ময়ূরপাড়ায় ময়ূর নেই, খালে চলে ট্রাক

অনতিদূরে ট্রাক–জাতীয় বাহনের শব্দ শুনে বিভ্রান্ত হলাম। ঠিক শুনছি তো! কান খাড়া করলাম। ঠিক, দিনভর যে শব্দের সঙ্গে পথচলা, ভুল হতে পারে না! কিন্তু যে পাহাড়ে হাঁটাপথে মানুষের নিত্য যাতায়াত, সেখানে এই বিকট শব্দ অবিশ্বাস্য মনে হওয়াও স্বাভাবিক। আমার কৌতূহলী চাহনি দেখে পাশ থেকে তাই একজন বলল, ট্রাক আসতেছে, এই খাল দিয়ে ট্রাক চলে!

পাহাড়ের সঙ্গে অতিথির সম্পর্ক বলেই হয়তো ব্যাপারটা নতুন মনে হলো, নাড়া দিল। যে পাহাড়ের চূড়ায় ছংকক ম্রো পাড়া, তারই নিচ দিয়ে বয়ে গেছে খাল। ফাদু নামের খালটি কয়েক কিলোমিটার পর মাতামুহুরীর পেটে প্রবেশ করে নিজের নাম হারিয়েছে। বর্ষায় হাঁটাপথ যখন থকথকে কাদায় ভরে যায়, পাহাড়ি মানুষের যাতায়াতের ভরসা তখন এই খাল। নৌকায় বান্দরবানের লামা উপজেলা সদরে যেতে কয়েক ঘণ্টা লাগে। শুষ্ক মৌসুমে ভিন্ন রূপ নেয় খালটি, স্বচ্ছ মৃদু স্রোতে বয়ে চলে আপন মনে। শান্ত রূপের মায়ায় এটি প্রকৃতিপ্রেমী মানুষকে সহজে নিজের করে নেয়।

default-image
বিজ্ঞাপন

ফেব্রুয়ারিতে লামার যে দুর্গম পাহাড়ি পাড়ায় গিয়েছিলাম, খালটি সে পাড়াকে জড়িয়ে রেখেছে। আমি প্রকৃতিপ্রেমী কি না, জানি না; তবে পাহাড়ের চূড়া থেকে প্রথম দর্শনেই শান্ত খালটিকে আমার আপন মনে হয়েছিল। কিন্তু মিনিট কয়েকের মধ্যে মনটা ভেঙে গেল। একটি ট্রাক চোখের সামনে দিয়ে চলে গেল। গাছের পাতাপতনের শব্দ যেখানে স্পষ্ট, সেখানে এই বাঁশবোঝাই ট্রাকের বিকট শব্দ কতটা জঘন্য আর বিরক্তিকর হতে পারে, তা ভাষায় বোঝাতে পারব না। বিরক্ত আরও বেড়ে গেল খালের দিকে তাকিয়ে। খালের বুকটাকে রীতিমতো রক্তাক্ত করল যেন, ঘোলা জলে মায়াহীন মনে হলো শান্ত ফাদুকে।

পরে জেনেছি, পথ না থাকায় ব্যাপারীরা পাহাড়ের বাঁশ আর গাছ লামা শহরে নিতে বালুময় এ খালকেই ব্যবহার করেন। তাই খালের স্বচ্ছ জল দিনভর থাকে ঘোলা। খালে এখন মাছ বলে কিছু নেই, অন্য প্রাণও দানবীয় চাকায় পিষ্ট হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

ময়ূরপাড়ায় এক চক্কর

আমরা আর কোথাও যাব না?

প্রশ্নটা সফরসঙ্গী রায়হান পারভেজকে করেছিলাম। পাহাড়ের চূড়ায় এক মাচাংয়ে আমাদের তিনজনের আশ্রয় হয়েছিল। এই পাহড়ের পাদদেশে ম্রো সন্তানদের জন্য একটি স্কুল আছে। সেই স্কুলের জন্যই লামায় যাওয়া। স্কুলের শিশুদের সঙ্গে সময় কাটানো ছাড়া তেমন কাজ নেই। দুর্গম পাহাড়ে চুপচাপ বসে থাকার মধ্যেও ভালো লাগা আছে। তবু দূরের ওই জুমঘর, পাহাড়ি যে পাড়া দেখা যায়, সেখানে তো যাওয়া যায়। এমনও তো হতে পারে, ঝিরিতে গিয়ে চিংড়ি মাছ ধরার চেষ্টা করলাম।

রায়হান বলল, কাল সকালেই আমরা ময়ূরপাড়ায় যাব।

ময়ূরপাড়া?

হ্যাঁ, ময়ূরপাড়া। কাছেই। সেখানে শতবর্ষী কয়েকটি গাছ আছে।

আমি অবশ্য রায়হানের কথার লুকায়িত আরও অর্থ করেছিলাম যে ময়ূরপাড়ায় শতবর্ষী গাছ আছে, ময়ূরও নিশ্চয় আছে।

কিন্তু ময়ূরপাড়ায় ময়ূর নেই। ম্রো পাড়াটিতে একসময় ময়ূর ছিল। কয়েকটি ম্রো পরিবার বাস করে এখন। তেঁতুলগাছ আছে কয়েকটি। নিচে বয়ে গেছে ফাদু খাল।

default-image
বিজ্ঞাপন

সকাল সকাল ময়ূরপাড়ায় গিয়ে তাই হতাশ হলাম। সঙ্গে অবশ্য রায়হানরা নেই, আছে ক্রংচুং ম্রো। ময়ূরপাড়ার সন্তান। এসএসসি পরীক্ষায় হিসাববিজ্ঞানে অকৃতকার্য হয়েছে। ভীষণ ফ্যাশনসচেতন এই তরুণ। চুল কায়দা করে কাটিয়েছে, পরনে লিওনেল মেসির জার্সি। ফুটবলের পোকা সে। আশপাশের কয়েক পাড়ায় বেশ নামডাক তার। পদক আর ক্রেস্ট জুটেছে সেরা খেলোয়াড়ের। স্বপ্ন ছিল ফুটবলার হওয়ার। তবে সেই স্বপ্ন ফিকে হয়ে এসেছে। দারিদ্র্য তো আছেই, প্রথার পীড়াও ভুগতে হচ্ছে তাকে। তবে ক্রংচুং ম্রো মনের কথায় চলে। আমুদে সময় কাটায়। জীবনের মূলমন্ত্র যে আনন্দ, সে বিশ্বাস তার ভেতর প্রথিত হয়েছে।

ক্রংচুংয়ের সঙ্গে নিঃশব্দ পাড়া ঘুরে বেড়ালাম। শতবর্ষী গাছের ছায়ায় দাঁড়ালাম। একজন গাছ থেকে তেঁতুল পাড়ছিল। ঝুড়ি থেকে তিনটা তেঁতুল হাতে তুলে নিলাম। এক প্রান্তে খোসা ছাড়িয়ে মুখে পুড়তেই টকের চোটে চোখ বন্ধ হয়ে এল! ক্রংচুং ম্রো ততক্ষণে নিয়ে এসেছে ওদের ক্রামা ধর্মের উপাসনালয়ের পাশে। নতুন ঘরটি তখনো উদ্বোধনের অপেক্ষায়।

default-image

ময়ূরপাড়ার পথ কেন যেন বালুময়। বালু মাড়িয়ে যখন নেমে আসব, তখনই দেখি একটি ট্রাক ময়ূরপাড়া থেকে নিচে খালে নেমে গেল। ট্রাকভর্তি গাছ। পথটা কেন বালুময়, ট্রাকের চাকার দিকে তাকিয়ে তা বুঝলাম।

ক্রংচুং বলে, ট্রাক না এলে বাঁশ ও গাছ বিক্রি করতে সমস্যায় পড়তে হয়, দামও কিছুটা কম দেয় ব্যাপারীরা। ট্রাক এলে আবার খালগুলো নষ্ট হয়। মাছ ধরতে ঝিরির সন্ধানে আমাদের আরও দুর্গম পাহাড়ে যেতে হয়।

ক্রংচুংয়ের কথার মতো এমন সংকটের আভাস পেয়েছি অনেক পাহাড়ির আলাপে। এ যেন ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’ অবস্থা।

প্র ছুটির দিনে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন