‘চড়ুইভাতি’ মানেই একরাশ ছেলেমানুষি আর হাসি আনন্দে মেতে থাকার দিন।
‘চড়ুইভাতি’ মানেই একরাশ ছেলেমানুষি আর হাসি আনন্দে মেতে থাকার দিন।ছবি নকশা

কুয়াশাঝরা শীতের রাতে দুরুদুরু দুরুদুরু বুকে খেত থেকে পেঁয়াজ তুলে আনা, বাড়ির বড়দের দেখেও না দেখে, শুনেও না শোনার ভান, ঝাল-লবণ-হলুদের বাহুল্যে গড়িয়ে যাওয়া রাত, পৌষ-মাঘের শীতে তির তির করে কাঁপতে থাকা আগুনের শিখায় হলদে ভাব আর অপরিণত বয়সের আত্মতৃপ্তি—এরই নাম তো চড়ুইভাতি। নদীর চরে না হলেও আটপৌরে পারিবারিক গণ্ডির বাইরে এই একটা রাতের অর্ধেক কাটানোর স্মৃতি আমাদের তৃপ্ত করে চলে জীবনভর। সে গল্প চলতে থাকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

সে জন্যই হয়তো শীতের দিনে ‘চড়ুইভাতি’ শব্দটি শুনলেই কেমন চনমনে ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে যায়। সময়ের স্রোতে স্মৃতিতে ধুলো জমলেও শব্দের চিত্রকল্পে ধুলো জমে না। পৌষ-মাঘের শীত আর বাড়ন্ত শীতের সবজি চুরি করে সাধের চড়ুইভাতির স্মৃতি কুয়াশাঘেরা জীবনে আগুনের উষ্ণতা।

আর একটু বড় হলে শুরু হয় বন্ধুদের সঙ্গে দূরে যাওয়ার পরিকল্পনা। বন থাকলে ভালো, না থাকলেও চলে। কিন্তু মাইক থাকতে হবে। থাকতে হবে প্রায় ঝকঝকে নতুন মিনিবাস। শক্ত করে মাইক আর রান্নার হাঁড়ি-পাতিল বেঁধে বাসের ছাদে বসে বেসুরো গলায় ‘চলো না ঘুরে আসি অজানাতে...’ গাইতে গাইতে যাওয়া সে যাত্রার নাম পিকনিক। আর স্কুল–কলেজ থেকে যাওয়া হলে সেটাই হয় শিক্ষাসফর। সে যা–ই হোক, হইহই রইরই করে টইটই করে বেড়ানো আর আনন্দটাই মূল।

পিকনিক মানেই খাবারদাবারের এক বিরাট পরিকল্পনা। তার কতটুকু বাস্তবায়ন হবে, সেটা পরে। আমার স্মৃতিতে এখনো যা আছে বলে রাখি। প্রথম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত যতবারই পিকনিক গেছি, একটি খাবার ছিল খুব সাধারণ। সেটা হলো পোলাও সঙ্গে মাংস। বিশেষ করে সর্বজনীন খাবার হিসেবে থাকত মুরগির রোস্ট। আর বুটের ডাল। স্থানীয়ভাবে কিছু সংগ্রহ করা গেলে সেটা যোগ হতো। যেমন নদীর তাজা মাছ কিংবা দই বা বিখ্যাত মিষ্টি। কিন্তু আমাদের আকর্ষণের জায়গা ছিল কোমল পানীয়। দুপুরের খাবারের সঙ্গে একটা করে কোমল পানীয়ের বোতল দেওয়া ছিল বাধ্যতামূলক। সকালের প্যাকেট করা নাশতায় থাকত কলা, সেদ্ধ ডিম আর পাউরুটি। ফিরতি পথে এ রকম হালকা খাবার রাস্তা থেকেই নিয়ে নেওয়া হতো।

বিজ্ঞাপন

কৈশোর আর তারুণ্য-যৌবনের প্রথম ভাগ পেরিয়ে যখন পরিণত বয়স আসে তখন পিকনিক হয় একটু অন্য রকম। রিসোর্ট বিলাস বা পরিচিত গণ্ডির মানুষজন নিয়ে রিভার ক্রুজ হালের পিকনিক ক্রেজ। বিলাসী রিসোর্ট বা ট্যুর কোম্পানিগুলোর বিভিন্ন অফার থাকে এখন পিকনিক করার জন্য। অবশ্য এগুলোকে এখন আর পিকনিক বলে না। বলে প্যাকেজ ট্যুর। এর আওতা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে হয়েছে আন্তর্জাতিক।শব্দের ইন্দ্রজাল জীবনের বিভিন্ন প্রান্তে যে ‘গুড ফিলিং’ তৈরি করে তাতে চড়ুইভাতি শব্দটি কিশোর বয়সের সঙ্গেই মানানসই, বনভোজন যেমন যুবক বয়সের। আর রিসোর্ট বিলাস নেহাতই পরিণত বয়সের অবসর বিনোদনের নাম। চিরাচরিত অভ্যাসকে দূরে সরিয়ে রেখে একটি দিন কিংবা একটি বেলা অথবা ট্যুর কোম্পানির প্যাকেজের ভিন্নতর যাপন রক্তে কিছু উত্তেজনা তৈরি করে। এ উত্তেজনা শরীর ও মনের পক্ষে স্বাস্থ্যকর।

চড়ুইভাতির স্মৃতি আর বিবর্তনের প্যাকেজ ট্যুর, যা–ই হোক না কেন, পৃথিবীর আনন্দযজ্ঞে তার আয়োজন থাকবে।

মন্তব্য করুন