শোক করারও যেন কেউ নেই

একমাত্র তিনিই বেঁচে ফিরেছেন

৯ জনকে চেনা যায়নি। ৮ জনকে আংশিক শনাক্ত করা গেছে। সেই হিসাবে বাকি ৯ জনের মৃতদেহ আন্দাজ করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ জন্য তাঁদের ডিএনএ নমুনা রেখে ক্রমিক নম্বর দিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের নম্বর হয়েছে ১ থেকে ১৭।

আরও একজন আছে, যার নম্বর দেওয়ার প্রয়োজন পড়েনি। চিকিৎসকেরা তাকে নিয়ে আশাবাদী। ভয়াবহ দুর্ঘটনার দহনের পরও তার প্রাণ আছে। ঘটনার ৭২ ঘণ্টা পর তার সাড়া পাওয়া গেছে। মাইক্রোবাসের ১৭ জন নিহত যাত্রীর নাম বাদ দিলে তার নাম পাভেল হওয়ার কথা। কিন্তু চিকিৎসকেরা নিশ্চিত হতে পারছিলেন না। ভাবছিলেন, অন্য কোনো দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া রোগী কি না। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রের (আইসিইউ) ইনচার্জ আবু হেনা মোস্তফা কামাল তাই তাকে প্রথম প্রশ্ন করেন ‘তোমার নাম কী?’ ২৯ মার্চ দুপুরে সে টানা সুরে নিজের নাম উচ্চারণ করেছে, পা-ভে-ল।

default-image

২৬ মার্চ পাভেল মা–বাবার সঙ্গে রংপুরের পীরগঞ্জ থেকে রাজশাহীতে স্বাধীনতা দিবসের ছুটিতে বেড়াতে আসছিল। রাজশাহীর কাটাখালী থানার পাশে রাজশাহী-নাটোর মহাসড়কে একটি যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে মাইক্রোবাসের গ্যাস সিলিন্ডার ফেটে গিয়ে আগুন ধরে যায়। আগুনে পুড়ে পাভেলের মা–বাবাসহ পাঁচ পরিবারের ১৭ জন মানুষ মারা যান। চালকসহ ওই হাইয়েস মাইক্রোবাসে ১৮ জন যাত্রী ছিলেন। এর মধ্যে ছিলেন পাভেলের বাবা মোখলেছার রহমান ও মা পারভীন বেগম। তাঁদের বাড়ি পীরগঞ্জ উপজেলার দ্বারিকাপাড়া গ্রামে। পাভেলের বাবা ইঞ্জিন সারাইয়ের কাজ করতেন। পাভেল উচ্চমাধ্যমিকে পড়ে। সে এখনো জানে না যে তার মা–বাবার কী হয়েছে। চিকিৎসক পাভেলের স্বজনদের তার সঙ্গে বেশি বেশি কথা বলতে বলেছেন। চিকিৎসকের ভাষ্য অনুযায়ী, পাভেল ৭২ ঘণ্টা অন্য জগতে ছিল। সেই জগৎ থেকে ফিরিয়ে আনতে হবে। সুস্থ হয়ে ওঠার পরে তাকে মা–বাবার কথা জানাতে হবে। মাইক্রোবাসে জায়গা না হওয়ার কারণে পাভেলের ছোট বোন মোহনা জান্নাতি বাসায় থেকে গিয়েছিল। সে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। সুস্থ হয়ে উঠলে পাভেল অন্তত বোনের দিকে তাকিয়ে নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখতে পারে।

বিজ্ঞাপন

ফুল মিয়ার মায়ের কেউ নেই

ফুল মিয়ার বৃদ্ধ মায়ের বেঁচে থাকার কোনোই অবলম্বন আর নেই। তাঁর একমাত্র ছেলে ফুল মিয়া, ছেলের বউ নাজমা বেগম, নাতি ফয়সাল এবং নাতনি সুমাইয়া ও সাবিহা সবাই মারা গেছেন এ দুর্ঘটনায়। পরিবারের সব সদস্যের মৃত্যুর খবর শুনে ফুল মিয়ার মা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এ জন্য ফুল মিয়ার প্রতিবেশীরা রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃতদেহ নিতে এসেছিলেন। তাঁদের বাড়ি পীরগঞ্জ উপজেলার বড়মজিদপুর গ্রামে। মাহফুজার রহমান নামের এক প্রতিবেশী বলেন, ‘মৃতদেহ গ্রহণ করার মতো কেউ নাই। প্রতিবেশীরাই এসেছিলাম। পীরগঞ্জ উপজেলা সদরে ফুল মিয়ার ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ বিক্রির দোকান আছে। ফুল মিয়া আর্থিকভাবে সচ্ছল ছিলেন। তার সম্পদ থাকল। কিন্তু সেসব ভোগ করার আর কেউ রইল না।’

নূর মোহাম্মদের অপেক্ষা

নূর মোহাম্মদ রাজশাহী সেনানিবাসে সার্জেন্ট পদে চাকরি করেন। ফুল মিয়ার স্ত্রী নাজমা বেগমের ভাই তিনি। বোন সপরিবার বেড়াতে আসছেন জেনে তিনি ঘন ঘন ফোন করে তাঁদের অবস্থান জানার চেষ্টা করছিলেন। বেলা ১টা ৫০ মিনিটের দিকে দুর্ঘটনাটি ঘটে। আর নূর মোহাম্মদ দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বোনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। বোন বলেছিলেন, তাঁরা নাটোরে আছেন। আর এক–দেড় ঘণ্টার মধ্যে তাঁরা রাজশাহীতে পৌঁছে যাবেন। বাসায় গিয়ে খাওয়াদাওয়া করে ঘুরতে বের হবেন। ভাই নূর মোহাম্মদ সে অনুযায়ী খাবার তৈরি করে বসেছিলেন। দেরি হচ্ছে দেখে বেলা দুইটার দিকে নূর মোহাম্মদ আবার ফোন দেন। তখন বোন ফোন ধরেননি। ভগ্নিপতিকে দিয়েছেন। তিনিও ধরেননি। তিনি ভাবেন হয়তো নেটওয়ার্কের ঝামেলা। কিছুক্ষণ পরে আবার ফোন দেন। তখন দুটি ফোনই বন্ধ পান। অপেক্ষার পরই জানতে পারেন দুর্ঘটনার খবর।

বিজ্ঞাপন

তাজুল ইসলামের কেউ রইল না

তাজুল ইসলামের ডাকনাম ছিল ভুট্টু। পেশায় মোটর মেকানিক, মানুষটি ছিলেন খুব ভালো মনের। এ মন্তব্য তাঁর পরিচিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের। কিন্তু তাঁর কপালে কিছুই সইল না। তাঁর বড় ছেলে দুই-তিন বছর আগে পানিতে ডুবে মারা গেছে। সেই শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতে পরিবারের বাকি সদস্যদের নিয়ে তিনি পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিলেন। সেদিনের মাইক্রোবাসে তাঁর সঙ্গে ছিলেন তাঁর স্ত্রী মুক্তা আক্তার ও ছেলে ইয়ামিন। সবার বাড়ি পীরগঞ্জ উপজেলা সদরে।

থাকল না দুই বোনের দুই সংসার

দুই বোনের বিয়ে হয়েছিল আপন দুই ভাইয়ের সঙ্গে। একইভাবে দুই বোনের সংসার সড়কেই শেষ হয়ে গেল। জীবন–মৃত্যুর এমন নাটকীয়তা কমই চোখে পড়ে। প্রায় ১৮ বছর আগে বড় বোন কামরুন্নাহারের স্বামী শাহজাহান আলী সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। এবার ছোট বোন শামছুন্নাহারের স্বামী–সন্তানের সঙ্গে কামরুন্নাহার নিজেও সড়ক দুর্ঘটনার আগুনে পুড়ে মারা গেলেন। মাইক্রোবাসের ১৭ জনের মধ্যে দুই বোনের সঙ্গে মারা গেলেন ছোট বোনের স্বামী সালাহ উদ্দিন, তাঁদের দুই ছেলেমেয়ে সাজিদ ও সাফা। তাঁদের বাড়ি পীরগঞ্জের বড়রাজারামপুর গ্রামে। গাড়িতে জায়গা না হওয়ার কারণে মায়ের সঙ্গে আসতে পারেননি কামরুন্নাহারের একমাত্র সন্তান আহসান হাবিব। এবার তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। জন্মের পরপরই তিনি সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর বাবাকে হারিয়েছেন। একমাত্র অবলম্বন ছিলেন মা, তিনিও একইভাবে চলে গেলেন।

কে জানত যে এ রকম কাকতালীয়ভাবে দুই বোনের সংসার যে সড়কেই শেষ হয়ে যাবে! এখন এই দুই পরিবারের প্রিয়জনদের শোক বুকে করেই ছেলেটিকে বেঁচে থাকতে হবে।

default-image

বেড়াতে ভালোবাসতেন শহীদুল

পীরগঞ্জ থেকে রাজশাহীতে বেড়াতে আসছিলেন শহীদুল ইসলাম। পেশায় তিনি একজন কৃষক। মৌসুমি ব্যবসাও করতেন। দুর্ঘটনায় তিনিও মারা যান। তাঁর ছেলে নাজমুল হক সেদিন মুঠোফোনে ধারণ করা ছবি হাতে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন বাবার লাশ। নাজমুল হক বলছিলেন, ‘বাবার খুব বেড়ানোর শখ। প্রতিবছর এভাবে দল ধরে বেড়াতে যান।’

এক বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে নাজমুল সবার বড়। তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। তাঁদের বাড়ি রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার দুরামিঠিপুর গ্রামে। বাবার ছবি দিকে তাকিয়ে তিনি ডুকরে কেঁদে উঠেছিলেন। তাঁর কান্না দেখে উপস্থিত কেউ চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। সবার মুখে একই কথা, ‘আমাদের এই কান্না থামবে কবে!’

প্র ছুটির দিনে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন