এভারেস্ট বেসক্যাম্পে লেখক
এভারেস্ট বেসক্যাম্পে লেখকসংগৃহীত

কাজ থেকে অবসর নেওয়ার পর জীবন হওয়ার কথা শান্ত নিস্তরঙ্গ। স্মৃতিকাতর। অথচ আমার হয়েছে উল্টো। সারা জীবন সমুদ্রসৈকত, পিরামিড আর তাজমহল দেখে আনন্দ পেয়েছি। এখন আমার যেতে ইচ্ছে করে দুর্গম অরণ্য, দূরের পাহাড় আর অচেনা সমুদ্রে। অবসর নেওয়া মানুষের উচ্চাকাঙ্ক্ষা কমে যায়। আমার জেগেছে উচ্চতার আকাঙ্ক্ষা। সবচেয়ে উঁচু পর্বতশিখরের কাছে যেতে চাই।

ছেলেবেলায় উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় আর নবনীতা দেব সেনের লেখা হিমালয়ে ভ্রমণকাহিনি পড়েছি। ২০১৯ সালের নভেম্বরে একদিন প্রকৃতিপ্রেমিক অভিযাত্রী ইনাম আল হক এভারেস্ট বেসক্যাম্প পর্যন্ত ট্রেকিংয়ের বিবরণ দিলেন। তাঁর গল্প শুনে উদ্দীপনা সঞ্চারিত হলো। আমি নিঃশব্দে সংকল্প করি। বয়স ৬৩ বছর হয়েছে, তাই দেরি করার অর্থ নেই। যাব যখন স্থির করেছি, কয়েক মাসের মধ্যেই যাব। এভারেস্ট বেসক্যাম্প ১৪–১৫ দিনের কঠিন ট্রেকিং; কঠিনেরে ভালোবাসিলাম। হিমালয়, আসছি তোমার কাছে।

এরপর প্রস্তুতিপূর্ব। হেঁটে উঁচুতে ওঠানামার অভ্যাস করতে হবে। শারীরিকভাবে সুস্থ ও ফিট থাকার প্রস্তুতি নিই জিমে, বাড়িতে, বাইরে, রাস্তায়। ডিসেম্বরের মধ্যেই সংগ্রহ করি অত্যাবশ্যকীয় সব উপকরণ। বিশেষ করে ট্রেকিং বুটস, মোজা, গ্লাভস, থার্মাল, ফ্লিস এবং ভেতরে ও বাইরে পরার অন্যান্য পোশাক। হাইড্রেশন প্যাক আর ব্যাকপ্যাকটা আকারে ও ধারণক্ষমতায় খুব উপযোগী। নতুন বুটজোড়া পায়ে দিয়ে আমি হেঁটে হেঁটে হাতিরঝিলে যাই, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে যাই; বইমেলাতে হেঁটে যাই, আবার হেঁটে ফিরি। ঢাকার রাস্তায় আমার হাঁটার অভিজ্ঞতা বাড়ছে। চার-পাঁচতলা তো বটেই, আটতলা বা দশতলা ভবনেও আমি সিঁড়ি দিয়ে উঠি। সিঁড়ি দিয়ে নামি।

default-image
বিজ্ঞাপন

নেপালের ডায়েরি

করোনা মহামারি শুরুর ঠিক আগে, ২০২০ সালের ১১ মার্চ, নেপালে যাই। কাঠমান্ডুতে বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে যার দেখা পাই, তার নাম তেজ বাহাদুর করকি। এই স্মার্ট যুবক আমাদের গাইড। দুদিন পর ১৩ মার্চ ভোর চারটায় যাত্রার জন্য তৈরি হয়ে নিই। ঠিক সোয়া পাঁচটায় এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেখি, শেষ রাতের অন্ধকারেই অপেক্ষা করছেন সারা পৃথিবী থেকে আসা ট্রেকার, নানা বয়সের নারী-পুরুষ। তেজের সহায়তায় আমাদের চেক-ইন সমাধা হয়। সীতা এয়ারের বোর্ডিং পাস আমাদের হাতে। এখন গন্তব্য লুকলা, সেখান থেকে শুরু হবে ট্রেকিং।

ফ্লাইটগুলো ভর্তি। নানা ভাষার সংলাপ শুনি প্লেনের ভেতরে। উচ্ছ্বাস আমার একার নয়; সবাই এই মহাযাত্রার আনন্দে উদ্বেলিত। ভোরের স্নিগ্ধ আকাশে উড়ে পাহাড়ের রাজ্যে ঢুকে পড়ি আমরা। উঁচু পাহাড়ের মাথায় ভোরের আলো। কখনো আমাদের ছোট প্লেন একটা পাহাড়ের গা ঘেঁষে উড়ে যায়। কখনো দুই পাহাড়ের মাঝখানের ফাঁকটুকু দিয়ে বেরিয়ে যায় সন্তর্পণে। ৩৫ মিনিট পর পাহাড়ের ভিড় থেকে প্লেন নামতে শুরু করে। কিন্তু নামবে কোথায়? চারদিকেই তো পাহাড়। ভয় হয়, আমাদের প্লেন একটুখানি নেমে, সঠিক উচ্চতায় থেকে ছোট ছোট চাকা দিয়ে রানওয়ে স্পর্শ করতে পারবে তো? সামনের পাহাড়ের গায়ে একটা সমতল জায়গা। হ্যাঁ, ওটাই লুকলা। বেশিক্ষণ আতঙ্কে থাকতে হয়নি, প্লেনের চাকা রানওয়েতে নেমে ছুটে চলেছে। ছোট্ট রানওয়ের শেষ প্রান্তে ইংরেজিতে বড় করে লেখা—লুকলা। সেখানে পৌঁছে প্লেনটা দ্রুত ডান দিকে ঘুরে হঠাৎ থেমে যায়। এখানেই নামতে হবে।

default-image

পাহাড়ের ওপরে ছোট্ট জমিটুকু শেরপাদের কাছ থেকে ২ হাজার ৬৫০ মার্কিন ডলারে কিনে স্যার এডমন্ড হিলারি ১৯৬৪ সালে তৈরি করেন লুকলা বিমানবন্দর। চালু করার পর তিনি এটা নেপাল সরকারকে দিয়ে দেন। টানা কুড়ি বছর ধরে পৃথিবীর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বিমানবন্দর হিসেবে চিহ্নিত লুকলা। সব ধরনের প্লেন সেখানে যেতে পারে না। টুইন ওটার, ডর্নিয়ার ডু ২২৮, এল-৪৮০ টার্বোলেট, এই ধরনের ছোট এবং অল্প দৌড়ে ওড়া প্লেন যায় সেখানে।

বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে দেখি, পাহাড় কেমন সুন্দরভাবে ঘিরে রেখেছে এই ছোট লোকালয়কে। চারদিকে পাহাড় এত কাছে, এত রাজসিক! কফি খেতে খেতে তেজ গাইড হিসেবে ছোট্ট করে বুঝিয়ে বলে, এখন থেকে আমাদের লক্ষ্য কী, করণীয় কী, কোথায়, কীভাবে, কতক্ষণে যাব।

লুকলা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২ হাজার ৮৪০ মিটার উঁচুতে। এখান থেকে এভারেস্ট বেসক্যাম্প (ইবিসি) পর্যন্ত ট্রেকিং করে যাব। ইবিসির উচ্চতা ৫ হাজার ৩৬৪ মিটার, ১৭ হাজার ৫৯৮ ফুট। অর্থাৎ লুকলা থেকে ইবিসি পর্যন্ত আমাদের ২ হাজার ৫২৪ মিটার উঁচুতে উঠতে হবে। এর জন্য হাঁটতে হবে ৬২ কিলোমিটার। যেতে আট দিন, ফিরতে পাঁচ দিন। পথে হিমালয়ের অন্তত কুড়িটি পর্বতশিখর দেখব। যেগুলোর মধ্যে রয়েছে সর্বোচ্চ মাউন্ট এভারেস্ট ৮ হাজার ৮৪৯ মিটার। পৃথিবীর সর্বোচ্চ পাঁচটি শৃঙ্গের আরও দুটি—লোহ্ত্সে ৮ হাজার ৫০১ এবং মাকালু ৮ হাজার ৪৫৩ মিটার। বাকি পর্বতশিখরগুলোর অধিকাংশই উচ্চতায় ৬ হাজার মিটারের বেশি। সবচেয়ে সুন্দর আমা ধবলাম।

বিজ্ঞাপন

লুকলা থেকে ফাকদিং

প্রথম দিন পাঁচ ঘণ্টা হেঁটে লুকলা থেকে ফাকদিং পৌঁছাই। পরদিন সেখান থেকে নামসে বাজার সাত-আট ঘণ্টার ট্রেক। তৃতীয় দিনটা নামসেতে এক্লাইমেটাইজেশন (উচ্চতা, তাপমাত্রাসহ পরিবেশের সঙ্গে শরীরকে মানিয়ে নেওয়া)। সেদিন অনেকক্ষণ হেঁটে উঁচুতে উঠে আবার ফিরে গিয়ে নামসেতেই থাকি। চতুর্থ দিনে নামসে থেকে থিয়াংবোচে হয়ে দেবুচে পৌঁছাই। এই দিনগুলোতে পার্বত্য চড়াই–উতরাই বেয়ে কখনো উচ্ছল পাহাড়ি নদীর ধার দিয়ে, কখনো পাইন বনের ভেতর দিয়ে চলেছে আমাদের ট্রেকিংয়ের পথ। পঞ্চম দিনে দেবুচে থেকে ফেরিচে। ষষ্ঠ দিনে ফেরিচেতে এক্লাইমেটাইজেশন। সপ্তম দিন লোবুচে পর্যন্ত ট্রেকিং।

দেবুচের পর থেকেই আর কোনো গাছপালা নেই। শুধু পাথর, উঁচু–নিচু পথ, চারদিকে উঁচু উঁচু পাহাড় আর তুষার ঢাকা পর্বতশিখর। পথে দুধকোশি আর ইমজা নদী কয়েকবার পার হয়েছি। সব মিলিয়ে মোট নয়টা ঝুলন্ত সেতু পার হয়ে এসেছি আমরা। অষ্টম দিনে খুমবু হিমবাহ আর তার গ্রাবরেখা ধরে হেঁটে লোবুচে থেকে যাই গোরাকশেপ। সেখানে সামান্য বিরতি নিয়ে ইবিসির পথে যাত্রা করি আমরা।

লোবুচে থেকে গোরাকশেপ আর ইবিসিতে যাওয়ার ট্রেকিং পথের পুরোটাই তুষারাবৃত। তুষারঢাকা অনিন্দ্যসুন্দর পর্বতগুলো অনেক কাছে। কিন্তু এই দৃশ্য দেখার জন্য থামলে আমাদের বেসক্যাম্প পৌঁছুতে দেরি হয়ে যাবে। তা ছাড়া মাইনাস ১৬ থেকে ১৭ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা আর শিরশিরে হাওয়ায় একটু দাঁড়ালেই ঠান্ডা লাগে। তার চেয়ে জোর কদম ট্রেকিং করে চলা সহজ। চলতে চলতে যতটুকু দেখা যায়, তাতেই খুশি আমরা।

২০ মার্চ বেলা দুটোয় আমরা খুমবু গ্লেসিয়ার ঘেঁষে এমন একটা জায়গাতে গিয়ে পৌঁছাই, যেখান থেকে পরিষ্কার দেখতে পাই পৃথিবীর সর্বোচ্চ শিখরটি। অহংকারী, সুন্দর ও রহস্যময়। সামনের শিখরগুলো সব তুষারশুভ্র আর পেছন থেকে উঁকি দিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো এভারেস্টকে দেখায় একটু গাঢ় রঙের।

default-image

অবশেষে বেসক্যাম্প

এখান থেকে কুড়ি মিনিট হেঁটে আমরা পৌঁছে যাই আমাদের স্বপ্নের রাজ্যে। হঠাৎ নিজেদের আবিষ্কার করি একটা বড় পাথরের সামনে। ছোট্ট একটা পাহাড়ের মতোই তার আকৃতি। ওপরটা তুষার দিয়ে ঢাকা। আর সামনের দিকটায় জ্বলজ্বল করছে লাল রং দিয়ে ইংরেজিতে লেখা—এভারেস্ট বেসক্যাম্প, ৫৩৬৪ মিটার। সেই পাথর ঘিরে অনেকগুলো দড়িতে টানানো রয়েছে নানা রঙের প্রেয়ার ফ্ল্যাগ। পাশেই খুমবু হিমবাহ, তার ওপারে এভারেস্ট।

এটাই আমাদের লক্ষ্য। এখানে আসব বলেই এত স্বপ্ন, এত অস্থিরতা আর এত প্রস্তুতি। ৬৩ বছর বয়সে আমি জড়ো করেছি তারুণ্যের শক্তি, যৌবনের উদ্দীপনা আর কৈশোরের উচ্ছ্বাস। আমাদের আগে যাঁরা এসে পৌঁছেছেন, তাঁদের ছবি তোলা হয়ে যাওয়ার পর আমি ওই পাথরটির সামনে গিয়ে দাঁড়াই। সারা পৃথিবী থমকে আছে গভীর অসুখ বুকে নিয়ে। এ সময়ে একজন মানুষ সবুজ অরণ্য, তুষারিত প্রান্তর, নদী, পাথর, হিমবাহ ও পাহাড় পেরিয়ে অবিচলভাবে হেঁটে এসেছে এখানে, হিমালয়ে।

প্র ছুটির দিনে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন