পোশাকের ক্যানভাসে সাদা-নীল রং, ফুটে উঠেছে শরতের আবহ
পোশাকের ক্যানভাসে সাদা-নীল রং, ফুটে উঠেছে শরতের আবহমডেল: মৌসুম, পোশাক: অরণ্য, সাজ: অরা বিউটি লাউঞ্জ, ছবি: কবির হোসেন

‘শরৎ, তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি/ ছড়িয়ে গেল ছাপিয়ে মোহন অঙ্গুলি।

শরৎ, তোমার শিশির–ধোওয়া কুন্তলে/ বনের–পথে–লুটিয়ে–পড়া অঞ্চলে/ আজ প্রভাতের হৃদয় ওঠে চঞ্চলি।’

ঘনঘোর বর্ষা শেষে এভাবেই রবীন্দ্রনাথের গানের মতো শরৎ ছড়িয়ে দেয় অরুণ আলোর ছটা। নদীর ধারে হাওয়ায় নাচে কাশের বন। বর্ষায় ঘন কালো মেঘ ছেয়ে যাওয়া আকাশ পায় নবরূপ। আকাশে ভেসে বেড়ায় সাদা পেঁজা তুলোর মতো মেঘ। কাশবন, শিউলি ফুল, সাদা মেঘ—সব শুভ্রতাই যেন শরৎ ঘিরে। তাই হয়তো সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক তাঁর এক কবিতায় লিখে গেছেন, ‘সে কী বিস্ময়, সে কী বিস্ময়! কী করে ভুলি, আকাশের নীল ঘন সাদা মেঘ, কবেকার গ্রাম পথে ঢুলি।’

কবি–সাহিত্যিকেরা নানা গল্প, কবিতা, উপন্যাসে শরতের যে সৌন্দর্য তুলে ধরেছেন, সেই শরতের প্রকৃতিকে অনুভবের সুযোগ এই শহরে কোনো দিনই ছিল না। এদিকে ছিল না বসন্ত বা পয়লা বৈশাখের মতো বৃহৎ আয়োজনে শরৎ উদ্‌যাপনের ঘনঘটাও। বেশ নিভৃতেই শরৎ আসত শহরে।

default-image
বিজ্ঞাপন

তবে খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, এই বছর ছয় কি সাত। মানুষের মধ্যে বেড়ে যায় ভ্রমণের শখ। দল বেঁধে সবাই ঘুরে বেড়ায় শহরের আশপাশে থাকা কাশের বনে, এই শরৎকালে। যদি কাশবনে ঘুরে বেড়ানোর পোশাকে থাকে শরতের আবহ, তাহলে কেমন হয়—এই ভাবনাকে কাজে লাগালেন নকশাবিদেরা। খুব স্বল্প পরিসরে শরতের পোশাকের কাজ শুরু হলেও ক্রেতারা তা গ্রহণ করল সাদরেই। যদিও করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে এ বছর শরতের পোশাকে ভরে ওঠেনি ফ্যাশন হাউসগুলোর সংগ্রহ, কিংবা ভিড় নেই কেনাকাটায়। তবে শরৎ তো দোলা দেয় মনে। ছুটির দিনের বিকেলে দেখা যাচ্ছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিজেকে সুরক্ষিত করে কাছের কাশবনে অনেকে যাচ্ছেন শরতের প্রকৃতি দেখতে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও ছেয়ে যাচ্ছে সেসব ছবিতে। আর পরনের পোশাকে থাকছে শরতের রং বা নকশা। এমন পোশাক আছে অনেকের ঘরেই।

ডিজাইনার শৈবাল সাহা বলছিলেন, আগে শুধু পোশাকে কাশবনের ছবি এঁকে (হ্যান্ডপেইন্ট) তুলে ধরা হতো শরতের আমেজ। ধীরে ধীরে ডিজাইনারদের আগ্রহ বাড়তে থাকে। একটা সময় বৈশাখ, বসন্ত, বর্ষার পোশাকের সঙ্গে যুক্ত হয় শরতের পোশাক। নানাভাবে সাদা আর নীলের ব্যবহার তখন ফুটে উঠতে থাকে পোশাকে।

অনেকেই বর্ষা আর শরতের রঙের পার্থক্যটা ঠিক বুঝে উঠতে পারেন না। দুই ঋতুতেই বেছে নেন সাদা-নীল পোশাক। জেনে রাখা ভালো, বর্ষায় থাকবে নীলের প্রাধান্য আর শরতে সাদার—জানালেন শৈবাল সাহা। এই সাদার ব্যবহারটাও এখন আসে নানাভাবে। কখনো সেটা কাশফুলের একটু ঘিয়ে রং মেশানো সাদা, কখনো আকাশে ভেসে বেড়ানো হাওয়াই মিঠাই রঙের মেঘের সাদা। আবার কখনো তাতে থাকে শিউলি ফুলের চাপা সাদা (অফ হোয়াইট) রঙের ব্যবহার। এভাবেই নকশাবিদেরা কাপড়ের রঙে, কখনো–বা কাপড়ের উপাদানে, আবার কখনো কাপড়ের ওপর নকশায় তুলে ধরছেন শরতের ছবি।

default-image
বিজ্ঞাপন

মজার ব্যাপার হলো, সীমানাভেদে কিন্তু বদলে যায় ঋতু উদ্‌যাপনের এই রং। দীর্ঘদিন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত সাময়িকী সানন্দার সম্পাদক ছিলেন শর্মিলা বসুঠাকুর। মুঠোফোনে তিনি বলছিলেন, ‘আমাদের এখানে (পশ্চিমবঙ্গ) শরৎ মানেই শারদীয় উৎসবের আগমন। বছরজুড়ে এর অপেক্ষায় থাকে সবাই।’ তাই এই সময়ে পোশাকের ক্যানভাসে শরৎ আর শারদীয় উৎসবের রং মিলেমিশে হয়ে যায় একাকার। শারদীয় উৎসবে তো লালের প্রাধান্য থাকবেই, তার সঙ্গে পোশাকে অন্য যে রংগুলোর প্রাধান্য থাকে, সেগুলোও শরতের প্রকৃতি থেকেই ধার নেওয়া।

শর্মিলা বসুঠাকুর তাঁর সানন্দার অভিজ্ঞতাও শোনান। তিনি বলেন, ‘শরতের সময় সানন্দায় পূজার ফ্যাশন শো হতো। যখন সানন্দার সম্পাদক হিসেবে ছিলাম, তখন সেই ফ্যাশন শোতে সাদা, লাল, কমলা, নীল রঙের প্রাধান্য থাকত পোশাকে। আবার কখনো এই রংগুলোর একটির সঙ্গে আরেকটি মিশিয়ে তৈরি হতো নতুন শেড। তাঁতে বোনা কাপড়ে এসব রং বেশি ফুটে ওঠে। তবে দুর্গাপূজা মানেই তো একটু বেশি জমকালো উৎসব। তাই তসর, সিল্কের মতো কাপড়ের ব্যবহার বেশি থাকত।’

বিজ্ঞাপন
default-image

বাংলাদেশে এখন হালকা সোনালি, হালকা কমলা, হালকা বাদামি, হালকা সবুজের মতো রংগুলো অনেকেই তুলে ধরছেন শরতের পোশাকে। ডিজাইনার ঊর্মিলা শুক্লার কাছে যুক্তিটা হলো, শরৎকালে সবকিছুতেই একটা হালকা মিষ্টি ব্যাপার থাকে। সাদা কাশফুলে থাকে হালকা বাদামির ছোঁয়া, সেটাও তাঁর কাছে শরতের রং বলেই মনে হয়। সকালের মিঠে সোনালি রোদজুড়ে থাকে শরতের আমেজ, আবার শিউলিবোঁটার যে কমলা রং, সেটা তো শরতেরই। তাই এভাবেই নতুন নতুন শরতের রং খুঁজে বেড়াচ্ছেন ডিজাইনাররা।

যদিও এখন স্বচ্ছ নীল আকাশ হঠাৎই ছেয়ে যাচ্ছে কালো মেঘে। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে চারপাশ। নদীগুলোও এখনো টইটম্বুর বর্ষার জলে। তবে এর মাঝেই চরে জেগেছে কাশবন। ঘন কালো মেঘ সরলেই উঁকি দিচ্ছে সাদা তুলো পেঁজার মতো মেঘ। প্রকৃতিতে শরতের এই আগমনী ছোঁয়া শহুরে জীবনে খুব একটা ছুঁয়ে না গেলেও জীবনযাপনে এর ছোঁয়াটা কিন্তু রয়েই যায়।

করোনা মহামারির এই দুঃসময়ে নিজেকে, নিজের মনকে, চারপাশকে রাখতে হবে সুস্থ ও সজীব। নিতে হবে নিজের যত্ন, খেতে হবে স্বাস্থ্যকর ও সুস্বাদু খাবার। এই সময়ে সজীব ও সতেজ থাকার নানা রকম বিষয় নিয়ে সাজানো হয়েছে নকশা।

মন্তব্য পড়ুন 0