বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

মুত্রাহ সুকের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কটা বেশ গভীর। এখানকার প্রায় প্রতিটি দোকানেই কোনো না কোনো পদে একজন বাংলাদেশি আছেন। কেউ হয়তো দোকানের বিক্রেতা, কেউ মালিক। পর্যটকদের গায়ের রং দেখে তাঁরা হিন্দি, বাংলা, আরবি কিংবা ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে তাঁদের দোকান ঘুরে যেতে বলেন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলতেই থাকে দোকানিদের হাঁকডাক। এমনই একজন বিক্রেতা আবদুল হামিদ, চট্টগ্রাম অঞ্চলে বাড়ি। মুত্রাহ সুকের গল্প শোনাতে গিয়ে বলছিলেন, ‘ইউরোপের পর্যটকেরা এখানে আসেন দল বেঁধে। মাঝেমধ্যে দেখা যায়, এক দিনে পাঁচ–ছয়টি জাহাজ এসে ভিড়েছে বন্দরে। সেই দিন আমাদের দম ফেলার ফুরসত থাকে না। আর দেশি হলে বুঝে নিই যে আমাদেরই লোক।’

আবদুল হামিদ ‘আমাদের লোক’ বলতে চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষের কথা বলেছেন। ওমানজুড়ে এমন চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষের অভাব নেই। মাসকাটের রাস্তা দিয়ে হাঁটলেই ওমানের অধিবাসীর চেয়ে বাংলাদেশি মানুষের দেখা মেলে বেশি। খাবার দোকান, বিপণিবিতান, বৈদ্যুতিক পণ্যের দোকান, জুয়েলারির দোকানে প্রবাসী বাংলাদেশির সাক্ষাৎ মিলবেই। মাসকাটের মূল ব্যবসাকেন্দ্রের নাম রুয়ি। রুয়ির রাস্তা ধরে হাঁটলেও কোনো দোকানের নাম ইংরেজির সঙ্গে পরিষ্কার বাংলায় ‘বাংলাদেশ জুয়েলার্স’ লেখা দেখে তাই চমক লাগে না!

default-image

মাসকাটের বাংলাদেশিদের মধ্যে সিংহভাগই চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষ। লন্ডনে যেমন সিলেট অঞ্চলের মানুষের সংখ্যাটা বেশি, মাসকাটে চট্টগ্রামের। ভারতীয় ও পাকিস্তানিও আছেন প্রচুর। তবে গত কয়েক বছরে অভিবাসীদের সংখ্যায় ভারতীয় ও পাকিস্তানিদের ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ। ওমানের বাংলাদেশি কমিউনিটির মতে, আট লাখের মতো প্রবাসী বাংলাদেশি ওমানে বাস করেন। বাংলাদেশে আসা রেমিট্যান্সের দিক থেকে ওমানের অবস্থান তৃতীয়।

ওমানে বাংলাদেশি প্রবাসীর সংখ্যাটাও দিন দিন বাড়ছে। প্রবাসী অনেকের ভাষ্য, মধ্যপ্রাচ্যের অন্য রাষ্ট্রের চেয়ে ওমানের নাগরিকেরা ভালো, তাদের অনেকেই আধুনিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ। ওমানের বৈচিত্র্যময় প্রকৃতিই এর কারণ কি না, কে জানে। প্রকৃতিগতভাবে ওমান মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।

মধ্যপ্রাচ্য মানেই মরুর দেশ, এ কথাটা মাসকাট দেখলে ভুল মনে হবে। পাথরের পাহাড়, বালুর পাহাড়ের সঙ্গে ওমান উপসাগরের মিশেল যে একটা শহরকে কী অপরূপ করে তুলতে পারে, সেটি মাসকাট না দেখলে বোঝা কঠিন। এই যেমন মাসকাটের কুরুম সমুদ্রসৈকতে গেলে মনে হবে না যে আপনি মধ্যপ্রাচ্যে আছেন। ওমানের বাংলাদেশ দূতাবাসের ঠিক পাশ ঘেঁষে গেছে কুরুম সমুদ্রসৈকত। বিভিন্ন দেশের প্রবাসীরা সমুদ্রপাড়ের মনোরম বাতাস উপভোগ করতে এই সৈকতে আসেন। দেখে মনে হবে যেকোনো আন্তর্জাতিক শহরের সাগরপাড়ে এসেছি। সব জাতি, বর্ণ, ধর্মের মানুষের ভিড় জমে প্রতি বিকেলেই।

default-image

শহরের উত্তরে কানতাব সমুদ্রসৈকতের গল্প তো বলে শেষ করে যাবে না। পাহাড়ের কোলঘেঁষা পাথুরে সৈকতে সমুদ্রের নীল জলের আঘাতের দৃশ্য দেখলে যে কারও মন ভরে যাবে। বিকেল থেকেই কানতাব এলাকার জেলেরা স্পিডবোট নিয়ে সমুদ্রে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকেন। আঁধার নামতেই এক রাতের জন্য সমুদ্রে পাড়ি জমান জেলেরা। ভাগ্য ভালো থাকলে এক রাতেই বাংলাদেশি টাকায় দুই-তিন লাখ টাকার সামুদ্রিক মাছ ধরেন জেলেরা। শহরের রেস্তোরাঁগুলোতে সাগরের মাছের চাহিদাও অনেক।

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের জন্য ওমান সফরে আসা বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটাররা এই কানতাব সৈকতের পাড়ঘেঁষা এক হোটেলে ছিলেন। জৈব সুরক্ষাবলয়ের মধ্যে থেকে কানতাবের যতটুকু দেখা গেছে, তাতেই সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়েছেন ক্রিকেটাররা। এ ছাড়া মাসকাটের অন্য চেহারা খুব একটা দেখা হয়নি ক্রিকেটারদের। কানতাব থেকে এবারের বিশ্বকাপে নতুন ভেন্যু হিসেবে নাম লেখানো আল আমিরাত ক্রিকেট স্টেডিয়ামের পথটা যথেষ্ট দূরের। হোটেল থেকে মাঠে আসা–যাওয়ার সময়টায় টিম বাসের বন্ধ জানালা দিয়ে পাহাড়-পর্বত দেখা ছাড়া কিছুই করার ছিল না ক্রিকেটারদের।

তবে মাসকাটের রাস্তাঘাটও দেখার মতো। পাহাড়ের পেটের ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তা থেকে চোখ সরানো যায় না। এক প্রবাসী বাংলাদেশি জানান, এসব রাস্তা নাকি ২০ বছর আগেও ছিল না। পাহাড়ে ডিনামাইট ফাটিয়ে তৈরি করা হয়েছে এসব অবিশ্বাস্য হাইওয়ে।

default-image

ওমানের রাস্তার সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য দামি গাড়ি তো আছেই। ওমান যে তেলের টাকায় ধনী হওয়া দেশ, রাস্তায় নামলেই সেটি বোঝা যায়। গণপরিবহন চোখে পড়বে হাতে গোনা। মোটরবাইক, বাইসাইকেল, রিকশা—১১ দিনের মাসকাট ভ্রমণে এসব কিছুই চোখে পড়েনি। ব্যক্তিগত গাড়ি ছাড়া যেন ওমানে চলা দায়! অথচ দেশটিতে কোনো গাড়ি তৈরির কারখানা নেই। এত সব গাড়ি আসে বিদেশ থেকে। চাহিদার কারণে সরকার গাড়ি কেনায় কোনো কর রাখেনি। ওমানে বাংলাদেশি প্রবাসীদেরও একাংশ উন্নত জীবন যাপন করছেন।

সংখ্যাটা অবশ্য নেহাত কমই। প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে শ্রমিকের সংখ্যাই বেশি। করোনার সময়টা যাঁদের জীবনযাত্রা আরও কঠিন করে তুলেছে। অনেকেই প্রতি মাসে নির্দিষ্ট বেতন পেয়ে আসছিলেন। করোনার কারণে এখন বেতন দেওয়া হচ্ছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের হিসেবে। এক পাকিস্তানি রেস্তোরাঁর বাংলাদেশি বাবুর্চি আবদুল কাদের যেমন বলছিলেন তাঁর দুর্দশার কথা, ‘আমি এসেছি করোনার ঠিক আগে। তখন এখানে মানুষের ভিড়ে বসার জায়গা ছিল না। কিন্তু এখন সব ফাঁকা। আমি এখন পর্যন্ত ভিসার টাকাই তুলতে পারিনি। বাড়িতেও নিয়মিত টাকা পাঠানো হচ্ছে না। আমার মতো অবস্থায় আছেন আরও অনেকেই।’

তবে করোনা প্রকোপ কমে আসাতে কিছুটা হলেও স্বাভাবিকতার ছোঁয়া লাগছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জীবনে। তপ্ত রোদে দিন কাটানোর পর যেমন বিকেলে স্বস্‌তির হাওয়া বইতে শুরু করল সেদিন।

প্র ছুটির দিনে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন