনো নিচু পথ ধরে হেঁটে দেড় ঘণ্টার ভেতরে চিত্রে নামের গ্রামে পৌঁছে গেলাম।

চিত্রে (৮ হাজার ৩৪০ ফুট উচ্চতায়) এসে মেঘ আর রোদের লুকোচুরি মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখতে থাকলাম আর সব কষ্টের কথা বেমালুম ভুলে গেলাম। গ্রামটি বেশ ছোট। অল্প কিছু নেপালি পরিবার আর একটি ছোট আশ্রম নিয়ে এই সুন্দর গ্রাম। ভাগ্য আর আবহাওয়া দুটোই যদি ভালো থাকে, তাহলে চিত্রে থেকেই কাঞ্চনজঙ্ঘা রেঞ্জের চমৎকার ভিউ পাওয়া যায়। ভাগ্য আমাদের সহায় হলো না এখানে আর দেরি না করে পথচলা শুরু করলাম। প্রায় এক ঘণ্টা হাঁটার পর পৌঁছে গেলাম নেপালি পাহাড়ি গ্রাম লামেয়াধুরায়।

লামেয়াধুরা চিত্রে থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে ৮ হাজার ৭৯২ ফুট উচ্চতায়। আসলে এই ট্রেকে যত গ্রাম আছে, এক কালোপোখারি ছাড়া সবই ছোট। লামেয়াধুরাও অল্প কিছু তিব্বতি পরিবার বসবাসকারী ছোট গ্রাম। গ্রামের ভেতর দিয়ে রাস্তাটা চলে গেছে, ওইটাই ভারত-নেপালের সীমানা নির্ধারণকারী। অনেক ট্রেকারকে এখানে বিরতি নিতে দেখলেও আমরা এখানে সময় নষ্ট না করে মেঘমার দিকে এগোতে থাকলাম।

মানেভাঞ্জন থেকে ৯ কিলোমিটার দূরে নেপাল-ভারত সীমান্তে অবস্থিত ছোট্ট গ্রাম মেঘমা। এ গ্রামটি মোটামুটি সব সময়ই মেঘের চাদরে ঢাকা থাকে। মেঘমা নামটা এসেছে মেঘ থেকেই। মেঘমা ঢোকার আগে মেঘ-কুয়াশাঢাকা গ্রামটি দেখতে বেশ সুন্দর লাগে। এখান থেকে পথ দুভাগে ভাগ হয়ে গেছে। সোজা গাড়ি চলার রাস্তাটি চলে গেছে তংলু হয়ে তুমলিং। বিকেলের একটু আগে আগে আজকের গন্তব্য তুমলিং পৌঁছে গেলাম।

মানেভাঞ্জন থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরে এবং ৯ হাজার ৬০০ ফুট উচ্চতায় তুমলিং। এখানে এসে আমাদের আজকের মতো যাত্রা শেষ হলো। হেঁটে এত উচ্চতায় এর আগে কখনো ওঠা হয়নি। এখানে এসে শেষ হলো স্বপ্নপূরণের প্রথম ধাপ। তুমলিংও নেপালি ছোট একটা গ্রাম। ১০ থেকে ১২টি নেপালি পরিবারের বাস এই ছোট গ্রামে। এই ট্রেকের পুরোটাই ভারত-নেপাল করে এগোতে হয়। কিন্তু উন্মুক্ত সীমান্ত হওয়ায় কোনো ঝামেলায় পড়তে হয় না।

রুমে ব্যাগ রেখে বাইরে রাস্তার বাঁ দিকে একটু উঁচু ভিউ পয়েন্ট আছে। ওখানে উঠে গেলাম সূর্যাস্ত দেখার জন্য। বেশ ভালোই বাতাস বইছে। বাতাসের কারণে ঠান্ডার প্রকোপ একটু বেশি অনুভূত হচ্ছে। পরিচয় হলো কলকাতা থেকে আসা এক দম্পতির সঙ্গে। কথায় কথায় জানা গেল, হুমায়ূন আহমেদ তাঁদের অনেক প্রিয় লেখক। দেখতে দেখতে সূর্য তার আলোকিত মুখ মেঘের আড়ালে লুকিয়ে ফেলল। সঙ্গে সঙ্গে কোথা থেকে একরাশ অন্ধকার সারা পাহাড়ে হামলে পড়ল। ঠান্ডাও মনে হয় সূর্য ডোবার অপেক্ষায় ছিল। এমনভাবে জেঁকে ধরল, বাইরে দাঁড়ানোর আর জো রইল না।

আকাশে এদিক-ওদিক কিছু মেঘ থাকা সত্ত্বেও সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে ভিউ পয়েন্টে এসে বসলাম। মেঘ ফুঁড়ে অল্প সময়ের জন্য উঁকি দিল কাঞ্চনজঙ্ঘা। ঘুমন্ত বুদ্ধ চোখের সামনে ভেসে উঠল, যদিও অতটা স্পষ্ট নয়। ভারতের মানুষের কাছে কাঞ্চনজঙ্ঘা পবিত্র পর্বত দেবতাদের বাসস্থান, মানুষের যাওয়া নিষিদ্ধ। এমনকি ভারতীয়দেরও কাঞ্চনজঙ্ঘা অভিযানে যেতে হয় নেপাল হয়ে।

একঝলকে যতটুকু দেখলাম, অতৃপ্ত নয়নের ক্ষুধা আরও বাড়িয়ে দিল। কী আর করা, সান্দাকফু আমাদের নিরাশ করবে না, এই আশা নিয়ে আজকের যাত্রার প্রস্তুতি নিলাম।

তুমলিং থেকে সান্দাকফুর দূরত্ব ১৯ কিলোমিটার। তাই সময় নষ্ট না করে পথে নেমে গেলাম। প্রায় ১ কিলোমিটার পরই সিঙ্গালিলা পার্কের গেট। এখানে মানেভাঞ্জন থেকে নেওয়া অনুমতিপত্র দেখাতে হলো। গাইরিবাসে গিয়ে নাশতা করব ঠিক করলাম।

গাইরিবাসে এসে মনে হলো মেঘের সমুদ্রে ডুবে গেলাম। পাহাড়ের ওপর দিয়ে বাতাসের সঙ্গে বয়ে আসছিল সারি সারি মেঘের দল। মেঘেরা গায়ে লাগতেই ঠান্ডায় প্রায় জমে যেতে হয়। তাড়াতাড়ি ডাউন জ্যাকেট বের করে গায়ে জড়িয়ে নিলাম। মেঘ এমনভাবে জমাট বেঁধে আছে, একজন আরেকজনকে দেখতে পাচ্ছিলাম না। আশপাশে কিছু না দেখা গেলেও টুংটাং ঘণ্টার ধ্বনি কানে বাজতে থাকল। শব্দটা খুব দূরে, তা-ও মনে হচ্ছিল না। একটু সামনে এগোতেই দৃষ্টিসীমানার ভেতরে চলে এল বড়সড় সাইজের এক চমরি গাই। ওর গলায় যে ঘণ্টা বাঁধা, তার শব্দই এতক্ষণ কানে আসছিল। এখানে এসে প্রথম চমরি গাইয়ের দেখা পেলাম, তার মানে ১০ হাজার বা তার চেয়ে বেশি উচ্চতায় উঠে গেছি। এসব গাই নাকি সাধারণত ১০ হাজার ফুটের নিচে বসবাস করে না।

মেঘেদের ওপর ভর করে আবার শুরু হলো আমাদের যাত্রা। পা যেন আর চলছিল না, এক পা-দুই পা হাঁটার পরই বিশ্রাম নিতে হচ্ছে। একটু সামনেই বিখেভাঞ্জন, এখানেই বিষাক্ত একোনাইট উদ্ভিদ জন্মায়। বিখেভাঞ্জন অর্থ বিষাক্ত উপত্যকা। এখান থেকেই প্রতিনিয়ত সত্যিকারের হাঁটুর জোরের পরীক্ষা দিয়ে ওপরের দিকে উঠতে হবে। কারণ, সান্দাকফু পর্যন্ত একটানা খাড়া উঠে যেতে হবে।

সেই জোরে বাতাস বইতে শুরু করেছে। কাছাকাছি কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে বলে এমন মনে হচ্ছিল। বাতাসের সঙ্গে মেঘ এসে পুরোদস্তুর ভিজিয়ে দিচ্ছে। লম্বা সারি সারি পাইনগাছে মেঘেরা বাধা পেয়ে বৃষ্টি হয়ে টুপটুপ ঝরে পড়ছে। মেঘেদের তেড়ে আসার শব্দ আর ঝরে পড়ার শব্দ মিলে স্বর্গীয় সুরের মূর্ছনা লিখে বা বলে বোঝানোর ক্ষমতা আমার নেই। এ শুধু অনুভব করা যায়। বিকেল গড়িয়ে গড়িয়ে সন্ধ্যায় এগিয়ে গেল, ঠিক এমন কোনো সময় সান্দাকফুর চূড়া স্পর্শ করলাম। মনের ভেতর স্বপ্ন ছুঁয়ে দেওয়ার যে আনন্দ-অনুভূতিতে ভরে গেল।

সকালে উঠে ভিউ পয়েন্ট চলে গেলাম কাঞ্চনজঙ্ঘা ম্যাসিফের ওপর সূর্যোদয় দেখার জন্য, যে উদ্দেশ্যে সারা দুনিয়ার অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় মানুষ এই ট্র্র্রেকে জড়ো হয়। আকাশের যে অবস্থা গতকাল রাত থেকে হয়ে আছে, তাতে কাঞ্চনজঙ্ঘা ম্যাসিফের ওপর সূর্যোদয় দেখার ন্যূনতম সম্ভাবনাও নেই। তারপরও আমরা উঠে প্রস্তুত হয়ে গেলাম, যাতে কোনো আফসোস না থেকে যায়। প্রচণ্ড বেগে ঠান্ডা বাতাস বইছে, কষ্ট করে দাঁড়িয়ে না থেকে ব্যর্থ হয়ে রুমে ফিরে গেলাম। আবার হয়তো আসতে হবে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে।

প্র ছুটির দিনে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন