‘সাহসিকতার নাম নাঈমা’ নির্মাণের গল্প

প্রথম আলোর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রতিবছর আলোকিত, সাহসী মানুষদের গল্প বলার জন্য উৎসুক হয়ে থাকি আমি। তথ্যচিত্রে একজন অথবা একদল মানুষের বীরত্বের গল্প বলার সুযোগ পাই। এবারের করোনাকালে বীরত্বের গল্প হয়ে ওঠে করোনার সঙ্গে সম্মুখসারির যোদ্ধাদের কাহিনি। প্রতিবারের মতোই প্রথম আলো সবার সহযোগিতায়, আনিসুল হকের পরিকল্পনায় নির্মাণ করেছি সাহসিকতার নাম নাঈমা দুবার করোনা জয় করে সাহসের সঙ্গে সেবা দিয়ে চলেছেন ডা. নাঈমা সিফাত, তাঁকে নিয়েই তথ্যচিত্র।

করোনাকালে যেসব সাহসী যোদ্ধা অকুতোভয় কাজ করে চলেছেন, যাঁদের সেবায় লাখো প্রাণ নিরাপদ থেকেছে, তাঁদের মধ্যে থেকে কাহিনি নির্বাচনের কথা হয়েছিল প্রথম আলো ২২তম বর্ষপূর্তির প্রস্তুতিসভায়। প্রথমেই সবার মনোযোগ আকর্ষণ করে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. নাঈমা সিফাতকে নিয়ে প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি।
ডা. নাঈমা পরপর দুবার করোনা জয় করেও সেবা দিয়ে চলেছেন নিয়মিত।

default-image
বিজ্ঞাপন

তথ্যচিত্র নির্মাণের প্রস্তুতি

আমরা ঠিক করলাম ২৫ অক্টোবর তথ্যচিত্রের দৃশ্যধারণ শুরু করা হবে। অগ্রবর্তী দল পাঠালাম দুই দিন আগেই। প্রধান সহকারী পরিচালক কে এম কনকের নেতৃত্বে একটি দল টেকনাফে যখন পৌঁছেছে, তখন রীতিমতো ঝড়বৃষ্টি। উপকূলে ৪ নম্বর বিপৎসংকেত। কীভাবে শুটিং করব, চিন্তায় পড়ে গেলাম। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বাকি মাত্র কয়েকটা দিন, ঝড়বৃষ্টি যা হোক শুটিং থামানো যাবে না। প্রথম আলোর টেকনাফ প্রতিনিধি গিয়াস উদ্দীনের সহযোগিতায় ডা. নাঈমা সিফাতের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় অনুমতি নিয়ে শুটিংয়ের প্রস্তুতি শুরু হলো। আমি আর চিত্রগ্রাহক বরকত হোসেন টেকনাফে পৌঁছালাম শুটিংয়ের আগের দিন সকালে।

শুটিংয়ের আগে আমার প্রধান চ্যালেঞ্জটা থাকে যাঁকে নিয়ে তথ্যচিত্র হচ্ছে তাঁর সঙ্গে হৃদ্যতা বাড়ানো, জড়তা ভেঙে একধরনের বন্ধুত্বপূর্ণ আবহ তৈরি করা, যেন তিনি ক্যামেরা, আলো আর শুটিং যন্ত্রপাতির দূরত্ব ভুলে যান, যেন সাবলীলভাবে মনের কথাটা বলতে পারেন।

ততক্ষণে ডা. নাঈমা সিফাতের সম্পর্কে আমি যতটুকু পারি তথ্য সংগ্রহ করেছি। জেনেছি তাঁর সাহসিকতার কথা। তাঁর স্বামী প্রকৌশলী মোহাম্মদ লোকমানের সহযোগিতার কথাও শুনেছি। তিনি ঢাকায় চাকরি করেন, কিন্তু নাঈমা করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর ছুটি নিয়ে এসেছিলেন টেকনাফে। দেখাশোনা করেছেন স্ত্রী ও শিশুসন্তানের।

টেকনাফ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কোয়ার্টারে তাঁর বাসায় গেলাম গত ২৪ অক্টোবর দুপুরের পর, দেখা হলো তাঁর সঙ্গে, গল্প হলো। জানতে থাকলাম তাঁর কষ্টের সেই মুহূর্তগুলোর কথা।

দৃশ্যায়ন যেভাবে

আমাদের বড় চ্যালেঞ্জটা দাঁড়াল এসব মুহূর্তকে কীভাবে দৃশ্যে রূপান্তর করব! কোভিড-১৯ রোগী হিসেবে শনাক্ত হওয়ার পর ১৪ মাস বয়সী মেয়েকে নিয়ে এমন সব মুহূর্ত পার করছেন, যা দিয়ে একটি চলচ্চিত্রই তৈরি করা যায়। কিন্তু সেই সব দৃশ্য এই সময়ের মধ্যে পুনর্নির্মাণ (রিক্রিয়েট) করা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি একজন চিকিৎসক, একজন মা, একজন করোনাজয়ীকে দিয়ে হুবহু অভিনয় করানোও কতটা যুক্তিযুক্ত হবে ভাবতে লাগলাম।

বিকেলের দিকে টেকনাফ সমুদ্রসৈকতে গেলাম, সমুদ্রপারে হাঁটতে হাঁটতে আকাশ–পাতাল চিন্তা করছি। হঠাৎ মনে উঁকি দিল প্রথম দৃশ্যের আইডিয়াটা। ডা. নাঈমা আমাকে বলেছিলেন, তিনি ঘরবন্দী দিনগুলোতে ধ্যানচর্চা করতেন। মন–ছবি দেখতেন, কীভাবে বন্দিজীবন থেকে সুস্থ–স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন, মেয়েকে নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে এগোবেন। আমি নিজেও প্রায় নিয়মিত ধ্যান করি। এই মিলটা আমাদের এক ধাপ এগিয়ে দিল। আমার মনে হলো, ঘরে বসে মেডিটেশনে তিনি নিশ্চয়ই খোলা আকাশ দেখতেন, হয়তো মন–ছবিতে বাসার পাশের সমুদ্রতীরে নতুন জীবনের আহ্বান শুনতেন। তথ্যচিত্রের প্রথম দৃশ্যই হবে এটা।

default-image

২৫ অক্টোবর ভোরে শুরু হলো দৃশ্যধারণ সমুদ্রতীরেই। ততক্ষণে প্রকৃতিও আমাদের সঙ্গে একাত্ম। বৃষ্টির বদলে সূর্য উঁকি দেওয়া শুরু করেছে। আলোর ওপর আস্থা রেখেই শুরু হলো শুটিং। সমুদ্রপাড়ে শুটিং শেষ করে, টেকনাফ হাসপাতাল ও ডা. নাঈমার বাসায় শুটিং করতে করতে দিনের আলো ফুরাল। সন্ধ্যার পর লাইট প্রস্তুত করে প্রথমেই ডা. নাঈমার সাক্ষাৎকারের অংশের চিত্রায়ণ শুরু করলাম। তিনি বলতে শুরু করলেন তাঁর অভিজ্ঞতার কথা। খুবই আনুষ্ঠানিক শোনাল। যেভাবে মানুষ ক্যামেরার সামনে নিজেকে উপস্থাপন করেন, ঠিক যেন সেভাবে। কিন্তু কিছুতেই আমাদের সেটা পছন্দ হচ্ছিল না। আমি চাচ্ছিলাম নাঈমার মধ্যে লুকিয়ে থাকা বেদনা, সাহসিকতার উৎস খুঁজে বের করতে।

default-image
বিজ্ঞাপন

ক্যামেরা বন্ধ করে ডা. নাঈমাকে আবার সহজ করে তোলার চেষ্টা করলাম। আমাকে বলা গল্পের আর অনুভূতির সূত্র ধরিয়ে দিলাম। তিনি কিছুটা সময় চাইলেন। শুটিং দলের বেশির ভাগ ক্রুকে স্পট থেকে বের করে দিলাম। শুধু প্রয়োজনীয় কয়েকজনকে রেখে অপেক্ষা করতে লাগলাম। একসময় তিনি নিজেকে প্রস্তুত করে আবার শুরু করলেন। এমন সব কথা আর অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ হলো, আমি মনিটরের দিকে আর চোখ রাখতে পারছিলাম না, ঝাপসা হয়ে গেল চোখ। পাশে তাকিয়ে দেখি ডিওপিসহ (চিত্রগ্রাহক) সবার চোখ ভেজা। শুনলাম দুবার করোনা জয় করার গল্প, সাহসিকতার সঙ্গে সেবা দিয়ে চলার কথা।

default-image

ঢাকায় ফিরে পপকর্ন এন্টারটেইনমেন্টের এডিটিং প্যানেলে টানা কয়েক দিন ধরে সম্পাদনা করলেন টিপু সুলতান, এরপর চিরকুট ব্যান্ডের জাহিদ নীরব করলেন সংগীত, সঙ্গে যোগ হলো আমার টানা কয়েক নির্ঘুম রাতের পরিশ্রম। অবশেষে প্রস্তুত হলো সাহসিকতার নাম নাঈমা তথ্যচিত্রের প্রথম খসড়া। প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দেখার পর আবার প্রয়োজনীয় সম্পাদনা করলাম। চূড়ান্ত তথ্যচিত্র তৈরি করলাম। প্রথম আলোর ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে, অর্থাৎ ৪ নভেম্বর শুরু হলো দর্শকের প্রতিক্রিয়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শতভাগ ইতিবাচক ও উৎসাহমূলক মন্তব্য সত্যিই বিরল, যা ঘটল এই তথ্যচিত্রের ক্ষেত্রে। এখনো সারা দেশের মানুষ, বিশ্বের বাঙালিরা করোনা মহামারির এই সম্মুখসারির যোদ্ধাকে জানাচ্ছেন অভিবাদন।

লেখক: নির্মাতা

মন্তব্য পড়ুন 0