ভালোবাসা দিবসে মোমোর আলোয় রাতের খাবারের পর্ব হতে পারে বাড়িতেই।
ভালোবাসা দিবসে মোমোর আলোয় রাতের খাবারের পর্ব হতে পারে বাড়িতেই। মডেল: রেহান ও সায়রা, পোশাক: িকউরিয়াস, সাজ: অরা বিউটি লাউঞ্চ, ছবি: সুমন ইউসুফ

করোনাকালে ‘নতুন স্বাভাবিক’-এর বেড়াজালে হয়তো নবদম্পতিদের মধুচন্দ্রিমায় যাওয়া হয়নি, অনেকেই পাননি ‘ভালোবাসি’ বলার ফুরসত। একেবারে আলাদা সময়ে আসছে এবারের ১৪ ফেব্রুয়ারি, ভালোবাসা দিবস। এই দিনে পছন্দের সাজপোশাকে একে অপরকে উপহার দিতে পারেন। সুগন্ধি মোমের আলোয় ঘরেই হতে পারে নৈশভোজ।

বিজ্ঞাপন
default-image

একটু খেয়াল করে দেখবেন, মাঘের শেষ সপ্তাহটা শহরে বেশ অন্য রকম। শীত কমে আসে, রাজত্ব বাড়ে কমলারঙা নরম রোদের। নবদম্পতিদের ঘরে সেই আদুরে রোদের উষ্ণতা ছাড়াও এ সময় ছড়িয়ে যায় ভালোবাসার এক অনন্য উষ্ণতা। অফিসফেরত স্বামী ঢুঁ মারেন গিফট শপে, প্রিয়জনকে কী উপহার দেওয়া যায়, তা নিয়ে তাঁর ভাবনার অন্ত নেই। শত ব্যস্ততার ফাঁকে স্ত্রীও কিন্তু কম যান না! ভালোবাসা দিবসে আরও একবার ‘ভালোবাসি’ জানানোর আয়োজনে কোনো ত্রুটি রাখতে চান না তিনি।

এবারের প্রেক্ষাপট একটু বেশিই আলাদা। মহামারির প্রকোপে জীবনযাপনের স্বাভাবিকতা অনেকাংশেই হারিয়ে ফেলেছি আমরা। তবু জীবনের বহমানতার সূত্রকে ঠিক প্রমাণ করে এ করোনাকালেও হার মানেনি পাশাপাশি থাকার আকুলতা। বরং বলা হচ্ছে, অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে এ সময় বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে আরও বেশি। ‘নতুন স্বাভাবিক’-এর বেড়াজালে হয়তো নতুন দম্পতিদের মধুচন্দ্রিমায় যাওয়া হয়নি, অনেকেই পাননি ‘ভালোবাসি’ বলার ফুরসত।

তাই বিয়ের পরের প্রথম ‘ভালোবাসা দিবস’ নিয়ে এবার সদ্যবিবাহিত যুগলদের ব্যস্ততা যেন অনেকটুকু বেশি! ভালোবাসার দিনটি ঘিরে কী ভাবছেন নবদম্পতিরা, করোনাকালে কেমন হবে তাঁদের উদ্‌যাপন, সেসব নিয়েই আমাদের আজকের লেখা।

default-image

‘ভালোবাসা নান্দনিক যাতায়াতে

ভালোবাসা মানে চৌরাসিয়ার বাঁশি’

বহুদিন আগে, বোধ হয় কৈশোরের শুরুর দিকে অঞ্জন দত্ত-নিমা রহমানের শ্রুতিনাটকে সন্ধান পেয়েছিলাম এই দুই পঙ্‌ক্তির। ‘ভালোবাসা দিবস’ নিয়ে সদ্যবিবাহিত ফারদীন হাসানের সঙ্গে কথা বলতে বলতে আবার সে কথাই মনে পড়ল। ফারদীন হাসান জানালেন, ‘চার বছর আগে আমাদের প্রথম পরিচয় এক উচ্চাঙ্গসংগীত উৎসবে, তখন সত্যিই মঞ্চে বসে বাঁশি বাজাচ্ছিলেন পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া। সেই বাঁশির সুরেই বিশেষ এই দিন শুরু করতে চাই আমি। দুজনকেই যেহেতু অফিসে ছুটতে হবে, তাই বাঁশি শুনতে শুনতে সকালের চা হয়তো আমরা ব্যালকনিতে বসে একসঙ্গে খেয়ে নেব।’

ফারদীনের কথায় ক্যালেন্ডারে তাকিয়ে দেখলাম, এবারের ভালোবাসা দিবস সত্যিই রোববার, অর্থাৎ অফিসের ব্যস্ততা থাকবে দিনটির বেশির ভাগ জুড়েই। সেই ব্যস্ততার সঙ্গে মানয়ে নিয়ে বিয়ের পরের প্রথম ভালোবাসা দিবস উদ্‌যাপন করবেন কীভাবে, তা জানতে চেয়েছিলাম একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত দ্যুতি অরণির কাছে। তিনি জানালেন, ‘উইকডেজ বলে খুব বড় কোনো পরিকল্পনা আসলে আমাদের নেই। আমার “বেটার হাফ” মাহিবের রবীন্দ্রসংগীত খুব পছন্দ। তাই ঘরের কোণে হয়তো জ্বলবে সুগন্ধি মোমবাতি আর ব্লুটুথ স্পিকারে বাজবে রবীন্দ্রনাথের গান, এভাবেই একসঙ্গে খানিকটা সময় কাটাতে চাই আমরা।’

বিজ্ঞাপন
default-image

দ্যুতির মতো অনেক সদ্যবিবাহিত দম্পতিই ‘একসঙ্গে সময় কাটিয়ে’ উদ্‌যাপন করতে চান ‘ভালোবাসা দিবস’। কেউ ভাবছেন বাড়িতেই করবেন ক্যান্ডেল লাইট ডিনার, কারও পরিকল্পনায় আছে একসঙ্গে প্রিয় সিনেমা দেখা। বহুজাতিক কোম্পানিতে কর্মরত তাশফিয়া মামুন যেমন ভাবছেন ‘পেইন্টিং ডেট’ অর্থাৎ, ঘরে বসে দুজনে মিলে ছবি আঁকার কথা। এতে একদিকে যেমন সুন্দর কিছু সময় কাটবে তাঁদের, তেমনি সুন্দর মুহূর্তের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে সৃষ্টি হবে হাতে আঁকা ছবিও।

ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের প্রভাষক কাজী মুস্তাবীন নূরের পরিকল্পনাও কিছুটা ভিন্ন ধাঁচের। তিনি বলছিলেন, ‘মাত্র কদিন আগেই হাতে পেয়েছি আমাদের বিয়ের ছবি। ছবিগুলো প্রিন্ট করে আনা হয়েছে। ভালোবাসা দিবসের সন্ধ্যায় সেই ছবিগুলো দুজন মিলে অ্যালবামে গুছিয়ে রাখতে চাই। তাতে এক রকম স্মৃতিচারণা যেমন হবে, তেমনি সুন্দর এক দিনে সংরক্ষিত হবে আমাদের সুন্দরতম দিনটির স্মৃতিও।’

অনেকে বিয়ের পরের প্রথম ভালোবাসা দিবসে সঙ্গীর জন্য চমকের আয়োজন করতে চান। তবে এক ছাদের নিচে বাস করে সঙ্গীর জন্য সারপ্রাইজ বা চমক দেওয়ার আয়োজন করা বেশ কঠিনই বটে! কিন্তু করোনার ভয়াবহতা মাথার ওপর নিয়েও যাঁরা গাঁটছড়া বেঁধেছেন, করেছেন জীবনভর একসঙ্গে থাকার প্রতিজ্ঞা; তাঁদের কি আর এসবে দমে গেলে চলে! বানী’স ক্রিয়েশনের শেফ অ্যান্ড সুগার আর্টিস্ট সেমন্তী আহমেদের যেমন আগের সন্ধ্যায় কেক বানিয়ে ফ্রিজে তুলে রাখবেন, যাতে ভালোবাসা দিবসের প্রথম প্রহরে চমকে দিতে পারেন প্রিয়জনকে।

এই কেকের বিশেষত্ব জানতে চেয়েছিলাম সেমন্তীর কাছে, তিনি জানালেন, পিকাসো কেক মূলত আমেরিকান স্টাইলের ভ্যানিলা কেক। এতে ক্রিম চিজ ফিলিং, স্ট্রবেরি ব্লেন্ড দেওয়া হয়। কেকের ফ্রস্টিংয়ে থাকে পিকাসোর পেইন্টিং স্টাইলের ছাপ, যা ঘরে থাকা প্যালেট নাইফ দিয়ে সহজেই করা যায়। সব মিলিয়ে ভ্যালেন্টাইনস ডের সঙ্গে কেকটি দারুণ মানানসই।

প্রিয়জনের জন্য যেকোনো কিছু নিজে হাতে তৈরি করা সব সময়ই বিশেষ। আর মহামারির এই সময়ে যখন জমকালো রেস্তোরাঁয় ক্যান্ডেল লাইট ডিনার বা দূরে কোথাও ভ্রমণের সুযোগ কম, তখন যেন নিজের তৈরি উপহারের গুরুত্ব বেড়েছে আরও বেশি। এমন উপহারের বৈচিত্র্যেরও শেষ নেই! ভালোবাসা দিবসের সকালে স্ত্রীর ঘুম ভাঙাতে পারেন ‘ব্রেকফাস্ট ইন বেড’-এর মতো দারুণ রোমান্টিক কিছু করে। খুব বেশি কিছু কিন্তু করতে হবে না। দুটি রুটি টোস্ট করে নিলেন, সঙ্গে থাকল একটি ওমলেট, সসেজ! গ্যারান্টি দিচ্ছি, দামি রেস্তোরাঁর খাবারের চেয়ে আপনার হাতে বানানো খাবারের কদর কোনো অংশে কম হবে না তাঁর কাছে।

সদ্যবিবাহিত তাবাসসুম বিনতে তাব্রীজ যেমন বানাতে চান ‘টার্কিশ ডিলাইট’ নামের ডেজার্ট। কেননা, কদিন আগেই ক্রনিকলস অব নার্নিয়া সিনেমাটি দেখার সময় তাঁর সঙ্গী তারিক জানিয়েছিলেন, সিনেমার চরিত্র এডমন্ডের মতো তিনিও টার্কিশ ডিলাইট খেয়ে দেখতে চান। তবে রান্নাতেই সীমাবদ্ধ নয়, নিজের হাতে তৈরি উপহারের তালিকা। আপনার হাতে তৈরি একটি ছোট্ট কার্ডও হতে পারে দারুণ উপহার। এমনকি ছোট্ট একটি চিরকুট লিখে সেটি রেখে দিতে পারেন প্রিয়জনের ব্যাগে বা ওয়ালেটে। হাজারো ব্যস্ততার মধ্যে সঙ্গী যখন সেটি হাতে পাবেন, নিঃসন্দেহে তাঁর মুখে ফুটবে স্মিত হাসি। হয়তো আরও বহু বছর পর্যন্ত তাঁর কাছে আপনার ভালোবাসার অসামান্য নিদর্শন হয়ে থাকবে সেই একচিলতে চিঠি।

অনেক ফ্যাশন হাউস আবার ভালোবাসা দিবস ও বসন্তবরণ—দুটোকে মাথায় রেখেই পোশাকের নকশা করেছে। এ ব্যাপারে কিউরিয়াস লাইফস্টাইলের বিপণন নির্বাহী তাসনুভা আহমেদ জানান, ‘ঋতুরাজ বসন্তের রং হলুদ আর ভালোবাসা দিবসের রং লাল। একটি দেশীয় উৎসব, আরেকটি আন্তর্জাতিক উৎসব। তবে দুটোতেই আমরা প্রিয়জনকে পাশে পেতে চাই। সে কথা মাথায় রেখেই আমরা দম্পতি পোশাকের নকশা করেছি। অর্থাৎ বাঙালি ঐতিহ্যের পাশাপাশি পাশ্চাত্য ঘরানার নকশাও পাবেন। গুরুত্ব পেয়েছে পোশাকে স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয়টি। রঙের ক্ষেত্রে হলুদ-লাল তো বটেই; কমলা, কালো, সবুজ রংও প্রাধান্য পেয়েছে।’

বিশেষ এ দিনে সাজপোশাকও কিন্তু কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ভালোবাসা দিবস ও পয়লা ফাল্গুন যেহেতু একই দিনে, তাই কচি কলাপাতা, হালকা হলুদ রং দিনের প্রথম প্রহরে হতে পারে আপনার সঙ্গী। বসন্তের আমেজ উদ্যাপনে দুপুর বা বিকেলের সাজপোশাকে উজ্জ্বল রং থাক। হলুদ, সবুজ, বাসন্তী, কমলা পোশাকে থাকতে পারে বেগুনি, ম্যাজেন্টা, লাল, মেরুনের ছাপ ও নকশা। দেশীয় ভাবধারার পোশাকের চাহিদাই বসন্তবরণ উপলক্ষে বেশি থাকে। সুতি বা তাঁতের পোশাকের পাশাপাশি ইদানীং মসলিন বা সিল্কের পোশাকের কদরও বেড়েছে।

ড্রেপ-ও-ক্যানভাসের স্বত্বাধিকারী নওশিন নূর বলছিলেন, ‘হাতে আঁকা (হ্যান্ডপেইন্টেড) মসলিন এখন উৎসব-পার্বণে জনপ্রিয়। এটি আপনার সাজসজ্জায় যেমন আভিজাত্য এনে দেয়, তেমনি দেশীয় ঐতিহ্যকেও তুলে ধরে। উৎসবটি যখন ভালোবাসা দিবস বা পয়লা ফাল্গুন, তখন পোশাকে হাতে আঁকা নকশা, রঙিন ফুল-পাতা-পাখির চাহিদা তো স্বভাবতই বেশি।’

রাতের সাজসজ্জায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে ‘ভালোবাসার রং’। এ উপাধি সচরাচর আমরা লাল রংকেই দিই। ক্রিমসন রেড বা মেরুন পোশাক নির্দ্বিধায় বেছে নেওয়া যায় ঘরোয়া ক্যান্ডেল লাইট ডিনারের জন্য। শাড়ি তো মানিয়ে যাবেই, তবে টুকটুকে লাল স্লিপ গাউন বা জাম্পস্যুট আনবে ভিন্ন আমেজ।

ছেলেরা মেরুন বা বারগেন্ডি শেডের পাঞ্জাবি বেছে নিতে পারেন। একই শেডের শার্টও দারুণ মানিয়ে যাবে। তবে দিনটি যেহেতু দুজন মিলে উদ্যাপনের, তাই সঙ্গীর পোশাকের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পোশাক পরাই শ্রেয়। একই রং বা নকশার পোশাক মানেই যে ‘সামঞ্জস্যপূর্ণ’ পোশাক, তা কিন্তু নয়। পোশাকের থিম হতে হবে মানানসই। তাই দেশীয়, পশ্চিমা বা ফিউশন—যেকোনো একটি থিম বেছে নিন।

তবে পোশাক যে রং বা যে নকশারই হোক না কেন, আপনার সাজসজ্জার সঙ্গী হতে পারে প্রিয় কোনো নিদর্শন, বিশেষ কোনো স্মৃতিচিহ্ন। আনিকা তাসনিম ও সাদাত চৌধুরী দীর্ঘ সাত বছর প্রেম করার পর বিয়ের পিঁড়িতে বসেছেন এ বছরের জানুয়ারিতে। ভালোবাসা দিবসের সাজসজ্জা নিয়ে আনিকা বলছিলেন, ‘অফিসের তাড়াহুড়োয় আলাদা করে সাজার সময় না-ও পেতে পারি, সাজলেও সেটি হয়তো অফিস থেকে ফেরার পর। তবে সারা দিন আমার সঙ্গী হয়ে থাকবে রোজগোল্ড পার্ল নেকলেস। কেননা, এত বছর পরও এ নেকলেস দেখলে প্রেমের প্রথম দিকের দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায়, এটিই ওর দেওয়া প্রথম উপহার।’

default-image

লেখাটি যখন লিখতে শুরু করেছিলাম, তখনো আমি ঠিক জানতাম না ঘরে বসেও ‘ভালোবাসা দিবস’-এর এমন সব দুর্দান্ত আয়োজন করা যায়। তবে নবদম্পতিদের সঙ্গে বিশেষ এ দিন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে জেনেছি অনেক কিছু, শিখেছি সব প্রতিকূলতা জয় করে ‘ভালোবাসি’ বলতে পারার নামই আদতে ‘ভালোবাসা’। এসব ভাবতে ভাবতে তাই আমি আবার ফিরে যাই অঞ্জন দত্তের কাছে, তাঁর সুরে সুর মিলিয়ে গেয়ে উঠি,

‘ভালোবাসা মানে আগাম চলার সুখ

ভালোবাসা মানে অবিরাম চলাবসা

ভালোবাসা মানে আঁখিপল্লব ছুঁয়ে

চিনতে শেখা শেষ কাব্যিক ভাষা!’

বিজ্ঞাপন
নকশা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন