সোজা, কোঁকড়া, ঢেউখেলানো, নিয়ম মেনে যত্ন নিলে সব চুলেই থাকবে সতেজ। মডেল : দীপা, জুঁই, তাবিনদা, সাজ : অরা বিউটি লাউঞ্জ।
সোজা, কোঁকড়া, ঢেউখেলানো, নিয়ম মেনে যত্ন নিলে সব চুলেই থাকবে সতেজ। মডেল : দীপা, জুঁই, তাবিনদা, সাজ : অরা বিউটি লাউঞ্জ।ছবি : কবির হোসেন।

‘মেঘ–বৌ’র খোঁপাখসা জ্যোৎস্নাফুল চুপে চুপে ঝরে,—

চেয়ে থাকি চোখ তুলে—যেন মোর পলাতকা প্রিয়া

মেঘের ঘোমটা তুলে প্রেত-চাঁদে সচকিতে ওঠে শিহরিয়া!’

কিংবা

‘মেঘের মতো গুচ্ছ কেশরাশি

শিথান ঢাকি পড়েছে ভারে ভারে।’

জীবনানন্দের কাব্যে মেঘবৌয়ের খোঁপা কিংবা কবিগুরুর নিদ্রিতার কেশরাশি—বাংলা কাব্যসাহিত্যে চুলের রূপবর্ণনার ধারা চলে এসেছে এ রকম নানাভাবে। প্রত্যেক মানুষই আলাদা; নিজস্বতায় অনন্য। চুলের বেলায়ও তাই। একেকজনের চুল একেক রকম সুন্দর।

default-image
বিজ্ঞাপন

তবে চুলের সুস্থতাই নিশ্চিত করে চুলের সৌন্দর্য। সুস্থ চুলের জন্য প্রয়োজন চুলের ধরন বুঝে যত্ন নেওয়া। তেলে চুল তাজা—কিন্তু সব ধরনের চুলই কি তেলে তাজা বা সতেজ হয়? সতেজ চুলের জন্য কী করা উচিত, কী এড়িয়ে চলা উচিত, তা নির্ভর করে চুলের ধরনের ওপর।

সব ভালো সব চুলের জন্য ভালো নয়। সোজা ধাঁচের, কোঁকড়ানো আর ঢেউখেলানো—মূলত এই তিন গঠনের চুল আমরা দেখে থাকি। আর এসব গঠনের কারণ লুকিয়ে আছে চুলের গোড়ায়। অর্থাৎ মাথার ত্বকের বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে চুলের বৈশিষ্ট্য। এমনটাই জানালেন রেড বিউটি স্যালনের রূপবিশেষজ্ঞ আফরোজা পারভীন। তবে চুলের ধরন যেমনই হোক না কেন, খুব বেশি সময় যেন গোড়া ভেজা না থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। চুল ভেজা অবস্থায় মোটা দাঁতের চিরুনি বা ব্রাশ দিয়ে আঁচড়ে আঁচড়ে ভালোভাবে শুকিয়ে নিয়ে এরপর বাঁধতে হবে।

ঢেউখেলানো চুল

ঢেউখেলানো চুলের ঝামেলা কম। আফরোজা পারভীন জানান, মাথার ত্বক তৈলাক্ত হলেও চুলের নিচের দিকটা একটু ঢেউখেলানো থাকে। সহজ পদ্ধতিতে নিয়মিত যত্ন নিলেই এ ধরনের চুল ভালো থাকে। সপ্তাহে অন্তত এক দিন কুসুম গরম তেল মালিশ করতে হবে। চুল পড়ার সমস্যা না থাকলে এই একটি অভ্যাসই আপনার চুল সুস্থ রাখতে সহায়তা করবে। চাইলে প্যাক ব্যবহার করতে পারেন। আধা কাপ আমলা প্যাক (আমলকী, হরীতকী ও বহেরার গুঁড়া কিনতে পাওয়া যায়) ও ১ কাপ টক দই মিশিয়ে সপ্তাহে দুই দিন ব্যবহার করলে চুলের গোড়া মজবুত হবে, চুল থাকবে সুন্দর। তবে চুলে রং করা থাকলে এই প্যাক শুধু মাথার ত্বকে লাগানো যাবে, চুলে নয়।

বাইরে থেকে ফিরেই শ্যাম্পু করুন, বাইরে না গেলে এক-দুই দিন পরপর। যেকোনো শ্যাম্পুই বেছে নিতে পারেন। এ ছাড়া মাসে এক-দুবার স্পা করানো যেতে পারে।

default-image
বিজ্ঞাপন

সরল চুলের জটিল কথা

যাঁদের মাথার ত্বক, অর্থাৎ চুলের গোড়ার অংশ থেকে বেশ তেল নিঃসৃত হয়, তাঁদের চুল সাধারণত সুস্থ থাকে। এ ধরনের চুল সোজা হয়ে থাকে, মানে ভাঁজ বা ঢেউ তেমন থাকে না বললেই চলে। তবে তৈলাক্ত চুলে সহজে ময়লা আটকে যেতে পারে, যা থেকে চুলের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আবার অতিরিক্ত তেল নিঃসৃত হলে চুল তেল–চুপচুপে দেখাতে পারে, চুল লেপ্টে থাকতে পারে। তখন চুল সুন্দর দেখায় না বলে মন খারাপ করেন অনেকে। রোজ শ্যাম্পু করলেও তাঁদের চুল তেলতেলে দেখাতে পারে। আবার শীতে খুশকিও হতে পারে। এ ধরনের চুলের যত্ন নেওয়ার নিয়ম জানালেন আফরোজা পারভীন।

 এ ধরনের চুল ও মাথার ত্বক পরিষ্কার রাখাটা খুবই জরুরি। প্রতিদিন শ্যাম্পু করার প্রয়োজন পড়ে। এ ধরনের চুলের উপযোগী শ্যাম্পু বেছে নিতে হবে।

 শ্যাম্পুর পর কন্ডিশনার ব্যবহারের প্রয়োজন নেই।

 এ ধরনের চুলের জন্য ঠান্ডা পরিবেশ ভালো।

 প্রতি ১০ দিনে একবার মেহেদি পাতার প্যাক ব্যবহার করলে চুল লেপ্টে থাকার প্রবণতা কমে। বাটা মেহেদি (১ কাপ), মেথিবাটা (১ টেবিল চামচ) ও পছন্দমতো তেল (২ চা-চামচ) নিয়ে প্যাক তৈরি করুন। এই প্যাকে চুলে রং হবে না, কিন্তু চুল থাকবে সুস্থ। মেহেদি বেশি গাঢ় করে বাটা হলে একটু তেল দিয়ে পাতলা করে নিতে পারেন। চুলে লাগানোর পর ২০ মিনিটের বেশি সময় রাখবেন না।

 শীতের সময় চাইলে মেহেদি পাতার প্যাকের পরিবর্তে টক দইয়ের প্যাক ব্যবহার করা যায়। ১ কাপ টক দই ও ২ টেবিল চামচ লেবুর রস মিশিয়ে এই প্যাক তৈরি করতে পারেন।

default-image

কোঁকড়া চুলের যত্ন চাই

মাথার ত্বক শুষ্ক হলে চুলের ধরন রুক্ষ ও কোঁকড়া হয়ে থাকে। অল্পসংখ্যক মানুষের ক্ষেত্রে চুল কোঁকড়া হলেও মাথার ত্বকটা তেমন শুষ্ক থাকে না বা কোঁকড়া চুল খুব একটা রুক্ষ হয় না। তবে বাকিদের ক্ষেত্রে রুক্ষতা দূর করাটাই চুল সুস্থ রাখার মূল উপায়। রুক্ষ, কোঁকড়ানো চুলের আগা ফাটা বা দুই ভাগ হয়ে যাওয়া কিংবা চুল ভেঙে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা যায়। চুল নিষ্প্রাণ, মলিন দেখায়। এ যেন শুষ্ক মাটিতে জন্মানো অসুস্থ চারাগাছ। এ ধরনের চুলে জট বাঁধতে পারে সহজেই, ছিঁড়েও যেতে পারে। চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই এ চুলের চাই ঠিকঠাক যত্ন।

আফরোজা পারভীন বলেন, এ ধরনের চুলের সুস্থতায় সপ্তাহে অন্তত দুই দিন কুসুম গরম তেল মালিশ করা জরুরি। কোনো বাড়তি যত্ন নেওয়ার সময়-সুযোগ না হলেও তেল মালিশের সময় বের করে নিতেই হবে। তেলের সঙ্গে মিশিয়ে নেওয়া যেতে পারে ভিটামিন ই ক্যাপসুল।

বিন্দিয়া এক্সক্লুসিভ বিউটি কেয়ারের রূপবিশেষজ্ঞ শারমিন কচি জানালেন, কোঁকড়া চুলের জন্য ময়েশ্চারাইজারসমৃদ্ধ শ্যাম্পু বেছে নেওয়া উচিত। শ্যাম্পুটি যেন স্বাভাবিক বা শুষ্ক চুলের শ্যাম্পু হয়। ময়েশ্চারাইজিং শ্যাম্পু মাথার ত্বককেও আর্দ্র করে।

default-image
বিজ্ঞাপন

কোঁকড়া চুলের যত্ন নেওয়ার আরও উপায়

রোজ শ্যাম্পু করা ঠিক নয়। শ্যাম্পুর পর কন্ডিশনার ব্যবহার করতে হবে। সময় বাঁচানোর জন্য শ্যাম্পুর সঙ্গে কন্ডিশনার মিশিয়েই ব্যবহার করা যেতে পারে। ডিপ কন্ডিশনিংয়ের জন্য সালফেট ফ্রি (মাইল্ড বা হালকা) শ্যাম্পুর সঙ্গে বেশি পরিমাণ কন্ডিশনার মিশিয়ে ধীরে ধীরে চুলে লাগাতে হবে।

১০ দিনে একবার কুসুম গরম তেল মালিশ করতে পারেন।

চুল শুকনা থাকা অবস্থায় জট ছাড়ানোর চেষ্টা করা যাবে না। এতে চুল ভেঙে যেতে পারে। চুলের জট ছাড়ানোর জন্য স্প্রে ব্যবহার করতে পারেন।

নরম তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে হবে ধীরে ধীরে। তোয়ালে দিয়ে পেঁচিয়ে রেখেও চুল শুকাতে পারেন।

হেয়ার ড্রায়ার, হেয়ার স্ট্রেইটনার, হেয়ার কার্লার ব্যবহার না করাই ভালো। খুব তাড়াহুড়ায় থাকলে ড্রায়ার ব্যবহার করলেও সঙ্গে ডিফিউজার ব্যবহার করুন।

পর্যাপ্ত পানি পান করুন।

গরম পানি দিয়ে চুল ধোয়া যাবে না। তবে প্রয়োজনে কুসুম গরম পানি ব্যবহার করা যাবে।

সপ্তাহে দুই দিন কুসুম গরম তেল মালিশ করার পর টক দইয়ের প্যাক ব্যবহার করা যেতে পারে। ১ কাপ টক দইয়ের সঙ্গে ২ টেবিল চামচ মেথি মিশিয়ে ব্লেন্ড করে নিতে পারেন। কিংবা আধা কাপ টক দই, আধা কাপ পাকা পেঁপে, পাকা কলা অর্ধেকটা (বড় আকারের হলে) এবং দেড় চা-চামচ মধু ব্লেন্ড করে প্যাক তৈরি করতে পারেন। প্যাক লাগিয়ে ২০ মিনিট রাখতে হবে।

ভেষজ তেল ব্যবহার করতে পারেন।

দেড়-দুই মাস অন্তর চুলের আগা কাটা জরুরি। এর জন্য বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন। বাড়িতে নিজে নিজে বিশেষ পদ্ধতি মেনে চুলের আগা কাটা সম্ভব হয়ে ওঠে না, যা করতে বেশ সময়ও প্রয়োজন। ভেজা অবস্থায় চুল কাটলে চুল শুকিয়ে যাওয়ার পর স্টাইলটাই আলাদা দেখাতে পারে।

স্পা ট্রিটমেন্ট, প্রোটিন ট্রিটমেন্টও নেওয়া যেতে পারে।

মন্তব্য পড়ুন 0