মোহাম্মদ সামছুজ্জামান আরাফাত
মোহাম্মদ সামছুজ্জামান আরাফাতসংগৃহীত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর বন্ধুদের সঙ্গে খাগড়াছড়ি বেড়াতে যাই। এর আগে কখনো আমার বেড়ানো হয়নি। খাগড়াছড়ির সবুজ প্রকৃতি আর পাহাড় দেখে পাহাড়ের প্রতি খুব ভালো লাগা কাজ করে। ভ্রমণ শেষে হঠাৎ একদিন প্রথম আলোতে একটা খবর দেখতে পাই, এভারেস্ট অভিযানের লক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি অভিযাত্রী দল গঠন করবে। এ জন্য আবেদন আহ্বান করা হয়। আমরা চার কি পাঁচজন বন্ধু আবেদন করি। প্রায় শতাধিক ছাত্রছাত্রী নিয়ে শুরু হয় কঠিন এক অনুশীলন। একদিন অনুশীলন করাতে আসেন কাজী হামিদুল হক আর লিপটন সরকার।

তাঁদের কাছে বাংলা চ্যানেলের কথা শুনি। জানতে পারি, টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ থেকে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের ১৬ দশমিক ১ কিলোমিটার সমুদ্রপথ হচ্ছে ‘বাংলা চ্যানেল’। অ্যাডভেঞ্চার গুরু কাজী হামিদুল হক এ চ্যানেল আবিষ্কার করেন। লিপটন সরকার ২০০৬ সালে প্রথম বাংলা চ্যানেল পাড়ি দেন। সে বছর থেকে এখন পর্যন্ত প্রতিবছর তিনি বাংলা চ্যানেল সাঁতরে পাড়ি দেন। শোনার সঙ্গে সঙ্গেই বাংলা চ্যানেলের রোমাঞ্চ ভর করে।

আমরা কেবল প্রস্তুতি নিচ্ছি হিমালয়ে যাওয়ার, তার মধ্যে সমুদ্র অভিযানের গল্প আমার কাছে অসাধারণ মনে হলো। কিন্তু ১৬ দশমিক ১ কিলোমিটার পথ সাঁতারের চিন্তা একবারও কল্পনাতেই এল না। ছোটবেলা থেকে সাঁতার জানলেও মনে এক বিশাল ভয় কাজ করত তখন, এই তো পানিতে কিছু একটা নিচ থেকে টেনে নিয়ে যাবে অথবা কিছুদূর গিয়ে ডুবে যেতে পারি, এ রকম অনেক অজানা ভয়। অনুশীলন শেষ করে জহুরুল হক হলে যাওয়ার পর হলের পুকুরের এক পাড় থেকে আরেক পাড় সাঁতরে যাওয়ার চেষ্টা করি। অনেক কষ্ট করে এ পাড় থেকে আরেক পাড়ে একবার যাওয়ার পর ফিরে আসার সাহস হলো না। পুকুরের পাড়ের ওপর দিয়ে হেঁটে পুকুর ঘাটে পৌঁছাই। অনেক ভয় ও দুর্বল হয়ে হলের রুমে যাই। আর ভাবতে থাকি পুকুরে ১০০ মিটার সাঁতার কাটতে পারছি না, কীভাবে সাগরে ১৬ দশমিক ১ কিলোমিটার সাঁতার কাটব!

বিজ্ঞাপন

যাওয়া হলো না পর্বতারোহণে

এদিকে ধীরে ধীরে আমাদের পর্বত আরোহণের জন্য অনুশীলন শেষ হয়ে আসছিল। আমাদের সাতজনকে পর্বত আরোহণের দলে রাখা হয়েছিল, যার মধ্য থেকে চারজন অন্নপূর্ণা সার্কিট ট্রেকে যাবে। আমার সময়মতো পাসপোর্ট হয়নি। আমার যাওয়া হলো না। প্রথম মিশনে যেতে না পেরে অনেকটা মন খারাপ ছিল। কিন্তু আমি হতাশ হইনি। যে প্রস্তুতিটুকু নিয়েছি, তা যেন হারিয়ে না যায়। চেষ্টা করছিলাম প্রতিদিনের নিয়মিত অনুশীলন চালিয়ে যেতে। শুরু করলাম লম্বা দূরত্বের দৌড়। দেশের ভেতর বান্দরবানের পাহাড়গুলোতে যাওয়ার পরিকল্পনা করি। কেওক্রাডাং, তাজিংডং, সাকা হাফং সব চূড়ায় এক ট্রেকিংয়ে শেষ করেছিলাম। কিন্তু পুরো অ্যাডভেঞ্চারের কোথাও যেন পরিপূর্ণ তৃপ্তি আসেনি। ঘুরেফিরে বাংলা চ্যানেলের কথা মনে পড়ছিল।

বাংলা চ্যানেল অভিযান

তখন ২০১৩ সাল। লিপটন সরকারকে ফোন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে সাক্ষাৎ করে বাংলা চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার স্বপ্নের কথা বলি। খুব খুশি হয়ে লিপটন সরকার পরের দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সুইমিংপুলে এসে সাঁতারের কৌশল দেখিয়ে অনুশীলন করতে বললেন। শুরু হলো সাঁতার অনুশীলন। একদিন অনুশীলন করতে করতে পায়ের পেশিতে টান লেগে প্রায় ডুবে যাচ্ছিলাম। হলের বন্ধুরা এই শীতের মধ্যে সাঁতার কাটতে দেখে ‘পাগল’ বলা শুরু করল। আমার অবশ্য ভালোই লাগল ‘পাগল’ ডাকছে শুনে।

বাংলা চ্যানেল জয়ের অভিযানে নির্বাচিত হতে টানা তিন ঘণ্টা সাঁতার কাটতে হবে। সেটাও মোটামুটি গতিতে সাঁতার কেটে। দৌড়, ট্রেকিং, সাইক্লিং করার সময় ক্লান্ত হয়ে গেলে বসে জিরিয়ে নেওয়া যাবে কিন্তু সাঁতারে ক্লান্ত হলেও বিরতি নেওয়ার সুযোগ নেই। একবার শুরু করলে তা গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত সাঁতার কেটে যেতে হবে। আস্তে আস্তে অনুশীলন চলতে লাগল। ২০১৪ সালের শেষের দিকে এসে আমি টানা তিন ঘণ্টা ফ্রি স্টাইল সাঁতার কাটতে পারলাম। ২০১৪ সালে অবরোধ এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার জন্য আমাদের বাংলা চ্যানেলে সাঁতার কাটতে যাওয়া হয়নি।

default-image

প্রথমবারের রোমাঞ্চ

২০১৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দশম বাংলা চ্যানেল সাঁতারের তারিখ নির্ধারিত হলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক এবং সাঁতার ও ওয়াটার পোলো দলের কোচ শাহজাহান আলীর সহযোগিতায় আমি অংশগ্রহণ করি। নতুন আর পুরোনো মিলে তখন আমরা টিমে ছিলাম ছয়জন সাঁতারু। লিপটন সরকার, মনিরুজ্জামান, ফজলুল কবির সিনা, পারভেজ রশীদ, শাহাদাত বাশার ও আমি।

বাংলা চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার জন্য যখন রওনা হলাম, মনের মধ্যে একটা অনিশ্চিত যাত্রার অনুভূতি কাজ করছিল। এটা ঠিক ভয় না, ভয়কে জয় করার একটা মিশনের মতো। টেকনাফ থেকে আমরা ট্রলারে করে সেন্ট মার্টিন দ্বীপে রওনা দিই। টেকনাফের নাফ নদী পার হওয়ার পর ট্রলার থেকে সামনে আর কিছু দেখা যাচ্ছিল না। যত সামনে এগোচ্ছিলাম আস্তে আস্তে ঢেউ বাড়তে থাকে। এই বিশাল জলরাশি দেখে ভাবছিলাম এখানে তো হাঙর, তিমি বা ক্ষতিকর কোনো সামুদ্রিক প্রাণী থাকতে পারে। সিনা ভাই শুনে হেসেই এগুলো উড়িয়ে দিলেন। বললেন, এখানে ক্ষতিকর প্রাণী নেই এবং ট্রাফিক ফ্রি রুট। অনেক উপভোগ্য ওপেন ওয়াটার সুইমিং রুট। আমাদের দীর্ঘ সমুদ্রসৈকতের পাশে এ রকম একটা ওপেন ওয়াটার রুট সত্যি অনেক বড় সৌভাগ্যের ব্যাপার। সেন্ট মার্টিন পৌঁছানোর পর তিন দিন আমরা অনুশীলন করার সুযোগ পেলাম। নোনা পানিতে সাঁতার কাটতে খুব অস্বস্তি লাগছিল।

২৫ ডিসেম্বর সাঁতারের আগে আমার কাছে মনে হচ্ছিল, এত বিশাল দূরত্ব কীভাবে পাড়ি দেব? বিশাল সমুদ্রের কাছে ক্ষুদ্র নিজেকে সমর্পণ করলাম আর কিছু গল্পের কথা মনে করতে লাগলাম। সাঁতার শুরু করার পর আমি আর আমার উদ্ধারকারী নৌযান একসঙ্গে যাচ্ছিলাম। উদ্ধারকারী নৌযান দিকনির্দেশনা দিচ্ছিল সেই অনুযায়ী সাঁতার কাটতে লাগলাম। সাঁতার কাটছিলাম আর পানির শব্দটুকু উপভোগ করছিলাম। এর মাঝে ঠান্ডা পানির স্রোত। যতটুকু কঠিন ভেবেছিলাম, সত্যিকার অর্থে এত কঠিন লাগছিল না। শুরুতে ঢেউয়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে কষ্ট হচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর তা ঠিক হয়ে যায়।

default-image
বিজ্ঞাপন

দুই ঘণ্টা সাঁতারের পর উদ্ধারকারী নৌকা থেকে বলল দ্বীপ দেখা যাচ্ছে। আমি দেখার চেষ্টা করলাম, কিন্তু দেখতে পারলাম না। তিন ঘণ্টা সাঁতারের পর দ্বীপ স্পষ্ট দেখছিলামআর সাঁতার কাটছিলাম।

কিছু জেল ফিশ গায়ে লাগছিল দ্বীপের কাছাকাছি। পিঁপড়ার কামড়ের মতো কিছুক্ষণ ব্যথা থাকত তারপর আবার স্বাভাবিক হয়ে যেত। ৪ ঘণ্টা ৩৮ মিনিট সাঁতার কাটার পর সেন্ট মার্টিন দ্বীপের বালু যখন হাতের মধ্যে লাগল, সত্যি এটা একটা অবিশ্বাস্য অনুভূতি ছিল, যা কোনো শব্দ দিয়ে বোঝাতে পারি না। এই অনুভূতিটা একান্তই ব্যক্তিগত। বাংলা চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার পর আমার সত্যি নিজেকে অনেক পরিপূর্ণ মনে হচ্ছিল, আমি ভয়কে জয় করতে পেরেছি, নিজেকে অনেক আত্মবিশ্বাসী মনে হলো। সেদিনই আমি মনে মনে সংকল্প করে নিলাম, প্রতিবছর অন্তত একবার আমি বাংলা চ্যানেল সাঁতরে পার হব।

বাংলাদেশের এভারেস্ট

দেখতে দেখতে বাংলা চ্যানেল আমি সাতবার পাড়ি দিয়েছি। প্রতিবার সাঁতরানোর অনুভূতি আলাদা। বঙ্গোপসাগর যেমন সব সময় নতুনভাবে হাজির হয়, তেমনি এই পথে সাঁতারও সব সময় অনিশ্চয়তায় ভরা। প্রতিবার ভিন্ন রকম অভিজ্ঞতা হয় বলেই এই সাগর আমাকে টানে। এই অনুভূতি অনেকটা নির্মল প্রকৃতিতে বুকভরে অক্সিজেন নেওয়ার মতো। প্রতিবছর সাঁতার কেটে আমি যেন অক্সিজেন পাই, আমার অন্য কাজগুলো করতে অনেক উৎসাহ জোগায়।

এভারেস্টে আমার যাওয়া হয়নি, কিন্তু বাংলা চ্যানেলই আমার কাছে বাংলাদেশের এভারেস্ট।

প্র ছুটির দিনে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন