default-image

অনিমেষ একদম জাত শিল্পী। সরাসরি যখন ওর গান শুনলাম, তখন একটা কথাই আমার মাথায় আসছিল। তা হচ্ছে, ‘র ম্যাটেরিয়াল’। বাংলার মাটি আর জীবন থেকে উঠে আসা যে সংগীত, সেই সংগীতের বিশুদ্ধ কাঁচামাল অনিমেষ রায়। ওর গানে তথাকথিত আধুনিকতার আরোপিত ঝনঝনানি নেই। আছে পাহাড়ি অনার্য সুর। এমন শিল্পী হয়ে জন্মাতে হয়। জন্মে এমন শিল্পী হওয়া যায় না। ওর প্রধান শক্তির জায়গা হচ্ছে ওর সাবলীলতা। এমনিতে সসংকোচ, জড়সড়, কিন্তু যখন গান ধরে, পুরো জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

যত দূর জানি, ও সংগীত পরিবারের সন্তান। ছোটবেলা থেকেই ঢোল, তবলা, সুর—এসব নিয়ে বেড়ে ওঠা। ব্যাপারটি অনেকটাই এগিয়ে দেয় আসলে। ওর আরেকটি ব্যাপার আমাকে দারুণভাবে মুগ্ধ করেছে। তা হলো, মাতৃভাষার প্রতি ওর দায়বদ্ধতা। অনেক ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষা এখন হারিয়ে যাচ্ছে। অনিমেষ নিজের হাজং ভাষাকে তুলে ধরতে চাইছে মানুষের কাছে। যে তন্ময় আনন্দ নিয়ে নিজের ভাষার গানটা ও করে, মুগ্ধ না হয়ে উপায় থাকে না। আমরা সম্প্রতি গিয়েছিলাম ওর এলাকায়। ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার বিজয়পুর গারো পাহাড়ের গাঁ ঘেঁষে ছোট ছোট টংদোকান। সেখানে বসে গান-গল্প-আড্ডা। তখন দেখেছি স্থানীয় মানুষেরা ওকে কতটা আপন করে নিয়েছে। ওর আরেকটা বিশেষ শক্তির জায়গা হচ্ছে, গানের বিভিন্ন ঘরানায় ওর সহজাত দখল। কেবল নিজের ভাষার গানই নয়, বাংলা লোকজ গান, এমনকি আধুনিক গানের জন্যও অনিমেষের গলাটা ভীষণ উপযোগী।

এখন আমার বাসায় প্রায় সারা দিনই ওর গান বাজে। আমার স্ত্রী, তিন সন্তান সবাই ওর খুব ভক্ত হয়ে গেছে। আড্ডা, মহড়া, গান—এসবের মধ্য দিয়ে অনিমেষের সঙ্গে বেশ ভালোই সময় কাটছে। প্রতিনিয়তই নতুন অনিমেষকে আবিষ্কার করছি।

এ তো অদ্ভুত একটা সময়। হুট করে কেউ একজন এসে স্টার হয়ে যাচ্ছেন। হারিয়েও যাচ্ছেন যথারীতি। তাই হঠাৎ খ্যাতি পাওয়া শিল্পীদের নিয়ে একটা ভয় আমাদের সব সময়ই থাকে। অনিমেষের ক্ষেত্রে এটা ঘটার সুযোগ কম। শহরের কৃত্রিমতাবিবর্জিত পৃথিবীর মানুষ ও। আলোঝলমলে তথাকথিত তারকা হয়ে ওঠার তাড়না ওর নেই, বরং একজন সত্যিকারের শিল্পী হয়ে ওঠার সাধনা আছে। তা ছাড়া জ্যেষ্ঠ শিল্পীদের নজরদারিও আছে। ফলে ভুল দিকনির্দেশনায় শিল্পমান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা নেই বললেই চলে। হারিয়ে যাওয়ার জন্য অনিমেষ আসেনি।

লেখক: সংগীতশিল্পী

প্র ছুটির দিনে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন