বিজ্ঞাপন

২. নর-নারীর শালীন প্রেম এবং দাম্পত্য কলহ

default-image

হুমায়ূন আহমেদ সব উপন্যাসে বিশেষ করে নর-নারীর প্রেম, বিরহ ও দাম্পত্য সম্পর্ক চিত্রায়ণে আখ্যান-শরীরের চারপাশে সর্বদা একধরনের স্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি করে রাখতেন। তিনি কাহিনি পরিকল্পনার সময়ে বাঙালির রুচি এবং তাদের পছন্দকে বিশেষভাবে মনে রাখতেন। এই বিবেচনায় প্রেম ও দাম্পত্য সম্পর্কের দৃশ্য বর্ণনায় নর-নারীর শালীন ও স্থূলতামুক্ত চিত্র এঁকেছেন তিনি। তিনি প্রেম ও যৌনতার এমন শিল্পিত ব্যবহার করেছেন, যা কখনো অপ্রয়োজনীয় বা আরোপিত হয়ে ওঠেনি। নিজের সৃষ্ট নাটকের মতোই তাঁর উপন্যাস সবাই একসঙ্গে পাঠ ও উপভোগ করতে পারে। এ প্রসঙ্গে লেখক বলেছেন, ‘বাঙালির স্বাভাবিক একটা লজ্জাবোধ আছে। এটা চিরন্তন। আমি লেখালেখিতে সব সময় এই সত্য মেনে চলতে চেষ্টা করি।’

প্রায় প্রতি ক্ষেত্রেই নারীদের তিনি কাহিনির কেন্দ্রে রেখেছেন এবং তাদের দাপটকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন

অন্যদিকে দাম্পত্যদৃশ্যে শান্তির চেয়ে কলহের চিত্রই বেশি এঁকেছেন তিনি। কেননা, পেটের ক্ষুধাকে জয় করতে না পারলে যে মনে সুখ আসে না, এই বাস্তব তথ্য হুমায়ূন তাঁর পাত্র-পাত্রীদের দিয়ে পরিবেশন করিয়েছেন। প্রায় প্রতি ক্ষেত্রেই নারীদের তিনি কাহিনির কেন্দ্রে রেখেছেন এবং তাদের দাপটকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, লেখক ‘অচিনপুর’ উপন্যাসের লালবউ তথা এলাচির মাধ্যমে কথাসাহিত্যে নারীর ব্যক্তিত্বের ঘোষণা এবং নারীর ক্ষমতায়নের এক আশ্চর্য ‘ইউটোপিয়া’ নির্মাণ করেছেন।

৩. ইতিহাসের ধূসর আলোয় মুক্তিযুদ্ধের নতুন গল্প

default-image

হুমায়ূন আহমেদ উপন্যাস ও গল্পে ইতিহাসের অনালোকিত পটে মুক্তিযুদ্ধের নতুন গল্প শুনিয়েছেন। এসব গল্পে কল্পনা ও বাস্তবের সঙ্গে জড়াজড়ি করে মিশে আছে অগ্নিঝরা সেই দিনগুলোতে সাধারণ মানুষের স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের অনুন্মোচিত ছবি। তিনি ঐতিহাসিক উপন্যাসে ঐতিহাসিক ঘটনার পাশে সমান্তরাল আরেকটি মানবিক ধারা তৈরি করেছেন। এ জন্য ‘বাদশাহ নামদার’-এ সম্রাট হুমায়ূনের রাজ্য উদ্ধারের ঘটনার পাশে হরিশঙ্কর ও অম্বার মানবীয় আখ্যান মুখ্য হয়ে ওঠে। একইভাবে ‘মধ্যাহ্ন’তে দেশভাগের মতোই উজ্জ্বল হয় বারবনিতা চানবিবির মানবীয় গল্প এবং ‘মাতাল হাওয়া’তে পূর্ব পাকিস্তানের উত্তাল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয় ফরিদ ও নাদিয়ার গল্প। মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসে তিনি ঘটনার এপিক বিস্তারে না গিয়ে ইতিহাসের ধূসর প্রান্তরে ভিন্ন এক দৃষ্টিকোণ ব্যবহার করে এর গায়ে অন্য রকম আলো ফেলেছেন। এই আলোয় বেরিয়ে এসেছে যুদ্ধকালীন মানুষের নতুন একধরনের বাস্তবতা। লেখক যুদ্ধ পরিস্থিতির, যেমন হত্যা, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ, লুটপাট প্রভৃতির বর্ণনা তেমন একটা দেননি। এসবের বাইরে জীবনের আরেকটি বহমান ধারা তিনি নীরব ঝরনাধারার মতো বয়ে নিয়ে গেছেন। উপন্যাসে রাজাকার, ইমাম-মাওলানা প্রমুখের চরিত্র নির্মাণে হুমায়ূন তাঁর আত্মজৈবনিক অভিজ্ঞতা ব্যবহার করেছেন। বিশেষ করে রাজাকার প্রসঙ্গে তিনি যে কঠিন বাস্তবতা তুলে এনেছেন, তাতে তাঁর সাহসের প্রশংসা না করে পারা যায় না। হুমায়ূন দেখিয়েছেন ব্যক্তিগত লোভ চরিতার্থ করতে রাজাকাররা যেমন পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করেছে, তেমনি তাদের মধ্যে কেউ কেউ বাধ্য হয়েও পাকিস্তানকে সমর্থন করেছে। ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাসে কারণে কতিপয় ইমাম-মাওলানা-পীর মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করেছে সত্য। কিন্তু এদের মধ্যে অনেকে পাকিস্তানের প্রতি সমর্থন দেখালেও প্রকৃতপক্ষে তারা ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক!

হুমায়ূন ইতিহাসের খল চরিত্রগুলোকে নিয়ে একদিকে ঠাট্টা-মশকরা করেছেন, অন্যদিকে মহৎ চরিত্রগুলোকে দিয়েছেন মহত্ত্বের অভিজ্ঞান

এমন বহু সত্য কালের ধুলা পরিষ্কার করে পাঠককে পরিবেশন করেছেন হুমায়ূন। লেখকের ‘শ্যামল ছায়া’ উপন্যাসের রাজাকার থেকে মুক্তিযোদ্ধা হয়ে ওঠা হাসান আলীর আত্মধিক্কার এর প্রামাণিক উদাহরণ। হুমায়ূন ইতিহাসের খল চরিত্রগুলোকে নিয়ে একদিকে ঠাট্টা-মশকরা করেছেন, অন্যদিকে মহৎ চরিত্রগুলোকে দিয়েছেন মহত্ত্বের অভিজ্ঞান।

৪. অসাম্প্রদায়িকতায় মোড়ানো মানবিক চরিত্র

হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাস ও গৌরবগাথাকে ধারণ করে তাঁর কথাসাহিত্যে আমৃত্যু মুক্তিযুদ্ধসহ একাধিক জাতীয় আদর্শকে লালন করেছেন। এর ফলস্বরূপ তাঁর উপন্যাসের একটি দীর্ঘ এলাকা প্লাবিত হয়েছে অসাম্প্রদায়িকতার মানবিক রসে। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্পিরিটকে মনে রেখে তিনি মুক্তিযুদ্ধ ও ইতিহাসভিত্তিক কয়েকটি উপন্যাসে জাতি-ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ অতিক্রম করে বেশ কিছু মানবিক চরিত্র নির্মাণ করেছেন। লেখকের ‘শ্যামল ছায়া’, ‘অনিল বাগচীর একদিন’, ‘১৯৭১’, ‘মধ্যাহ্ন’, ‘মাতাল হাওয়া’, ‘জোছনা ও জননীর গল্প’, ‘দেয়াল’ প্রভৃতি উপন্যাসে সৃষ্ট চরিত্রগুলো অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের ষোলো আনা প্রতিচ্ছবি ধারণ করে। ‘শ্যামল ছায়া’ উপন্যাসে রাজাকারে নাম লেখানো হাসান আলীকে পাকিস্তানিদের অত্যাচার-নির্যাতন সম্পর্কে সতর্ক করিয়ে মসজিদের ইমাম উচ্চারণ করেন ইসলাম ধর্মের এই আপ্তবাক্য, ‘শুনতেছি রাজাকার বড় অত্যাচার করে। মানুষ মারে, লুটপাট করে, ঘর জ্বালায়। দেইখো বাবা, আল্লাহর কাছে জবাবদিহি হইবা। আখেরাতে নবীজির শেফায়েত পাইবা না।’ এরপরও মুনিবের আদেশে রাজাকারে যোগ দিয়ে এলাকার সতীশ পাল, কানু চক্রবর্তী ও পণ্ডিত মশাইয়ের বাড়িতে আগুন লাগানোর পর মানবতার মহান সত্তায় রূপান্তরিত মুক্তিযোদ্ধা হাসান আলীর অনুতাপ ও আত্মধিক্কারের মাধ্যমে লেখক ঘোষণা করেন বিশ্বমানবতার চিরকালীন জয়। একই উপন্যাসে বিনা অপরাধে হিন্দুর ঘরে রাজাকার কমান্ডার কেরামত মাওলার আগুন না লাগানোর দৃপ্ত ঘোষণা বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক মানবীয় দলিল। ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ উপন্যাসে লেখক ইতিহাস ও শিল্পের যুগপৎ বাঁধনে বেঁধেছেন বাঙালির চিরকালীন সম্প্রীতিকে। এসব ঘটনা ও চরিত্র বাংলাদেশের হাজার বছরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে ধারণ করে বলে পাঠক এগুলোর সঙ্গে লীন হয়ে যান।

৫. নতুন বাংলা আখ্যানে বাঙালির গল্প

হুমায়ূন গল্প বলার কৌশল জানতেন। তিনি এ-ও জানতেন যে পাঠককে কোথায় থামিয়ে দিতে হয় এবং উৎকণ্ঠায় রেখে কত বিচিত্রভাবে তাদের কৌতূহল বাড়ানো যায়। নতুন আখ্যান তৈরি করে তার মাধ্যমে তিনি বাঙালির চিরদিনের কান্না-হাসিকে পাশাপাশি উপস্থাপন করেছেন। লেখক কাহিনি সংঘটনের চেয়ে গল্পের জমাট বাঁধানোর দিকেই এগিয়েছেন বেশি। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তার আখ্যান হয়েছে নির্মেদ ও ডালপালাহীন। উপন্যাসের গল্পটিতে ব্যাখ্যা নয়, তিনি কেবল ঘটনার নির্মোহ বর্ণনা দিয়েছেন। কারণ, ব্যাখ্যা করার এই দায়িত্ব বরং তিনি সর্বদাই দিয়ে রাখেন পাঠকের ওপর। এটাকেই বলে ঘটনার সঙ্গে পাঠকের অন্তর্ভুক্তি। ঘটনা বিশ্লেষণে তিনি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছেন পাত্র-পাত্রীর দৃষ্টিকোণ। তিনি দৃশ্যমান বর্ণনায় যেমন ইঙ্গিতময় ছবি আঁকতে পারেন, আবার ইঙ্গিতময় বর্ণনার মধ্যে একইভাবে দৃশ্যমান ছবি জুড়ে দেন। হুমায়ূনের আখ্যানের গল্পটি শেষ করে পাঠক সুখনিদ্রা যেতে পারেন না। তাঁদের অনেকক্ষণ ঘোরগ্রস্ত অবস্থায় থাকতে হয়। আখ্যানের গল্পটিতে হুমায়ূন একই সঙ্গে মায়া (এমপ্যাথি) ও সম্মোহন তৈরি করেছেন। বাংলা কথাসাহিত্যের আখ্যানে গল্পকে হঠাৎ থামিয়ে দেওয়ার নতুন কৌশল সৃষ্টি করেছেন হুমায়ূন। নাটকীয়তা ও অতিনাটকীয়তার এমন বিচিত্র ব্যবহার হুমায়ূন আহমেদ ছাড়া বাংলা সাহিত্যে এত বিচিত্রভাবে কেউ করেননি। প্রতিটি উপন্যাসের কাহিনি তিনি শেষ করেছেন মুক্ত উপসংহার রীতিতে।

বাংলা কথাসাহিত্যের আখ্যানে গল্পকে হঠাৎ থামিয়ে দেওয়ার নতুন কৌশল সৃষ্টি করেছেন হুমায়ূন

বিশ্বসাহিত্যের প্রায় সব তত্ত্ব তিনি ব্যবহার করেছেন, কিন্তু কথা বস্তুকে সেসব তত্ত্বে জড়িয়ে অকারণ আড়ষ্ট করেননি। যেমন ‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাসের চার-চারটি মৃত্যুর কারণ শেষে পাঠককে যেমন করে ভাবতে হয়, একইভাবে ‘দেয়াল’-এর জিয়া হত্যার সঙ্গে লেখকের জোড়া লাগানো স্ত্রী-বুদ্ধির কী সম্পর্ক থাকতে পারে, তা নিয়েও গভীর ভাবনার মধ্যে পড়তে হয়। এভাবে লেখক উপসংহারটিকে রহস্যঘন করে পাঠককে চিরকালের ভাবনার জগতে ছেড়ে দেন।

৬. মানুষের ভালো গুণের প্রতি পক্ষপাতিত্ব

মানবচরিত্রের খারাপ অংশকে হুমায়ূন খুব একটা গুরুত্ব দেননি। বাংলা সাহিত্যে কল্লোল যুগ ও তার পরবর্তী প্রায় দুই দশক মানুষের চরিত্রের নেতিবাচক দিকই উপস্থাপিত হয়েছে বেশি। কিন্তু হুমায়ূন মানুষের চরিত্রের এই খারাপ অংশের অনেকটা বাদ দিয়ে উপস্থাপন করার পক্ষপাতী ছিলেন। তিনি দেখিয়েছেন প্রত্যেক খারাপ মানুষের মধ্যে একজন ভালো মানুষ থাকে। তারপরও মন্দ বৈশিষ্ট্যের যেটুকু তিনি ধরে রাখেন, তার প্রায় সবটুকু ছাপিয়ে শেষ পর্যন্ত এর মানবিক গুণাবলিই প্রধান হয়ে ওঠে। চরিত্র থেকে এভাবে মন্দ বৈশিষ্ট্য বাদ দেওয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘যেসব চরিত্র তৈরি করি, তাদের মানবিক গুণই প্রধান হয়ে দাঁড়ায়...। আমার মনে হয় মানবচরিত্রের এমন সব বড় দিক আছে, যার স্পর্শে তার যাবতীয় দোষ, যাবতীয় ত্রুটি ঢাকা পড়ে যায়।’ হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্ট প্রায় সব চরিত্র লেখকের নিজের অভিজ্ঞতায় দেখা এবং তাঁর পরিচিত জগতের মানুষ।

তিনি একটি খারাপ চরিত্রকেও অবিমিশ্র মন্দ বৈশিষ্ট্য দিয়ে নির্মাণ করেননি

এ ছাড়া তিনি চরিত্র পরিকল্পনার কেন্দ্রে রেখেছেন নোবেল বিজয়ী মার্কিন ঔপন্যাসিক জন স্টেইনবেক, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রবীন্দ্রনাথকে। মানুষের শুভবুদ্ধির প্রতি স্টেইনবেকের সীমাহীন আস্থা ও প্রগাঢ় মমতা লক্ষ করেছেন হুমায়ূন। বিভূতিভূষণের সৃষ্ট পরিচ্ছন্ন চরিত্র তাঁকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করেছে এবং ‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ। সে বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত রক্ষা করব...’—মানবজাতির প্রতি রবীন্দ্রনাথের এই অন্তিম ইতিবাচক মূল্যায়ন তাঁর সামনে আশার বাতিঘর জ্বেলে ধরছে। তিনি একটি খারাপ চরিত্রকেও অবিমিশ্র মন্দ বৈশিষ্ট্য দিয়ে নির্মাণ করেননি। হুমায়ূন কোনো মহৎ চরিত্রে ইচ্ছা করে হীনতা যেমন আরোপ করেননি, অনুরূপভাবে কোনো হীন চরিত্রের গায়েও অকারণ মহত্ত্বের আলগা প্রলেপ যুক্ত করেননি। তিনি বিশ্বাস করেন, ‘মানুষকে চেষ্টা করে মহৎ হতে হয় না, মহত্ত্ব নিয়ে সে জন্মেছে।’ এরূপ পরিচর্যার ফলে তাঁর চরিত্রগুলো হয়ে উঠেছে প্রতিনিধিস্থানীয়।

default-image

৭. খাঁটি বাংলা ভাষায় গল্পের বুনন

নিজের বানানো বাংলা ভাষার নতুন রীতির মাধ্যমে হুমায়ূন পাঠককে একরকমের অক্সিজেন সরবরাহ করেছেন। তাঁর ভাষাকে বলা যায় বাংলা চলিতরীতির এক পরিবর্তিত ভঙ্গি। ভাষা কঠিন করে লেখা সহজ, কিন্তু সহজ করে লেখা কঠিন। ভাষার ওপর বিস্তর দখল না থাকলে এর সহজ রূপ তৈরি করা যায় না। হুমায়ূন বিজ্ঞানের ছাত্র হলেও বাংলা ভাষার ওপর তাঁর ভিন্নমাত্রিক দক্ষতা ছিল। বাংলা কথাসাহিত্যে ভাষার দীনতা ছিল দীর্ঘদিনের। গোলাম মুরশিদ কথাসাহিত্যের বর্ণনা ও সংলাপ উভয় ক্ষেত্রেই এই দীনতার স্বরূপ উদ্‌ঘাটন করেছেন। হুমায়ূন মুখের ভাষা ও লেখার ভাষার মধ্যকার দূরত্বকে কমিয়ে এনেছেন। ঔপনিবেশিক আমলে গড়ে ওঠা ভাষাকাঠামোর বিপরীতে তিনি ব্যবহার করেছেন ছয় শ বছরের বাঙালি জনগোষ্ঠীর মূল বাংলা ভাষা। তাঁর ব্যবহৃত ছোট ও সরল বাক্য খাঁটি বাংলা ভাষার স্বভাবেরই বিশিষ্ট নমুনা। এর সঙ্গে পূর্ববঙ্গীয় রীতি যুক্ত করার ফলে হুমায়ূনের ভাষা পেয়েছে বাংলা ভাষার এক বিশিষ্ট ভঙ্গি। পূর্ববঙ্গীয় রীতির বাংলা ভাষায় কথ্যরীতির শব্দ বেশি। তিনি লিখেছেন সাধারণ পাঠকের কথা চিন্তা করে। ফলে এই ভাষা পুস্তকি ওজন পরিহার করে হয়ে উঠেছে নিরেট গণমানুষের নিত্যব্যবহারের ভাষা।

তাঁর উপন্যাস পাঠকালে মনে হয় কানের কাছে বসে কেউ একজন অবিরাম কথা বলে যাচ্ছে

সংলাপ তৈরি করেছেন তিনি মুখের ভাষার মাপে। হুমায়ূন টেলিভিশন নাটকে গণজোয়ার এবং বাংলা চলচ্চিত্রে সুস্থ ধারা ফিরিয়ে এনেছিলেন। এসব মাধ্যমের পাত্র-পাত্রীদের সংলাপ তাঁর উপন্যাসের সংলাপকে প্রভাবিত করেছে। তিনি ভাষার মধ্যে ব্যবহার করেছেন হাস্যরস, ব্যঙ্গ-কৌতুক, শ্লেষ, এপিগ্রাম, উইট ইত্যাদি। তাঁর উপন্যাস পাঠকালে মনে হয় কানের কাছে বসে কেউ একজন অবিরাম কথা বলে যাচ্ছে। বিষয়ের গল্পটি যতই দুর্বোধ্য হোক না কেন, ভাষার সরলতায় পাঠকের কাছে তা অনায়াস পাঠ্য হয়ে ওঠে।

বিষয় নির্বাচন এবং উপস্থাপনার ধরন—উভয় দিক বিবেচনায় হুমায়ূন আহমেদ বাংলা কথাসাহিত্যের এক স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর। গল্পপ্রেমী বাঙালি পাঠক তাঁর উপন্যাস পাঠের মাধ্যমে স্বতন্ত্র আস্বাদ লাভ করেছেন। কথাসাহিত্য নির্মাণে হুমায়ূন প্রচলিত প্রথা ভেঙেছেন। এই শৃঙ্খলা ভাঙার কারণেই তাঁর উপন্যাসে এসেছে অন্য সুর, বিচিত্র প্রসঙ্গ, ভিন্নমাত্রা এবং স্বতন্ত্র উপস্থাপন।

প্র ছুটির দিনে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন