শিশুরা বর্ণ চিনুক মজার উপকরণ দিয়ে। ছবিটি প্রথম আলো আয়োজিত একটি বর্ণমেলা উৎসবের।
শিশুরা বর্ণ চিনুক মজার উপকরণ দিয়ে। ছবিটি প্রথম আলো আয়োজিত একটি বর্ণমেলা উৎসবের। ছবি: নকশা

ভাষার জন্য প্রাণ দেওয়ার বিরল ও গৌরবময় ইতিহাস আছে আমাদের। তবে কেন সেই ভাষাকে আমরা হ-য-ব-র-ল করে বলছি, লিখছি? শুদ্ধ বাংলা উচ্চারণের চেষ্টাকে কেন আধুনিকতার বিপরীত হিসেবে ভাবছি কেউ কেউ? উত্তর জানা নেই অনেকেরই।

বিজ্ঞাপন

ভাষার জন্য প্রাণ দেওয়ার বিরল ও গৌরবময় ইতিহাস আছে আমাদের। তবে কেন সেই ভাষাকে আমরা হ-য-ব-র-ল করে বলছি, লিখছি? শুদ্ধ বাংলা উচ্চারণের চেষ্টাকে কেন আধুনিকতার বিপরীত হিসেবে ভাবছি কেউ কেউ? উত্তর জানা নেই অনেকেরই।

ইতিহাসের অন্ধিসন্ধি শেখানোরও আগে ওদের বুলি ফোটার সময়ে বিড়ালকে ‘ক্যাট’ আর কুকুরছানাকে ‘ডগি’ বলতে শিখিয়ে আত্মতৃপ্তিতে ভুগছি না তো? প্রাণের দামে কেনা বর্ণমালাকে প্রাণের মধ্যে বুনে দিতে উপযুক্ত গাঁথুনির সাহায্য নিচ্ছি তো? এমন গাঁথুনি হতে পারে ‘বর্ণমেলা’র মতো আয়োজনে। বেশ কয়েক বছর হয়েছে প্রথম আলোর এই আয়োজন। কী হতো সেই বর্ণমেলায়? জানালেন প্রথম আলোর প্রধান শিল্পনির্দেশক অশোক কর্মকার।

ভাষার স্বাধীনতা

মজার খেলায় শিশু শিখতে পারে নতুন কিছু। শিশুর কল্পনায়, শিশুর সৃজনশীলতায় একটা বর্ণেই যেন অনেক কথা বলা। ছাপা বর্ণ আর হাতে লেখা বর্ণে যেমন বহু তফাত, তেমনি তফাত থাকে নানাজনের হাতে লেখা বর্ণেও। একটি বর্ণেই শিশু কত কী ভাবতে সক্ষম, তা হয়তো বড়দের ভাবনার অতীত। ডিজিটাল মাধ্যম থেকে গৎবাঁধা বুলি নয়, নিজের এই সক্ষমতাকেই কাজে লাগাতে শিখুক শিশু।

বিজ্ঞাপন

আনন্দে হোক শেখা

বর্ণের মধ্যকার জ্যামিতিক আকার থেকেই অভিনব এবং আকর্ষণীয় কিছু, এই যেমন ‌‌অ–এর উল্লম্ব রেখাটি থেকে গাছ, বাঁ দিকের বাঁকা প্রান্তটি খানিক বাড়িয়ে আলপনার ঢেউ কিংবা একটা লতা, গোড়ার বৃত্তটিতে হতে পারে ফুল। আ‌ লিখতে গিয়ে দুটি উল্লম্ব রেখায় দুটি গাছ, মাত্রা থেকেই দিগন্তরেখা। গাছে আম, ‘আ’-র গোড়ার বৃত্তে আমের মুকুল—এভাবেই তৈরি করা যায় ল্যান্ডস্কেপ বা দৃশ্য। কেউ হয়তো ‌‌ধ‌‌‌ লিখছে ধান বসিয়ে বসিয়ে, পেছনে রাখছে ধানের মাঠ, পাশে লিখে দিচ্ছে ধ-এ ধান।

ফুলের মালায় লেখা হলো ম কিংবা ম দিয়ে যে মা, মাতৃভাষা, মাতৃভূমি শব্দগুলো হয়, সেই আবেগও তুলে আনা যায়। পুরোনো কলম জুড়ে কিংবা পেনসিলের চেঁছে ফেলা কাঠের আস্তরণ বা খোসা দিয়েও শিশু বুনতে পারে বর্ণ। বর্ণের প্রান্ত থেকে একটা পথ কিংবা দিগন্তরেখা আঁকতে পারে, একই বর্ণের বিভিন্ন প্রান্তে পথ বা রাস্তা আঁকলে বর্ণটাই ‘তিন রাস্তার মোড়’ হয়ে উঠতে পারে। হতে পারে বিমূর্ত বা অ্যাবস্ট্রাক্ট কোনো চিত্র। বর্ণ নিয়েই খেলা। বাড়িতেই সাধারণ উপকরণে নিজের উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে বর্ণ থেকে আনন্দ বের করুক সে। ছড়িয়ে থাকা বর্ণ (যেমন সব তলে বর্ণ লেখা ব্লক) সাজিয়ে শব্দ তৈরি করতে পারে। যে সময় শিশু এমন কিছু করছে, এমনকি কাজটা করার জন্য ভাবছে, পুরোটাই কিন্তু ভবিষ্যতের মনোজগতের জন্য বিনিয়োগ।

নিজের পরিসরে নিজের ভাষা

শিল্পী ওয়াকিলুর রহমান জানালেন, একটি জনগোষ্ঠীর চিন্তা, ভাবনা, কল্পনা, স্বপ্ন, খোশখেয়াল, প্রতিবাদ প্রকাশিত হয় তার ভাষা দিয়ে। ভাষাই যেন কেন্দ্র। ভাষার প্রতি ভালোবাসা তৈরি হলে দীর্ঘ মেয়াদে তা জাতির জন্য ইতিবাচক হয়। শৈশব থেকে এই ভাষার সঙ্গে বসবাস করার এবং ভাষার নান্দনিক চর্চার সুযোগ পেলে ভাষার প্রতি ভালোবাসা গড়ে ওঠে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই। বর্ণ দিয়ে গড়া শব্দকে যেন ছোঁয়া যায়।

শিশুর ওপর কিছু চাপিয়ে না দিয়ে পারিবারিক পরিমণ্ডলেই তার বেড়ে ওঠার ছোট্ট জগতে রঙিন বর্ণমালার সতেজ উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায়। দেয়াল, আসবাব, বিছানা, বালিশ, খেলনা, এমনকি খাতার মলাটে দ্বিমাত্রিক বা ত্রিমাত্রিক বর্ণমালা ও শব্দমালার রঙিন উপস্থিতিতে শিশু স্বচ্ছন্দেই বর্ণমালাকে আপন করে নেয়। নিজেরাই একটু খাটনি করে আনন্দময় করে বর্ণকে উপস্থাপন করুন শিশুর সামনে।

প্রাণেই বুনি বাংলা

ধরাবাঁধা কিছু নয়, নিজের মতো করে একেকটা বর্ণকে দেখুক ছোট্ট মণি, নিজের মতোই প্রকাশ করুক। বিশ্ব ঘুরতে বেরোলেও নিজের বর্ণমালা নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভুগবে না, বরং আত্মবিশ্বাসী হবে বর্ণমালার জন্য, মমত্ব অনুভব করবে বর্ণমালার প্রতি। প্রয়োজন শুধু এমন উদ্যোগ, চলুক বছরজুড়েই। শিশুর হাতে বই তুলে দিন, গল্পচ্ছলে শোনান সত্যিকারের লড়াইয়ের কথা, বাংলায় মজার ছড়া শেখান মুখে মুখেই। বাংলায়ই থাক প্রাণের পরশ, বাংলা নিয়েই এগিয়ে চলা।

বিজ্ঞাপন
নকশা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন