default-image

ক্ষয়ে যাওয়া কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ মাথায় নিয়ে অ্যাডভেঞ্চার-১ নামের লঞ্চটি সদরঘাট ছেড়েছে। গন্তব্য বরিশাল। করোনাভীতি উপেক্ষা করে লঞ্চে গিজগিজ করছে যাত্রী। করোনাকালীন স্বাস্থ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করে সাতজনের একটি দলও রয়েছে এ লঞ্চে। তাঁদের সবার সঙ্গে বাইসাইকেল। গন্তব্য কুয়াকাটা। ৬ নভেম্বর বরিশালে লঞ্চ থেকে নেমে কুয়াকাটা পর্যন্ত বাকি প্রায় ১১৫ কিলোমিটার পথ তাঁরা পাড়ি দিয়েছেন সাইকেলে। ৭ নভেম্বর বরগুনার আমতলী পর্যন্ত ফিরছেন সাইকেলে। সব মিলিয়ে ১৬০ কিলোমিটার পথ মাড়িয়েছেন দুই চাকায় চেপে।

সাতজনের এ দলের নেতা এভারেস্ট বিজয়ী পর্বতারোহী নিশাত মজুমদার। অন্যরা হলেন সোহাগ বিশ্বাস, শিল্পী, আবীর, এপি, রকিব হাসান ও কনক আদিত্য। সাইকেল নিয়ে নিছক রোমাঞ্চকর ভ্রমণের উদ্দেশ্যে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেননি। এক বিকেলে সাভারের হেমায়েতপুরে নিজের ‘টালিবাড়ি’তে বসে এ ভ্রমণের গল্প শোনালেন অভিযানের অন্যতম সদস্য কনক আদিত্য। খোলাসা হলো এ ভ্রমণের গূঢ় উদ্দেশ্য।

বিজ্ঞাপন
default-image

কনক আদিত্য উদ্যোক্তা ও সংগীতশিল্পী হিসেবে খ্যাতিমান হলেও তাঁর আরেকটি পরিচয় পর্যটক। অনেক দেশ ভ্রমণ করেছেন তিনি, ট্র্যাকিং করতে গেছেন হিমালয়ে। আইল্যান্ড পিকে অভিযান করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রেরর আলাস্কা থেকে কানাডা পর্যন্ত সাইকেল চালিয়েছেন। অ্যাডভেঞ্চার করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যে। এ ছাড়া তিনি প্লাস্টিক পণ্যের পুনর্ব্যবহার বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে কাজ করেন দেশে ও বিদেশে।

ভ্রমণের বিভিন্ন প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলার শুরুতে স্বাভাবিকভাবে জানতে চাইলাম, সাইকেল ভ্রমণের মতো কষ্টকর বিষয়ে আগ্রহী হলেন কেন? একটু হাসলেন। তারপর বলতে শুরু করলেন, ‘গতি আর কিছুটা কাছ থেকে দেখার ইচ্ছা।’ ভ্রমণের জন্য হয়তো হাঁটাই ভালো, তাতে গভীরভাবে দেখা যায়, বোঝা যায় অনেক কিছু। কিন্তু সে সময় কিংবা সুযোগ সবার নেই। হাঁটার চেয়ে সাইকেলের গতি কিছুটা বেশি বলে এর সুবিধা নেওয়া যায়। এ সুবিধা কাজে লাগিয়ে ইচ্ছেমতো অনেক কিছু দেখা যায় বলেই সাইকেল চালিয়ে ভ্রমণ করতে পছন্দ করেন কনক আদিত্য।

বরিশাল থেকে কুয়াকাটার এই দীর্ঘ পথে সাইকেল চালিয়ে অনেক কিছু কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে বলে জানালেন তিনি। কী দেখলেন? নদী, মানুষ, বৃক্ষ, মানুষের সামাজিক সম্পর্ক। ‘নদীতে জোয়ার-ভাটা দেখা যায়। অপূর্ব সে ব্যাপার। গাছপালা দেখলেই বোঝা যায় কোন এলাকার লবণাক্ততা কতটা কম বা বেশি। আর মানুষ তো আছেই। কত নদী যে পার হলাম! ফেরিতে কত মানুষের সঙ্গেই না পরিচয় হলো। কথা হলো।’ একনিশ্বাসে বললেন কনক। জানালেন, ব্যক্তিগত গাড়ি কিংবা বিলাসবহুল বাসে চেপে প্রথাগত ভ্রমণে সে সুযোগ হয় না।

গন্তব্য কেন কুয়াকাটা

কনক আদিত্য জানালেন, কয়েকটা বিষয় কাজ করেছে এ ভ্রমণের পেছনে। তবে প্রধান উদ্দেশ্য ছিল গত দেড় দশকে পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে ওঠা কুয়াকাটা কতটা সুন্দরভাবে গড়ে উঠেছে, সেটা দেখা। কী দেখলেন? কিছুটা হতাশার সুর তাঁর কণ্ঠে। ‘পর্যটন গন্তব্য হিসেবে হয়তো আরও ভালো হওয়া উচিত ছিল কুয়াকাটা। আরও আকর্ষণীয় হতে পারত, পরিকল্পিত হতে পারত কুয়াকাটার আবাসন, রাস্তাঘাট, রেস্তোরাঁ। আরও গোছানো এবং পেশাদার হতে পারত সবকিছু। কোথায় যেন একটা ছন্দপতন আছে।’ বললেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

কী প্রয়োজন ছিল কুয়াকাটার? এককথায় উত্তর দেন কনক আদিত্য—দূরদৃষ্টি। ১৫ বছর খুব কম সময় নয়। পর্যটনের উন্নয়নে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যদি শুরুতেই বুঝত, কুয়াকাটার ভবিষ্যৎ আছে, তাহলে কুয়াকাটার সৌন্দর্য অন্য রকমও হতে পারত। এটি প্রাকৃতিকভাবেই অন্য রকম একটি জায়গা, যেখানে একই সঙ্গে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা যায়। আমাদের দেশে এমন জায়গা বিরল। সেটাকে আরও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে গড়ে তোলা প্রয়োজন ছিল বলে মনে করেন কনক আদিত্য।

মন্তব্য করুন