default-image

কিছু স্মৃতি মানুষ নিজের ভেতর পুষে রাখে। কিছু স্মৃতি সঠিক শব্দমালার অভাবে মানুষ হয়তো প্রকাশও করতে পারে না। ডিয়েগো ম্যারাডোনার সঙ্গে দেখা হওয়ার অমূল্য স্মৃতিটুকু আমার কাছে সে রকম কিছু। যে অনুভূতি বছর দুই পরও আমি প্রকাশ করতে পারি না। এখনো আমার কাছে সেদিনের মুহূর্তটা অবিশ্বাস্য মনে হয়। ডিয়েগো ম্যারাডোনার মৃত্যুসংবাদ শুনে আবুধাবির সময়টায় যেন ডুবে আছি।

আমি তখন বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) ছাত্র। এই তো ২০১৮ সালের কথা। ডাক পেলাম ইউনিফায়েড ফুটবল দলের হয়ে খেলার। ইউনিফােয়ড ফুটবল দল হলো প্রতিবন্ধী ও শারীরিকভাবে সুস্থ ফুটবলারদের সমন্বিত দল। মোট ১৫ জনের দলে আটজন প্রতিবন্ধীর সঙ্গে সাতজন সম্পূর্ণ সুস্থ ফুটবলার থাকেন। একাদশে খেলতে পারেন ছয়জন প্রতিবন্ধীর সঙ্গে পাঁচজন সম্পূর্ণ সুস্থ খেলোয়াড়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে স্পেশাল অলিম্পিক সামনে রেখে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল আমাদের। বাংলাদেশসহ ৩০টি দেশের ইউনিফায়েড ফুটবল দল তখন অবস্থান করছিল সেখানে। আমাদের অনুশীলনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল আবুধাবির আল ফুজাইরাহ ক্লাবে। কাকতালীয়ভাবে তখন ক্লাবটির কোচের দায়িত্বে ছিলেন ম্যারাডোনা। ক্লাবের পক্ষ থেকেই একদিন জানানো হয়েছিল আমাদের জন্য ‘সারপ্রাইজ’ আছে। আমরা ভাবতেই পারিনি এত দুর্লভ সে সারপ্রাইজ।

বিজ্ঞাপন

এক দিন আগে জানানো হলো আমরা ম্যারাডোনার দেখা পাচ্ছি পরদিন ১৫ মার্চ। এটা শোনার পর থেকেই আমাদের অপেক্ষার প্রহর গোনা শুরু হয়েছিল। সেই অপেক্ষা ঘোচাতে একসময় তিনি মাঠে এলেন। ছোটখাটো মানুষটা কী হাস্যোজ্জ্বল চেহারা নিয়ে হাজির হলেন আমাদের সামনে। কথাবার্তায় কী আন্তরিকতা। আমরা কেউ স্প্যানিশ বুঝি না। দোভাষীর সহায়তায় আমাদের কথা শুনছিলেন। বাংলাদেশ সম্পর্কে জানছিলেন। লক্ষ করলাম, আবেগের কাছে ভাষার দূরত্ব কিছুই নয়, অনুভূতির যেন আলাদা ভাষা আছে। বিশ্বের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় যেন সেই অনুভূতির ভাষা বুঝলেন। সস্নেহে অনেকের মতো আমার হাতেও চুমু এঁকে দিলেন। তিনি আমাদের সঙ্গে দলগত ছবি তুললেন।

আমার কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিল না, তিনিই ম্যারাডোনা। কিংবদন্তি ফুটবলার ম্যারাডোনা, যিনি কিনা দুই পায়ে দুনিয়া জয় করছেন। স্বপ্নের মতো ব্যাপার যেন তখন। আমি ম্যারাডোনার ব্যক্তিগত সহকারীকে ইংরেজিতে বললাম, ‘আমার বিশ্বাস হচ্ছে না ম্যারাডোনাকেই আমি দেখছি। আমি তাঁকে ছুঁয়ে দেখতে চাই।’ পাশ থেকে ম্যারাডোনা নিজেই বললেন ‘শিয়োর’। আমি কাছে গিয়ে রীতিমতো জড়িয়ে ধরলাম। ছবিও তুললাম।

default-image

সে ছবি দেখে আমার অনেক বন্ধু এখনো বিশ্বাস করতে পারে না, সত্যিই আমি ম্যারাডোনার পাশে দাঁড়িয়েছি। পারবেই–বা কী করে। সে সময় আমাদের মতো বিভিন্ন দেশ থেকে যে দলগুলো খেলতে গিয়েছিল, তারা অন্য প্রদেশের ক্লাবে অনুশীলন করছিল। কয়েকজন ফুটবলারের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছিল আমার। ফেসবুক গ্রুপে তারা দর্শনীয় স্থান ঘুরে বেড়ানোর ছবি দিচ্ছিল। কেউ কেউ দুবাই শহরের বুর্জ খলিফা ভবন ঘুরে এসে গর্ব করছিল। আমি জানালাম ম্যারাডোনার সাক্ষাৎ পাওয়ার কথাটা। সবাই রীতিমতো চুপসে গেল, সবাই অবাক হলো সত্যিই এই দুর্লভ সুযোগ আমাদের হয়েছিল কি না, এই বলে অবিশ্বাসও করল। তখন প্রমাণ হিসেবে ছবিটা দিলাম!

সেদিন এক ঘণ্টার জন্য ক্লাবে এসেছিলেন ম্যারাডোনা। আমাদের সময় দিয়েছিলেন মিনিট বিশেক। এরই মধ্যে মাঠের চারপাশে মানুষের ভিড় বাড়ছিল। সংবাদকর্মীরাও হাজির হয়েছিলেন। বিদায় নিয়েছিলেন তিনি। তবে আমাদের সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা ছবিসমেত ম্যারাডোনাও তাঁর ফেসবুকে পোস্ট করেছিলেন। লিখেছিলেন দারুণ কিছু কথা।

ডিয়েগো ম্যারাডোনা, বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার, আপনি কোটি ফুটবলপ্রেমী মানুষের হৃদয়ে হাজার বছর বেঁচে থাকবেন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন