default-image

অমাবস্যার আলো। গল্পের শিরোনাম বলতেই ছোট ভাই অমলকে থামিয়ে দিয়েছিল বড় ভাই ভূপতি। অমাবস্যার আলোতে চাঁদ, তারা, অমাবস্যা কিছুই যখন নেই, তখন সেটা নিয়ে চিন্তা বা লেখার কী আছে। এর চেয়ে ছোট ভাই অমলের বিয়ে করে ফেলাই ভালো। বড় ভাই হিসেবে ভূপতি সেই মতামতও জানিয়ে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের ‘নষ্টনীড়’ গল্পে। এ গল্প অবলম্বনে ১৯৬৪ সালে নির্মিত হয়েছিল চারুলতা চলচ্চিত্র। অন্ধকার বা কালোর পেছনে রহস্য কাজ করে। এর ভেতরে আলোর উপস্থিতি বোঝার কথা না অনেকেরই। এই কালো রঙের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন বার্তাও পৌঁছে দেওয়া হয় সমাজে। খোলা দৃষ্টিতে কালো হলো শক্তিশালী, শোক কিংবা অভিজাত রং। এটি সীমানা এবং কর্তৃত্বের রং। যদিও কৃষ্ণরঙের মাধ্যমে নেতিবাচক বহিঃপ্রকাশ হয় বেশি, এর আকর্ষণও কম না।

পাশ্চাত্যে শোকের প্রতীক হিসেবেই পরিচিত ছিল কালো পোশাক, ১৯২৬ সাল পর্যন্ত। এই সময়ে ফরাসি ফ্যাশন ডিজাইনার কোকো শ্যানেল এককভাবে কালো রঙের পোশাককে ফ্যাশনের কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। ‘ছোট্ট কালো পোশাক’ চটকদার পোশাক হিসেবে প্রধান হয়ে ওঠে। শ্যানেলের ‘সরল অথচ মার্জিত, লম্বায় খাটো, দীর্ঘ সরু হাতা’র পোশাকটি আধুনিক নারীদের কাছে সন্ধ্যাকালীন পোশাক হিসেবে জনপ্রিয়তা পায়।

এ সময়ের ঠিক আগে, কালো পোশাক ছিল গৃহকর্মী এবং খুচরা দোকানের বিক্রেতাদের জন্য। খেলার পোশাকের (স্পোর্টসওয়্যার) উত্থান যখন শুরু হয়ে যায়, নারীরা আড়ম্বরপূর্ণ, সীমাবদ্ধ গাউন থেকে দূরে সরে আসেন ধীরে ধীরে। মার্কিন কবি শেলি পুহাক দ্য আটলান্টিক পত্রিকায় ‘দ্য আন্ডারক্লাস অরিজিনস অব দ্য লিটল ব্ল্যাক ড্রেস’ শিরোনামে বর্ণনা করেছেন যে কীভাবে উচ্চবিত্তরা তাঁদের জন্য সহজ, আধুনিক ‘শপিং গার্ল’ স্টাইল বেছে নেন। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তি, যাঁরা তারুণ্য উপস্থাপন করতে চেয়েছিলেন, তাঁরা ছোট আকারের কালো পোশাক বেছে নিয়েছিলেন।

default-image

প্রতিবাদের রং

ফ্যাশনের বাইরেও এই রং প্রতিবাদের ভাষাও বহন করেছে। যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে হলিউডের তারকারা প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন কালো পোশাকের মাধ্যমেই। সেটাও আবার ২০১৮ সালের ৭৫তম কান চলচ্চিত্র উৎসবে লালগালিচায় দাঁড়িয়ে। এই ‘টাইমস আপ’ আন্দোলন ছিল চলচ্চিত্রশিল্প এবং অন্যান্য কর্মস্থলে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে। তিন শতাধিক অভিনেত্রী, লেখক ও পরিচালক সোচ্চার ছিলেন এই আন্দোলনে।

অনেক নেতিবাচক বিষয়ের প্রতীক হিসেবে কালো রং সামনে চলে আসে। এটি যেমন মৃত্যু, দুঃখ, জাদু, অন্ধকারের প্রতীকী চিহ্ন—তেমনি মার্জিত, সংযম, সম্পদ, শক্তিকেও প্রকাশ করে সমানভাবে। শিল্প-সাহিত্যের বিকাশেও এই রঙের ভূমিকাকে অস্বীকার করা যায় না। কাগজের ওপর প্রথম কালো কালির মাধ্যমেই তো তুলে ধরা হয়েছে শিল্প। কালো পোশাকের গাঢ় ছায়া আমাদের চোখের মণিতেও যেন ধরা দেয়।

বিজ্ঞাপন
default-image

কালো পোশাক পরলে শরীরের অনেক খুঁত যেমন ঢেকে যায়, তেমনি শুকনা বা স্লিম দেখাতেও সহায়তা করে। আমাদের দেশে কালো রঙের পোশাক এখনো শোকের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়—জানালেন ফ্যাশন ডিজাইনার মাহিন খান। তিনি বলেন, ‘কালো রং উৎসবমুখর না। পয়লা বৈশাখ, বসন্ত, বর্ষা কিংবা হেমন্ত কোনো উদ্‌যাপনেই কালো রঙের পোশাক পরা হয় না। ঈদের সময় যখন আমি পোশাক বানাতাম, এই কৃষ্ণ রংটিকে খুব একটা তুলে ধরতাম না। বিয়ের অনুষ্ঠানেও এই রঙের জায়গা কম। তবে সান্ধ্য আর আনুষ্ঠানিক পোশাক হিসেবে এই রঙের কদর আছে বিশ্বজুড়ে। একুশে ফেব্রুয়ারিতে আমরা কালো রঙের পোশাকের মাধ্যমে সম্মান জানাই মহান ভাষা আন্দোলনের শহীদদের প্রতি।’

default-image

সব সময়ের রং

ফ্যাশনে কালো রং খুব জনপ্রিয়। ঐতিহ্যগতভাবে কালো রং আচকান বা শেরওয়ানিতে ব্যবহৃত হয়েছে। কালো সবাইকেই মানায়, এটি সত্যি। ত্বক যেমনই হোক, শিশু থেকে বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ সবার জন্যই এই রং। মাথা থেকে পা পর্যন্ত কালো পোশাকের স্টাইল সবচেয়ে সহজ এবং দুর্দান্ত উপায় নিজেকে সাজিয়ে তোলার জন্য। এটি একই সঙ্গে চমৎকার কিন্তু দৃঢ় রং। বিনয়ী এবং অহংকারী মনোভাব একই সঙ্গে প্রকাশিত এই কালোতে। বলা হয়ে থাকে যাঁরা সব সময় কালো পরতে পছন্দ করেন, জীবনের লক্ষ্য তাঁদের কাছে খুব স্পষ্ট। কালো কারও কাছে আপন, কারও জন্য একটু দূরের রং। কেউবা পছন্দ করেন দৈনন্দিন জীবনের ছন্দের সঙ্গে মিলিয়ে পরতে, কেউ আলমারিতে তুলে রাখেন শুধু দাওয়াতের জমকালো পোশাক হিসেবে। কালো পোশাকের সঙ্গে রুপালি, সোনালি, মুক্তা, রঙিন বিডস—সব ধরনের গয়নাই ফুটে ওঠে বেশ ভালোভাবেই।

বিজ্ঞাপন
default-image

যেভাবেই কালো রংকে বিচার করুন না কেন, এটি সব সময় চলতি ধারার রং হিসেবেই থাকছে। হারিয়ে যায় না সময়ের গহ্বরে। এ যেন ঠিক রাতের আঁধারের মতোই। কিছুক্ষণের জন্য সরে যায় আলোর উজ্জ্বলতায়, তবে হারায় না কখনোই।

নকশা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন