বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image
রুমে ফিরে কয়েকটা কম্বল মুড়িয়ে শুয়ে পড়লাম। হোটেল–লাগোয়া একটি নদী আছে মনে হলো। উচ্ছল পাহাড়ি নদীর জলপ্রবাহের কলকল শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। সুখকর সেই শব্দ শুনতে শুনতে একসময় ঘুমিয়ে পড়লাম

ঝুলন্ত সেতুতে কিছুটা সময় কাটিয়ে মোটরসাইকেলে উঠে পড়লাম। নিঃশব্দ পথে কালিগণ্ডকী নদীর স্রোতের শব্দ ভেসে আসছিল। পানির শব্দ শুনতে শুনতে একসময় পৌঁছে গেলাম পাহাড়ি শহর বেণিতে। এই পথের সবচেয়ে বড় শহর বেণি। পোখারা থেকে প্রায় ৯২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। পথে বেণির পর পেট্রল পাম্প নেই, তাই আবারও ট্যাংক ভরে জ্বালানি নিলাম।

এদিকে আকাশে মেঘ জমেছে, শিগগিরই বৃষ্টির আশঙ্কা। মনে মনে চাইছিলাম, বৃষ্টি না আসুক। কারণ, বেণির পর থেকে পার্বত্য রাস্তা শুধু ওপরের দিকে উঠে গেছে, তার ওপর রাস্তা পুরোটাই কাঁচা এবং নির্মাণকাজ চলছে। কিন্তু আমার চাওয়ার কোনো কাজ হলো না। বেণি ছাড়িয়ে গলেশ্বর পৌঁছাতেই ঝুপ করে বৃষ্টি চলে এল। বাধ্য হয়ে চায়ের দোকানে আশ্রয় নিলাম। দেশের পুরি-শিঙারা-চপ বিক্রি করা হোটেলের মতো একটা দোকান। মুষলধারেই বৃষ্টি পড়ছিল, তাই চা পানের ফাঁকে রেস্টুরেন্টমালিকের কলেজপড়ুয়া ছেলের সঙ্গে আলাপ করছিলাম। মুস্তাং যাওয়ার কথা শুনে বেশ অবাক হলো সে। এই আবহাওয়ায় বাইকে যাচ্ছি শুনে তার চোখ যেন কপালে উঠল। সে উৎসাহী হয়ে জানাল, সামনের দিকে রাস্তা একেবারে যা-তা অবস্থা। সন্ধ্যায় এ পথে যাওয়া একেবারেই ঠিক হবে না।

আমরা যুবকের কথায় কান দিলাম না, অপেক্ষা করতে থাকলাম বৃষ্টি থামার। নেপালিরা বাংলাদেশিদের পছন্দ করে, কয়েক কাপ চা পান করলেও ছেলেটা আমদের কাছে মাত্র দুই কাপের দাম রাখল। বিদায় নেওয়ার সময় সে শুভকামনা জানাল।

default-image

গলেশ্বর থেকে রওনা হতেই বুঝলাম রাস্তা বেশ পিচ্ছিল। প্যাচপেচে কাদার মধ্যে পড়তে হলো। পাহাড়ের ঢালে নামতে গিয়ে দুবার পিছলে পড়তে গিয়েও রক্ষা গেলাম। পাহাড়ে মোটরসাইকেল চালানো খুব রোমাঞ্চকর, কিন্তু এদিন বৃষ্টি-কাদা আর রাস্তা নির্মাণের কাজ রোমাঞ্চকে যন্ত্রণাদায়ক করে তুলল। রাস্তার একপাশে খাড়া পাহাড় আরেক পাশে গভীর খাদ, তাই সাবধানে ধীরগতিতে চালিয়ে যেতে থাকলাম। কিছু দূর যেতেই খানিকটা ভালো রাস্তার দেখা পেলাম। সতর্কভাবে চালিয়ে যাচ্ছিলাম।

পাহাড়ি ছড়ার মতো একটা জায়গা যখন পৌঁছালাম, তখন যেন ঝুপ করে রাত নেমে গেল। চিন্তায় পড়ে গেলাম। কারণ, আরও বেশ খানিকটা যেতে হবে। অচেনা পথ, লোকালয় দূরে, গুগল ম্যাপ ঠিকমতো কাজ করে না!

তবে পথে কোনো বিপদ হলো না। রাত সাড়ে সাতটা নাগাদ তাতোপানি নামে এক গ্রামে পৌঁছালাম। এ পথে যারা আমাদের মতো ভ্রমণ করে, তাদের কাছে নামটা পরিচিত। তাতোপানিতে একটি গেস্ট হাউস খুঁজে নিলাম। আমাদের দেখে গেস্ট হাউসের তরুণ ব্যবস্থাপক খানিকটা বিস্ময় নিয়ে তাকালেন। তিনি ভারতের শিলিগুড়িতে লেখাপড়া করেছেন। ইংরেজিতে বেশ দক্ষ মনে হলো। ব্যস্ততার মধ্যেও বেশ খানিকক্ষণ সময় দিলেন, খাবার পরিবেশনের সময় আলাদা করে যত্ন নিলেন। রুমভাড়া আর রাতের খাবারের বিল স্থানীয় মানুষের দরে রাখলেন।

রুমে ফিরে কয়েকটা কম্বল মুড়িয়ে শুয়ে পড়লাম। হোটেল–লাগোয়া একটি নদী আছে মনে হলো। উচ্ছল পাহাড়ি নদীর জলপ্রবাহের কলকল শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। সুখকর সেই শব্দ শুনতে শুনতে একসময় ঘুমিয়ে পড়লাম।

default-image

সকালে ঘুম থেকে উঠে হাঁটতে বের হলাম। তাতোপানিতে নদীঘেঁষা উষ্ণ পানির দুটি চৌবাচ্চা আছে। বেশ কিছু মানুষকে সেখানে স্নান করতে দেখলাম। এই স্নানরত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই কাঠমান্ডু থেকে গাড়ি রিজার্ভ করে এসেছেন। নেপালিদের ধারণা, এই উষ্ণ পানিতে স্নান করলে অনেক রোগ সেরে যায়। হাত দিয়ে পানি ছুঁয়ে দেখালাম, বেশ গরম। সেখানে বেশি সময় নষ্ট না করে গ্রামটা ঘুরে দেখলাম।

ঝকঝকে রোদ মাথার ওপরে। সুন্দর সকালে শুরু হলো দ্বিতীয় দিনের যাত্রা।

তাতোপানি ছাড়াতেই দিগন্তে শুভ্র পর্বত দেখা দিল। আহ্‌, কী শোভা! নয়নাভিরাম দৃশ্যে চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু হাত যুদ্ধ করে যাচ্ছে বাইকের হ্যান্ডেলবারের সঙ্গে। এবড়োখেবড়ো রাস্তা, বড় বড় পাথরের চাঁই পেরিয়ে আমরা এগিয়ে চলতে চলতে একসময় বড় একটি ঝরনার পাশে দাঁড়ালাম। রাস্তার একপাশে ঝরনা, আরেক পাশে গভীর খাদ। ঝরনার পানি রাস্তা ওপর দিয়ে গড়িয়ে সেই খাদে গিয়ে পড়ছে।

ছোট-বড় পাথর মাড়িয়ে খাড়া ওপরের দিকে উঠে গেলাম। বেশি দূর যাওয়া গেল না। কাবরে নামের একটি জায়গায় রাস্তা বন্ধের কারণে দাঁড়াতে হলো। রাস্তা বন্ধ করে পাহাড় কেটে রাস্তা প্রশস্ত করা হচ্ছে। বেশ খানিকক্ষণ অপেক্ষার পর চলাচলের উপযোগী হলো। কাবরে থেকে সামান্য এগিয়ে মুস্তাংয়ের চেকপোস্ট, জায়গাটার নাম ঘাসা। স্থানীয় লোকজন চেকপোস্টে নাম-পরিচয় লিখেই চলে যাচ্ছিল, কিন্তু আমাদের ভেতরের অফিসে যেতে বলল অনুমতি নেওয়ার জন্য। অফিসে ঢুকতেই তরুণ অফিসার আমাদের অভিবাদন জানাল, ঝটপট নথিবদ্ধ করে নিল।

default-image

পাহাড়ি গ্রাম ঘাসা পেরিয়ে সামান্য যেতেই দৃষ্টিসীমা একটু বড় হতে লাগল, দৃষ্টিসীমায় পর্বতসারি আর চূড়ায় শুভ্র বরফের দেখা মিলল। সেই সঙ্গে বেশ ঠান্ডা অনুভূত হতে থাকল। বেহাল রাস্তা, পাহাড়ি নদী, পাথুরে বোল্ডারের ওপর দিয়ে মোটরবাইক চালিয়ে যেতে হচ্ছে। পাইনবনের মধ্য দিয়ে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে চলতে চলতে একসময় পৌঁছে গেলাম জমসম শহরে।

জমসমে ছোট একটা বিমানবন্দর রয়েছে। কিছু ভালো মানের হোটেলও রয়েছে। অনেকেই পোখারা থেকে ২০ মিনিটে উড়ে এসে এখান থেকে যাত্রা শুরু করেন। জমসম পেরিয়ে খানিক সামনে যেতেই বাতাস বেশ জোরে গায়ে লাগছিল। বাতাসের বেশ তেজ, বাইকের হাতল সোজা করে রাখতেই বেগ পেতে হচ্ছিল। নেপালে জনপ্রিয় একটি গান আছে ‘জমসুমাই বাজারমা বারাবাজে হাওয়া ছাড়ারা’, যার অর্থ হলো জমসম বাজারে ১২টা বাজলেই জোর হাওয়া বয়। গানের কথা যে অক্ষরে অক্ষরে সত্যি, তা এখানে না এলে হয়তো অজানাই থেকে যেত।

জমসম বাজার ছাড়িয়ে খানিকটা যেতেই গ্রাম পড়ল, রাস্তা লাগোয়া কয়েকটাই মাত্র বাড়ি। পাকা বাড়ি। ছাদের ওপর শীতকালে ব্যবহার করার জন্য শুকনো কাঠ স্তূপ করে রাখা। এদিকটার আবহাওয়া বেশ রুক্ষ, রুক্ষতার সঙ্গেই এখানকার মানুষের বসবাস। গ্রাম পেরিয়ে আরও খানিকটা যেতেই মারফা গ্রাম চলে এল। স্থানীয় ভাষায় ‘মার’ কথার অর্থ পরিশ্রমী, ‘ফা’ মানে লোকজন। মারফার লোকজন কিন্তু আসলেই খুব পরিশ্রমী। মারফা কিন্তু আপেলের জন্য বিখ্যাত। অনেকেই জমসমে রাত্রিবাস করেন, কিন্তু আমি বলব মারফায় থাকতে। মারফা অন্য রকম সুন্দর, জনবসতি খুব বেশি নয়। লোকালয়টা সামান্য ভেতরে, মূল সড়কের ধারে কেবল আপেলবাগান, সবজিখেত আর কয়েকটা হোটেল। চারদিকে পাহাড়ের মধ্যে কিছুটা ফাঁকা জায়গা ঠিক একটা উপত্যকার মতো। মারফার আপেলবাগান আর সাদা-গোলাপি ফুলে শোভিত রাস্তা দিয়ে চলতে লাগলাম। মুক্তিনাথ মন্দির দর্শন করে মারফাতে এসেই দ্বিতীয় রাতে থাকার পরিকল্পনা আমাদের।

default-image

প্রবল হাওয়ার মধ্যে চলতে চলতে অনিন্দ্যসুন্দর ন্যাড়া পর্বতের পাদদেশে চোখধাঁধানো গ্রাম কাকবেণি। আপার মুস্তাংয়ের প্রবেশপথ কাকবেণি ছবির মতো সুন্দর। ওপর থেকে দেখে এতই ভালো লাগছিল যে আরেকবার যদি যাই, তবে কাকবেণিতেই থাকব বলে ঠিক করলাম। কাকবেণির থেকে মুক্তিনাথের দিকে যাওয়ার ১৪ কিলোমিটার রাস্তা পাকা। রয়েল এনফিল্ড কাস্ট আয়রনে তৈরি বেশ ভারী একটা বাইক। ওপরে আমরা দুজন বসা। তার পরও বাতাসে প্রায়ই দোল খাচ্ছিল। এদিকটায় প্রবল বাতাস বয় বলেই জমসমের ফ্লাইটগুলো সব খুব সকালের দিকে উড্ডয়ন ও অবতরণ করে। বাতাসের কারণেই অনেকে মুক্তিনাথ যেতে সকালের দিকে যাওয়ার পরামর্শ দেন।

বাইক চালিয়ে চোখজুড়ানো পাহাড়-পর্বতের গা ঘেঁষে একসময় পৌঁছে গেলাম মুক্তিনাথ। মুক্তিনাথ মন্দির সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩ হাজার ৭৫০ মিটার উচ্চতায় থোরং লা পাসের পাদদেশে অবস্থিত। পৃথিবীতে সবচেয়ে উঁচুতে অবস্থিত হিন্দু মন্দিরগুলোর মধ্য অন্যতম এটি। বৌদ্ধদেরও পুণ্যভূমি এই মুক্তিনাথ। মুক্তিনাথ মন্দির দুটি ভিন্ন ধর্মের সহাবস্থানের এক জাজ্বল্যমান প্রতীক।

default-image

মন্দিরের পেছনের দিকে রয়েছে ১০৮টি গোমুখী জলধারা, যেখান দিয়ে অনবরত পানি পড়ে। মন্দিরের সামনে রয়েছে দুটি কুণ্ড বা চৌবাচ্চা। পুণ্যার্থীদের বিশ্বাস, ১০৮টি জলধারার নিচ দিয়ে গিয়ে প্রথম কুণ্ডে তিন ডুব আর দ্বিতীয়টাতে এক ডুব দিয়ে মন্দিরে পূজা দিলে সব পাপ মোচন হয়ে যায়। মুক্তিনাথ মন্দিরের কাছেই কালিগণ্ডকী নদীর গর্ভে পাওয়া যায় শালগ্রাম শিলা, যা ভগবান বিষ্ণুর প্রতীক হিসেবে সমগ্র হিন্দুসমাজের কাছে অত্যন্ত পবিত্র হিসেবে মান্য। মন্দির প্রাঙ্গণে সুবিশাল এক বৌদ্ধমূর্তিও সুরক্ষিত। মন্দির দর্শনে দুপুর গড়িয়ে বিকেল। আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হচ্ছে পরদিন বরফ পড়তে পারে। স্থানীয় লোকজনকে জিজ্ঞাসা করলাম। অনেকে জানাল, অস্বাভাবিক কিছু নয়, দিন চারেক আগেও তুষারপাত হয়েছে।

তুষারপাতের মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে বাইক চালাতে চাই না, তাই দ্রুত ফিরতি পথ ধরলাম। মনে মনে ঠিক করলাম, মারফায় নয়, যতটুকু পারি নিচের দিক গিয়ে নেমে যাব। সে পথেই এগোতে থাকলাম...

প্র ছুটির দিনে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন