চায়ের অন্যতম টা– শিঙারা
চায়ের অন্যতম টা– শিঙারাছবি: খালেদ সরকার, কৃতজ্ঞতা: আফরোজা নাজনীন

শিঙাড়ার শিং থাকে তিনটি। তবে শিং ভেঙে দিলে হাতে থাকে আলু। কিন্তু কী আশ্চর্য, ইদানীং আলুর সঙ্গে থাকে আরও কত কী? থাকছে ফুলকপি, চিনাবাদাম, গরু বা খাসির কলিজা কিংবা মাংসের পুর! অবাক হই না। কারণ, খেতে ভালোই লাগে। বাঙালির হেঁশেলে ঢুকে কোন খাবারটি তার স্বরূপ ধরে রাখতে পেরেছে? এমন যে পরাক্রমশালী মোগল, কূটনীতিতে পোক্ত ইংরেজ, যুদ্ধবাজ ডাচ, নাক উঁচু ফরাসি তাদের সবাইকে পরাজিত করেছে আমাদের হেঁশেলের মানুষেরা—মসলা, তেল আর লবণে মেখে কষিয়ে কষিয়ে। সেখানে শিঙাড়ায় আলুর সঙ্গে ফুলকপি, চিনাবাদাম, কলিজা কিংবা মাংসের পুর জায়গা করে নেবে, সেটা ছিল বিধিলিপি।

ফেলুদা যখন ঢাকায় এলেন তখন গোলমালটা পাকালেন এই শিঙাড়ার পরিচয় নিয়েই। সমুচাকে তিনি নির্দ্বিধায় বলে দিলেন শিঙাড়া। তাতে আমাদের অভিমান হলো খুব। কিন্তু মুচকি হেসে ক্ষমা করে দিলাম এই ভেবে যে যাক, দুঁদে মাফিয়ারা যাকে ঘোল খাওয়াতে পারেনি, আমাদের শিঙাড়াই তাকে ঘোল খাইয়ে দিল। ছেড়ে দাও।

অবশ্য ফেলুদা একটি বিষয়ের খুব কাছ দিয়ে গেছেন। তিনি যদি বুদ্ধি করে খাদ্য বিশারদদের দোহাই দিয়ে তোপশেকে বলতেন, সমুচাই হলো শিঙাড়ার পূর্বপুরুষ, তাহলে আর কোনো কথা হতো না। কারণ, খাদ্য বিশারদদের মধ্যে একশ্রেণির ধারণা, শিঙাড়ার জন্ম মধ্যপ্রাচ্যে। আবার কেউ কেউ ধারণা করেন, এটি ইরানের খোরাসান অঞ্চলের খাবার। আবার কারও মতে, এটি তুর্কি খাবার। পরে যা ইরানে চলে যায়।

default-image
বিজ্ঞাপন

শিঙাড়ার আদিরূপ সমুচা

দশম শতকের ইরানি ইতিহাসবিদ আবুল ফজল বেহাগি তাঁর তারিখ-ই-বেহাগি নামের বইয়ে প্রথম ‘সাম্বুসাক’ খাবারটির উল্লেখ করেন বলে জানা যায় বিভিন্ন সূত্র থেকে। আমির খসরু (১২৫৩-১৩২৫) তেরো শতকের ভারতবর্ষীয় সুলতানদের খাবার টেবিলে দেখেছিলেন মাংসের পুর ভরা সামুসাক। সামুসাক বা সাম্বুসাক বা সামোসায়, সোজা বাংলায় আমরা যাকে সমুচা নামে চিনি, সে খাবারটিকে শিঙাড়ার আদিরূপ বলে মনে করা হয় আকৃতিগত সাদৃশ্যের কারণে। আবার পানিফলের সঙ্গে শিঙাড়ার আকৃতিগত মিলের জন্য একে শিঙাড়া নামে ডাকা হয়। কারণ, হিন্দিতে পানিফলের নাম শিঙাড়া। খাবারদাবার নিয়ে ইতিহাসের এসব কচকচানি থাকবেই। তথ্যসূত্রকে পাশ কাটিয়ে বাঙালির একটাই প্রশ্ন, শিঙাড়ার ভেতর আলু এল কেমনে? সেও ইতিহাসেরই গল্প বটে। তবে তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে পর্তুগিজদের নাম।

পর্তুগিজরা ভারতের পশ্চিম উপকূলে আলুর চাষ শুরু করে ১৭ শতকে। ধারণা করা হয়, সে সময় ভারতের পশ্চিম উপকূলের নিরামিষাশী মানুষ মাংসের পুরের বদলে আলু দিয়ে সমুচা বানানো শুরু করে। এতে সমুচার আসল আকার কিছুটা বদলে গিয়ে পানিফলের রূপ নেয়। সেই থেকে আলুর পুর ভরা সমুচা হয়ে যায় শিঙাড়া। পরে এটি বিভিন্ন কারণে বাংলা অঞ্চলে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু নামটি শিঙাড়াই থেকে যায়।

আলুর পুর দিয়ে শিঙাড়া বানানোই আদি নিয়ম। কিন্তু ওই যে আগেই বলেছি, বাঙালি হেঁশেলে কোনো খাবারই নিজের স্বরূপ ধরে রাখতে পারেনি। শিঙাড়াই বা বাদ যাবে কেন। সারা বছর শিঙাড়া খাওয়া হলেও শীতে শিঙাড়ার স্বাদ হয়ে ওঠে একেবারে ভিন্ন। কারণ, ফুলকপির দেখা পাওয়া যায় সে সময়ই। আলুর সঙ্গে ফুলকপির ফুল আর তাজা ধনেপাতা কষিয়ে পুর বানিয়ে শিঙাড়ায় গুঁজে দিয়ে ডুবো তেলে ভেজে নিলে তার স্বাদ যে ভিন্ন হবে, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। ফুলকপি দেওয়া সে শিঙাড়া টাটকা ধনেপাতার চাটনিতে ডুবিয়ে খাওয়ার আবেশ, সে ভাষায় প্রকাশ করা একটু কঠিনই বটে।

শিঙাড়ায় আমিষ

default-image

বেশি করে পেঁয়াজ আর গরু বা খাসির কলিজা দিয়ে বানানো শিঙাড়া স্বাদ কোড়কে কালবৈশাখী ডেকে আনে। না, এতে আলু দেওয়া চলবে না একেবারে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ডান পাশের রাস্তার ধারে একটি ঝুপড়িতে ভাজা হতো কলিজা শিঙাড়া। আলু ছাড়া বেশি করে পেঁয়াজ, মরিচ আর বেটে নেওয়া গরম মসলা দিয়ে কষিয়ে নেওয়া কলিজায় বানানো সে শিঙাড়া খাওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়াতে হতো রীতিমতো। পরে এর সন্ধান পাওয়া যায় স্টেডিয়ামের নিচের বিখ্যাত সিলসিলা রেস্টুরেন্টে। মাঝেমধ্যে সেটা ভাজা হতো গ্রন্থাগারের সামনের বাবুর শিঙাড়ার দোকানেও। এগুলোর কোনোটিতেই কলিজার সঙ্গে আলু থাকত না। দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের কলিজার শিঙাড়া খাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে একটা কথাই বলতে পারি, আলু ছাড়া পেঁয়াজ-মরিচ আর কলিজা দিয়ে বানানো শিঙাড়াই উত্তম।

এক-আধ জায়গায় হঠাৎ করে খাওয়া মাংসের কিমা দিয়ে বানানো শিঙাড়াকে অভিনব বলাই যায়। বিশেষ করে ব্রয়লার মুরগির নরম মাংস শুকনো করে কষিয়ে নিয়ে অল্প আলুর সঙ্গে পুর বানিয়ে ডুবো তেলে ভাজা শিঙাড়া খেতে সুস্বাদু। কিন্তু সেটাকে আমার কেন যেন কলিজা শিঙাড়ার অক্ষম অনুকরণ বলে মনে হয়। তার চেয়ে বরং আলুর সঙ্গে মেশানো চিনাবাদামের পুর দিয়ে বানানো শিঙাড়া দুর্দান্ত। দেশের প্রায় সব জায়গাতেই পাওয়া যায় আলু-চিনাবাদামে বানানো শিঙাড়া। সব জায়গায় যে সেটি ছক্কা হাঁকাতে পেরেছে, তেমনটা বলা না গেলেও সে শিঙাড়া আসলেই সুস্বাদু। মিষ্টি সুজি আর শুকনো বুন্দিয়ার পুর দিয়ে বানানো হয় মিষ্টি শিঙাড়া। এটি তৈরি হয় বেকারিতে। এটিও বাঙালির বিপুল উদ্ভাবনী ক্ষমতার নিদর্শন।

শিঙাড়ার শিং ভেঙে দিলে আর কী কী হাতে থাকবে সে বিষয়ে নিঃসন্দেহ হওয়া সত্যি কঠিন। এ কঠিন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার সময়ের ওপর ছেড়ে দিয়ে আমরা বরং শিঙাড়া খাই, সেটাই ভালো।

বিজ্ঞাপন
নকশা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন