বিজ্ঞাপন
default-image

গুণীজন কহেন, ‘রং ইজ রং ইভেন এভরি ওয়ান ইজ ডুয়িং ইট; রাইট ইজ রাইট ইভেন নো ওয়ান ইজ ডুয়িং ইট’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবার বড় পরিবারের ছবি। দ্বিতীয় ডোজের সান্ত্বনা নিয়ে মায়ের কাছে, নানি-দাদির কাছে মানুষ ফিরছে। শহরে এবার ঈদপালনের ধৃষ্টতা।

আমার শ্বশুর কিছুদিন আগে গত হয়েছেন। আমরা কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে ঢাকা ছাড়ব না। কিন্তু মধ্যম হয়ে তফাতে চলে উত্তম কিছু আর পাওয়ার আশা নেই। তাই ঈদের পরদিন ঢাকা ছেড়ে ঢাকার অদূরে শ্বশুরবাড়ি রওনা হলাম। অনেক দিন পর দেড় ঘণ্টায় বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে মুন্সিগঞ্জ। পথে পথে আনন্দযাত্রা। নতুন লেহেঙ্গা পরে ছোট্ট শিশু মায়ের সঙ্গে, খালার সঙ্গে, বোনের হাত ধরে গাড়ির প্রতীক্ষায়। গলায় তার পাথর বোনা গয়না। নতুন জুতো, নতুন ক্লিপ। হয়তো ঈদের কেনাকাটার ভিড়ে এই শিশুর বোরকা পরা মাকেই দেখেছি টিভিতে। মোটরসাইকেলে ছোট সংসার, সুখের সংসার গুছিয়ে নতুন জামা ছুটছে ডানা মেলে।

গ্রাম দিয়ে একটি বাক্য রচনা করো, ‘গ্রামে করোনা নেই’। সবার চোখে সেই শক্তি, সেই বল। ফ্রান্সে নাকি মুখে নিকাব পরলে ১৫০ ইউরো জরিমানা করে; বেলজিয়ামে সাত দিনের জেল, সঙ্গে জরিমানা ১ হাজার ৩৭৮ ইউরো। এই গ্রামে অর্থদণ্ড নেই, কিন্তু কেউ মাস্ক পরে এলে হাসির রোল পড়ে। সামাজিক দূরত্ব এখানে সামাজিক অনাচার যেন। তাই ‘হোয়েন ইন রোম, ডু অ্যাজ দ্য রোমানস ডু’।

গ্রামে বিকেলে শুরু হলো ঈদমেলা। খেতের আইল মানুষে কিলবিল। খেতের মধ্যে ফুটবল খেলা হচ্ছে। প্রায় ৫০ জন খেলোয়াড়; কারণ, সবাই খেলতে চায়। গাছের ডাল ভেঙে গড়া হয়েছে গোলপোস্ট। বাচ্চারা এই গরমে ঈদের জামা পরে অপেক্ষমাণ। এরপর হবে হাঁস ধরা প্রতিযোগিতা। কিছু মানুষের চোখ বেঁধে দেওয়া হবে আর মাঝখানে ছেড়ে দেওয়া হবে একটি হাঁস। যে এই হাঁস ধরতে পারবে, হাঁসটি তাঁর।

হাঁসটি ছেড়ে দেওয়া হলো। বাঁচার জন্য প্রাণপণ ছুটছে সে কাপড়ের তৈরি ‘কলোসিয়াম’–এর ভেতর। মালকোঁচা দিয়ে লুঙ্গি পরে নিরীহ হাঁসের পিছে ছুটছে বাংলার গ্ল্যাডিয়েটররা। সিটকমের মতো রেকর্ডেড হাততালি নয়। স্বতঃস্ফূর্ত জনতার করতালিতে হাঁস আরও ভীত হয়ে ছটফট করছে বাঁচার তাগিদে। দর্শকেরা চিৎকার করে বলছে, ‘যেদিকে চিৎকার বেশি বুঝবেন, সেদিকেই হাঁস’।

খেলা চলতে চলতে আবহাওয়ার পূর্বাভাসকে সত্যি করে প্রথমে দমকা হাওয়া, তারপর ছোট ছোট বৃষ্টির ফোঁটা। শত শত মানুষের মধ্যে শুধু আমাদের মুখে মাস্ক, বৃষ্টিতে জ্বরসর্দির দুশ্চিন্তা, ধুলায় হাঁচি–কাশি। চোখের সামনে গাছভরা ছোট ছোট আম ঝড়ে মাথা দোলাচ্ছে। একটু আগে খেলাম লিচুর মতো মিষ্টি, হলুদ-লাল রঙের ছবির মতো আম। এমন রঙিন আম মাটির হয় বলেই জানতাম এতকাল, যা থাকে বসার ঘরের শোকেসে।

ঝড়ে তালগাছে বাবুই পাখির বাসাগুলো শহুরে বাড়ির উইন্ডচাইমের মতো দোদুল্যমান। অচেনা ঘ্রাণের ঠান্ডা বাতাস, বাঁশঝাড়ের সম্ভাষণ, উড়োচিঠির মতো উড়ো শুকনো পাতা; তার মধ্যে পা চালিয়ে বাড়ি ফেরা।

‘ঝড় এল, এল ঝড়

আম পড়, আম পড়

কাঁচা আম, ডাঁসা আম

টক টক, মিষ্টি

এই যা, এল বুঝি বৃষ্টি!’

বলতে না বলতেই এত্ত বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটা আঁছড়ে পড়ল আঙিনায়। সঙ্গে টুপ করে আম পড়ল এক–দুইটা। কী অদ্ভুত জীবন এখানে! ছড়ার মতো, গানের মতো।

দেখতে দেখতে একটু একটু করে আমরা বুঝতে থাকলাম, কিসের টানে গ্রামমুখী মানুষদের ফেরানো গেল না কিছুতেই। নাড়ির টানটা অনুভব করলাম নাড়িতে। তাঁদের এই ঈদের সঙ্গে আমাদের চিরচেনা ঈদের কোনো মিল নেই। কানে বাজতে লাগল,

‘এই তো সময় ফিরে আসার

স্বপ্ন যাবে বাড়ি আমার...

মন ভবে চল ফিরে আবার

স্বপ্ন যাবে বাড়ি আমার।’

প্র ছুটির দিনে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন