বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

বড়দিনের মূল আকর্ষণ শহরের প্রধান ক্যাথেড্রালের সামনের টাউন স্কয়ারে আয়োজিত ফায়ার ওয়ার্কস বা আতশবাজি। ৭ অথবা ৮ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় এ উৎসব শুরু হয়। তবে উৎসব কবে শুরু হবে তা নির্ভর করে ধর্মীয় পঞ্জিকার ওপর। ডিসেম্বরের এ দুটি দিন সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ ছুটি ঘোষিত হয়। নগরবাসী উৎসবের আমেজে হাজির হয় ক্যাথেড্রালের সামনে। ক্যাথেড্রালের সামনের টাউন স্কয়ার সাজানো হয়।

এবার হয়েছে ৭ ডিসেম্বর। পুরো শহরকে আলোকিত মনে হচ্ছিল। সান্ধ্য আয়োজনের পর পর ঘণ্টা বেজে ওঠে লেওন ক্যাথেড্রালের গির্জায়। আতশবাজি আকাশকে আলোকিত করে। শিল্পীরা বিনোদন দিতে শুরু করেন এবং ওই আয়োজন অনেক রাত অবধি চলতে থাকে।

আমাকে অবাক করে লা গিগান্টোনা। লা গিগান্টোনা হলো একটি দীর্ঘকায় পুতুলের মতো ফিগার, যা কাঠের ফ্রেমে তৈরি, লম্বা রঙিন পোশাক পরা। এর মাধ্যমে মূলত স্প্যানিশ উপনিবেশ স্থাপনকারীদের উপহাস করা হয়। যদিও এখন সেই উপনিবেশ নেই; কিন্তু সেই সংস্কৃতি রয়ে গেছে। লা গিগান্টোনা লম্বা, সাদা চামড়া ও ধনী স্প্যানিশ নারীর প্রতিনিধিত্ব করে। সাধারণত তার সঙ্গে নাচেন এল এনানো ক্যাবেজন (বড় মাথার বামন), যিনি আদিবাসীদের প্রতিনিধিত্ব করেন। এল এনানো ক্যাবেজন খাটো, কালো চামড়ার ও দরিদ্র, কিন্তু খুব বুদ্ধিমান। লা গিগান্টোনা এবং এল এনানো ক্যাবেজনকে প্রায়ই রাস্তায় দেখা যায় উৎসবের দিনগুলোতে। লা গিগান্টোনা সাধারণত ১০ ফুট লম্বা হয়।

default-image

এটি এক দুর্লভ অভিজ্ঞতা আমার। পৃথিবীর সে মুলুকে না গেলে আমার এ দুর্লভ আনন্দ দেখার সৌভাগ্য হতো না। লাতিন আমেরিকার অনেক দেশের মতো নিকারাগুয়াও স্পেনের অনেক রীতিনীতি ধরে রেখেছে। ক্রিসমাসের সময় স্থানীয় লোকজন রাস্তায় ঘুরে বেড়ান। খোলাবাজারে কেনার জন্য থাকে পণ্যের সমারোহ। মধ্য আমেরিকান আবহাওয়ায় বছরের এই সময়ে সর্বত্র ফুল ফোটে। গির্জা এবং বাড়িগুলো ফুলের সঙ্গে মিলিয়ে উজ্জ্বল রঙে সজ্জিত করা হয়। শেফার্ডস ফ্লাওয়ারস ক্রিসমাসের একটি বিশেষ সজ্জা এখানে। রাষ্ট্রীয় এই আয়োজনগুলোকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় লা গ্রিটরিয়া।

এ তো গেল রাষ্ট্রীয় আয়োজন। শহরের পরিবারগুলোয় থাকে ভিন্ন প্রস্তুতি। শহরের বাড়িগুলো এক তলা; ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ বলেই এখানে উঁচু বাড়ি হয় না। শহরের সাধারণ উচ্চবিত্ত পরিবারগুলো তাদের বাড়ির প্রবেশপথেই একটি বেদি তৈরি করে। সেই বেদিতে বসানো হয় কুমারী মেরির ভাস্কর্য। কুমারী মেরিই সব আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন এ অনুষ্ঠানে। সামনের দরজাটি খোলা রাখা হয় যাতে বেদিটি রাস্তা থেকে দৃশ্যমান হয়। অতিথিদের বেদিতে উপাসনা করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। কুমারী মেরির বেদিতে শিশুরা ফুল নিয়ে যায়। তারা ক্যারল পরিবেশন করে কোরাসে। ক্যারল একধরনের ধর্মীয় সংগীত, যা অনেকটা আমাদের ভজনের মতো। দেখলাম শহরের শত শত মানুষ, বিশেষ করে শিশুরা, ঘরে ঘরে গিয়ে মেরির বন্দনা সংগীত ও ক্যারল গাইছে।

default-image

সব পরিবারে এই আয়োজন হয় না, কেবল অবস্থাপন্ন পরিবারগুলোই এই বিশেষ আয়োজন করতে পারে। আমাদের এদিকটায় দুর্গাপূজার সঙ্গে অনেক মিল পেয়েছি সে দেশের বড়দিনের। দুর্গাপূজার মণ্ডপও তো অবস্থাপন্ন পরিবারগুলোই করতে পারে। বিভিন্ন বয়সী মানুষ লাইন ধরে দাঁড়িয়ে যান বাড়ির ফটকের সামনের রাস্তায় ‘পুরিসিমা গিফট’ পাওয়ার জন্য। এ লাইন বেশ দীর্ঘ হয়। আমি আর আমার বেলজিয়ান বন্ধু কাসান্দ্রা হাত বাড়িয়েছি উপহারের জন্য। নানান উপহার যেমন খেলনা বল, হাতপাখা ও প্লাস্টিকের বাটি নিয়ে ফিরেছি। এক বাড়ি থেকে পেয়েছি বাদ্যযন্ত্র ‘মারাকা’। এই উপহারগুলোকে বলা হয় পুরিসিমা গিফট আর পুরো আয়োজনকে বলা হয় লা পুরিসিমা।

আর রাতের ক্রিসমাস খাবার? নিকারাগুয়ার ক্রিসমাস উদ্‌যাপনের বেশির ভাগই প্রাচীন স্প্যানিশ ঐতিহ্য দ্বারা প্রভাবিত, তাই রাতের খাবারের মেনুতে তার প্রভাব আছে—স্টাফড চিকেন, নাকাটামাল, ভ্যালেনসিয়ান স্টাইলের ভাত, ঘরে তৈরি রুটি এবং স্প্যানিশ স্পঞ্জ কেক। শিশুরা সবাই পাপা নোয়েলকে বড়দিনের শুভেচ্ছা বার্তা লেখে এবং বড়দিনের আগের দিন মধ্যরাতে তাদের খেলনা ও উপহার আনতে বলে। নিকারাগুয়ায় পাপা নোয়েলকে সান্তা ক্লজের সমতুল্য মনে করা হয়।

পরের দিন সকাল। লাউডস্পিকারে ‘ক্রিসমাস ক্যারল’ বাজছে। হোটেল ছেড়ে রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছি। কেবল আমি নই, হোটেলের প্রায় সবাই। কেন? একটি বৃহৎ মিছিলের মতো কিছু একটার আভাস পাচ্ছি। লেওন শহরে ক্রিসমাস উপলক্ষে প্যারেড বা মিছিল করার জন্য ক্যাথলিক চার্চের একটি পুরোনো রীতি রয়েছে।

সেই মিছিল আসছে, মিছিলের অগ্রভাগে কুমারী মেরির বড় একটি ছবি। সে এক দীর্ঘ জনস্রোত। বাইবেলের বিভিন্ন চরিত্রে সেজেছে কেউ কেউ।

নিকারাগুয়ার লেওন শহরে ক্রিসমাসের এ এক অনন্য অভিজ্ঞতা আমার।

লেখক: গবেষক ও পর্যটক

প্র ছুটির দিনে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন