বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

গরিবের অবস্থার উন্নতি

মহামারি এলে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা হয় স্বল্প আয়ের মানুষের। হালের কোভিড-১৯ মহামারিতেও তা দেখা গেছে। তবে এখন যতটা, আগে অবস্থা ছিল আরও খারাপ। ১৪ শতকে যখন ব্ল্যাক ডেথ মহামারিতে পুরো ইউরোপ তছনছ হয়ে গিয়েছিল, তখন গরিব মানুষের, বিশেষ করে দরিদ্র শ্রমিকের অবস্থার উন্নতি হয়েছিল। এই প্লেগ মহামারিতে অগণিত মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। ফলে কর্মক্ষম শ্রমিকের সংখ্যা কমে গিয়েছিল প্রচণ্ডভাবে। অর্থনীতির সূত্রমতে, জোগান কমলে চাহিদা বাড়ে। তাই ওই সময়ে শ্রমিকের চাহিদা উত্তুঙ্গ হয়েছিল। সেই সুযোগে বঞ্চনা ও শোষণের নিগড় ভাঙার উদ্যোগ নিয়েছিল শ্রমিকেরা। প্রতিবাদী হয়ে উঠেছিল শ্রমিকসমাজ। এতে করে ভূমি দাসব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থাও ক্ষয়ে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব রিচমন্ডের ইতিহাসের অধ্যাপক ডেভিড রাউট বলছেন, ব্ল্যাক ডেথের সময় ইউরোপের গ্রামাঞ্চলে কৃষিকর্মীরা কাজের শর্তাবলি নিজেদের অনুকূলে নিয়ে আসতে পেরেছিল। বেতনও বেড়েছিল। অন্যদিকে শহরাঞ্চলে প্লেগের ভয়াবহতা তুলনামূলক বেশি ছিল। শহরগুলোতে পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নতি হয়েছিল।

default-image

উন্নতি আসে রোগীর সেবায়

১৯১৮ সালে হয়েছিল স্প্যানিশ ফ্লু। এই মহামারিতে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। গবেষকেরা বলেন, স্প্যানিশ ফ্লুর কারণেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ দীর্ঘায়িত হতে পারেনি। কারণ, ওই সময় ফ্লু মহামারিতে সব পক্ষেই অনেক সৈন্যের প্রাণহানি হয়েছিল। এ কারণে কোনো পক্ষই আর সংঘাতের পথে থাকতে চায়নি।

স্প্যানিশ ফ্লুর কারণে ১৯২০-এর দশকে অনেক দেশের সরকারই প্রতিরোধকারী বিভিন্ন ধরনের ওষুধের ব্যবহার নিয়ে গবেষণা শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্রের হ্যারিসবার্গ ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ন্যান্সি মিম মনে করেন, ওই সময় রাশিয়া, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে কেন্দ্রীভূত স্বাস্থ্যব্যবস্থার সূচনা হয়। যুক্তরাষ্ট্র নিয়েছিল নিয়োগকর্তার মাধ্যমে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিমা প্রচলনের ব্যবস্থা। স্প্যানিশ ফ্লু মহামারির পুরো সময়টা জুড়েই ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশে এমন অসংখ্য ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের আডেলফি ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের অধ্যাপক কেলি রোনেইন বলেন, ওই মহামারির কারণে রোগীদের সেবাব্যবস্থায় অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছিল। আগে রোগীর যেসব ছোট ছোট স্বাস্থ্য জটিলতা এড়িয়ে যাওয়া হতো, তখন সেসবও আসে পর্যালোচনার অধীনে। একই সঙ্গে উন্নতি আসে টিকা উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও। ফলে হাম, রুবেলা, ম্যালেরিয়া, পোলিওসহ বিভিন্ন রোগের উন্নত টিকা তৈরি করা সম্ভব হয়।

বাসস্থান ও সুরক্ষাসামগ্রীর উন্নয়ন

মহামারির কারণেই মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রীর উন্নতি হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় মাস্কের কথা। বিভিন্ন সময়ের মহামারির কারণে মাস্কের বিবর্তন ঘটেছে। শুরুতে মাস্ক দেখতে ছিল পাখির চঞ্চুর মতো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়ে এটি বর্তমানের রূপে এসেছে।

১৬৬৫ সালে মারাত্মক বিউবোনিক প্লেগ মহামারি আকারে লন্ডনে ছড়িয়ে পড়েছিল। ওই সময়টায় আইসোলেশন, কোয়ারেন্টিন প্রভৃতিতে অভ্যস্ততা তৈরি হয়। রোগের ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে ‘লকডাউন’ ধারণার প্রবর্তনও হয় ওই সময়। ধীরে ধীরে আসে সামাজিক দূরত্ব রক্ষার ভাবনাও।

মহামারির কারণে বাড়ির নকশাতেও পরিবর্তন এসেছে ঢের। ১৯১৮ সালের মহামারির পর থেকে পশ্চিমা বিভিন্ন দেশের শহরাঞ্চলে পাশাপাশি বাড়ির মাঝে ফাঁকা স্থান রাখার চল চালু হয়। মূলত সংক্রামক রোগ যাতে বেশি ছড়াতে না পারে, সে জন্যই এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে স্থানীয় আইনেও পরিবর্তন আনা হয়েছিল।

default-image

শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে নতুন ঢেউ

মহামারির রূঢ় বাস্তবতা সব সময়ই বিশ্বের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির নতুন নতুন সৃষ্টিতে উৎসাহ জুগিয়েছে। ১৩৪৮ সালে ইতালির ফ্লোরেন্সে ছড়িয়ে পড়েছিল প্লেগ। তখন কবি ও লেখক জিওভান্নি বোকাচ্চো লিখেছিলেন কয়েকটি নভেলার একটি সংকলন দ্য ডেকামেরন তাতে ফুটে উঠেছিল মহামারির সময়কার বাস্তবতা। জগদ্বিখ্যাত ব্রিটিশ কবি, নাট্যকার ও অভিনেতা উইলিয়াম শেক্‌সপিয়ার একাধিকবার মহামারির কবলে পড়েছিলেন। ওই সময়কার বিউবোনিক প্লেগ ছিল ভয়ংকর। গবেষকদের বক্তব্য, ১৫৯২-৯৩ সালের মহামারির সময় বেশ কয়েকটি বিখ্যাত কবিতা লিখেছিলেন শেক্‌সপিয়ার। ধারণা করা হয়, ১৬০৩-০৪ সালের মহামারিতে তিনি লিখেছিলেন মেজার ফর মেজার সম্ভবত ১৬০৬ সালে যখন আবার বিউবোনিক প্লেগ মহামারি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল, তখন বাড়ি বসে কাটানো সময়টায় শেক্‌সপিয়ার লিখেছিলেন কিং লেয়ার। কাজ করেছিলেন ম্যাকবেথ ও অ্যান্টোনিও অ্যান্ড ক্লিওপেট্রা নিয়েও।

‘দ্য স্ক্রিম’, ‘ম্যাডোনা’, ‘ভ্যাম্পায়ার’, ‘দ্য ড্যান্স অব লাইফ’ প্রভৃতি চিত্রকর্মের জন্য বিখ্যাত নরওয়ের চিত্রশিল্পী এডভার্ড মুংখ। তিনি ১৯১৯ সালের শুরুর দিকে স্প্যানিশ ফ্লুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। শারীরিকভাবে একটু সামলে ওঠার পরপরই তিনি আঁকতে বসে যান। ওই সময়টায় নিজের প্রতিকৃতি আঁকায় মনোযোগ দিয়েছিলেন মুংখ। তখনকার ছবিগুলোতে মুংখকে দেখা গিয়েছিল ভীত মুখে, কৃশকায় রূপে। এই স্প্যানিশ ফ্লুর সময়টাতেই টি এস এলিয়ট লিখেছিলেন ওয়েস্ট ল্যান্ড একই মহামারিতে ভার্জিনিয়া উলফ লিখেছিলেন মিসেস ডলোওয়ে

তথ্যসূত্র: টাইম ম্যাগাজিন, হিস্ট্রি ডট কম, লাইভ সায়েন্স, বিবিসি, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, শেক্‌সপিয়ার অ্যান্ড বিয়ন্ড ডট ফোলজার ডট এডু ও দ্য ইকোনমিস্ট

প্র ছুটির দিনে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন