রিডিং গ্লাস আর স্মোকিং পাইপ ঘরে সত্যজিতের নিত্য সঙ্গী
রিডিং গ্লাস আর স্মোকিং পাইপ ঘরে সত্যজিতের নিত্য সঙ্গী

বাড়ি থেকে কাজের জায়গা, পোশাক নির্বাচনে সত্যজিৎ রায়ের রুচির ছাপ স্পষ্ট

বিজ্ঞাপন

ঘরভর্তি বইয়ের মধ্যে চামড়ার তৈরি চেয়ারে বসা তিনি। পরনে সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা, চোখে ভারী কাচের চশমা, হাতে খোলা বই। পেছনের জানালা গলে ঘরময় গড়াগড়ি খাচ্ছে কলকাতার বিখ্যাত ‘কমলা রোদ্দুর’। আলোকচিত্র নিমাই ঘোষের তোলা এই বিখ্যাত ছবির মাধ্যমে আমার প্রথম ‘সত্যজিৎদর্শন’। আর সেবারই প্রথম জানলাম, স্রেফ ঘরে পরা পোশাকেও আভিজাত্য আর ব্যক্তিত্বের এমন অনবদ্য প্রকাশ সম্ভব। পরক্ষণেই অবশ্য মনে হয়েছিল, সত্যজিৎ রায়ের মতো একজন পলিম্যাথ বোধ হয় সবই পারেন!

সত্যিই তাই, ছবি আঁকা থেকে শুরু করে লেখালেখি কিংবা চলচ্চিত্র নির্মাণ—সবটাতেই ছড়িয়ে আছে তাঁর সংবেদনশীল রুচির ছাপ। নিজের পোশাক নির্বাচনেও সেটার ব্যতিক্রম ঘটেনি। ঘরে পরতেন কারুকাজহীন সাদা বা ঘিয়ে রঙের পাঞ্জাবি-পায়জামা আর চপ্পল। শীতকালে গায়ে জড়াতেন কাশ্মীরি শাল। অনুষঙ্গ হিসেবে কখনো চোখে দেখা যেত রিডিং গ্লাস, কখনো আবার ঠোঁটের কোণে স্মোকিং পাইপ। বেশির ভাগ আলোকচিত্রে হাতে দেখা যায় বই বা ক্যামেরা। ঠিক যেন জীবন্ত ফেলুদা! কেউ কেউ বলেন, ফেলুদার শারীরিক গড়ন আর পোশাক সত্যজিৎ রায় সত্যিই তাঁর নিজের আদলে গড়েছিলেন। ‘ফেলুদা’ সিরিজের বইয়ে তাঁর নিজের আঁকা ছবিও অবশ্য সে কথাই বলে। সেই একই রকম বসার ভঙ্গি, পরনে পায়জামা-পাঞ্জাবি। ভালো করে দেখলে দৃষ্টির তীক্ষ্ণতাতেও যেন মিল পাওয়া যায়!

default-image
বিজ্ঞাপন

পরিশীলিত ব্যাপারটি সত্যজিৎ রায়ের ফ্যাশন সেন্সে উপস্থিত ছিল সর্বদা, সর্বত্র। বীরভূমের কাদামাখা রাস্তায় বা পালামৌয়ের ঘন শালবনেও ক্যামেরার পেছনে সত্যজিৎ রায় যেন সাক্ষাৎ রাজপুত্র! সফেদ পাঞ্জাবির আড়মোড়া ভেঙে তখন অবশ্য তিনি শুটিং স্পটের রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ের জন্য একদম প্রস্তুত। কিছুটা গুটিয়ে রাখা ট্রাউজার বা প্যান্টের সঙ্গে পরতেন হাফহাতা শার্ট। সে সময়ের ফ্যাশন অনুযায়ী, শার্টের হাতার দৈর্ঘ্য কনুই ছাড়াত না। প্রায় সব সময়ই বেছে নিতেন সাদা, বেজ, ধূসর, আকাশির মতো হালকা রঙের ডোরাকাটা শার্ট। তবে শুটিং লোকেশনের আবহাওয়া অনুযায়ীও পোশাক পরতে দেখা গেছে অস্কারজয়ী এই চিত্র পরিচালককে। জয়সলমিরে ‘সোনার কেল্লা’র শুটিংয়ের কথাই ধরা যাক। বিস্তীর্ণ মরুভূমিতে, পাথুরে কেল্লায় সত্যজিৎকে দেখা যায় নেভি ব্লু সাফারি স্যুটে। আবার দার্জিলিংয়ে ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’র শুটিংয়ে তাঁর পরনে বাল্টিক ব্লু শেডের স্যুট আর সাদা উলের মাফলার। স্যুট-টাইতেও দুর্দান্ত স্মার্ট ছিলেন আমাদের জাদুকর সত্যজিৎ রায়। দেশে-বিদেশে নানা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ছুটতে হতো তাঁকে। বার্লিন, রোম, ম্যানিলা কিংবা কান চলচ্চিত্র উৎসবে স্যুট পরিহিত সত্যজিৎ ভীষণ ধোপদুরস্ত। ছয় ফুট তিন ইঞ্চি উচ্চতা আর বুদ্ধিদীপ্ত মুখশ্রীর এই গুণী পরিচালক যখন হেঁটে যেতেন লালগালিচা বিছানো পথে, কোনো নায়কের চেয়ে কোনো অংশে কম মনে হতো না তাঁকে।

default-image

ছিমছাম পোশাকই তাঁর সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিল বটে, তবে ‘একসেন্ট্রিসিটি’ বা বিচিত্রতার প্রভাবও দেখা গিয়েছে কখনো-সখনো। ‘গুপী গাইন বাঘা গাইন’-এর শুটিংয়ে যেমন তাঁর সঙ্গী হয়েছে বারান্দাওয়ালা সাহেবি টুপি। আর ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’র শুটিংয়ে নিমাই ঘোষের তোলা ছবিতে দেখা যায় বিশ্বনন্দিত এই পরিচালক পরেছেন স্যুটের সঙ্গে মানানসই রঙিন নেকটাই। এখানেই শেষ নয়, ফ্রান্সের সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক ‘লিজিয়ঁ দ্য অনার’ গ্রহণের অনুষ্ঠানে ড্রেস কোডের তোয়াক্কা না করে সত্যজিৎ রায় হাজির হয়েছিলেন সম্পূর্ণ দেশি পোশাকে। ঘিয়ে পাঞ্জাবি আর চিকনাই পাড়ের সাদা ধুতিতে ফরাসি অনুষ্ঠানেও কী ভীষণ সপ্রতিভ তিনি!

default-image

বিশ্বব্যাপী সত্যজিৎ রায় গুণী আঁকিয়ে, বিখ্যাত লেখক, নন্দিত পরিচালক হিসেবেই বেশি পরিচিত। তবে নিজের নির্মিত চলচ্চিত্রে ‘কস্টিউম ডিজাইনার’ হিসেবেও প্রতিভার প্রমাণ রেখেছিলেন তিনি। সিনেমার চরিত্রগুলো পোশাক-পরিকল্পনায় ঘটিয়েছেন তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের প্রতিফলন। তাই দেখা যায় ‘সোনার কেল্লা’র ভিলেন মন্দার বোসের পরনে তাসের ছবি আঁকা চক্রাবক্রা শার্ট। আবার ‘হীরক রাজার দেশে’ সিনেমার স্বৈরাচারী শাসক হীরক রাজার চরিত্রের নেতিবাচকতার কথা ভেবেই হয়তো কালো রঙের পোশাক বেছে নেওয়া হয়েছে তার জন্য। পোশাকে আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যও যথার্থভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন সত্যজিৎ রায়। এর সবচেয়ে উপযুক্ত প্রমাণ মেলে ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’র দুলি আর ‘অভিযান’-এর গুলাবি চরিত্রের পোশাক-পরিকল্পনায়। দুলিরূপী সিমি গারেওয়াল ডুরে শাড়ি আর রুপার গয়নায় মনোরমা সাঁওতালি কন্যা। অন্যদিকে, রাজস্থানি তরুণী ‘গুলাবি’ চরিত্রে ওয়াহিদা রেহমানের জন্য বেছে নিয়েছেন রঙিন ঘাগরা-চোলি আর ঐতিহ্যবাহী অলংকার। হাল আমলের হিন্দি সিনেমায় আমরা যেমন রাজস্থানি চরিত্রের পরনে কাচ-বসানো ঘাগরা-চোলি আর তামাটে গয়নার আধিক্য দেখি, তা কিন্তু অনুসরণ করেননি গুণী এই নির্মাতা। বরং স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছেন রাজস্থানি সংস্কৃতির অন্যতম পরিচায়ক লেহেরিয়া-বান্ধিনি কাপড়ের পোশাক আর সিলভার ফয়েলের গয়না।

বিজ্ঞাপন

নায়িকাদের পোশাক নির্বাচনে সব সময়ই দারুণ পারদর্শিতা আর সূক্ষ্ম রুচিবোধের পরিচয় দিয়েছেন বহুগুণে গুণান্বিত সত্যজিৎ রায়। ‘সমাপ্তি’ সিনেমায় অপর্ণা সেনকে মনে আছে তো? ব্লাউজ ছাড়া শাড়ি, নাকে ফুল আর জবজবে তেল দিয়ে টেনে চুল আঁচড়ানো—কী দারুণ মিষ্টি আর মানানসই দস্যি মৃণ্ময়ী! আর ঠিক উল্টো চরিত্র ‘কাপুরুষ’ সিনেমার নায়িকা করুণা। শহুরে, আধুনিক তরুণী সে। তার পোশাক হিসেবে সত্যজিৎ বেছে নিলেন স্নিগ্ধ সিল্কের শাড়ি আর পাথরের গয়না। এমন পরিশীলিত পোশাক তখনকার দিনে ছিল ভীষণ বিরল! অবশ্য সৌন্দর্যবোধ বিচারে নায়ক-নায়িকাতে তফাত করেননি তিনি। তাঁর সিনেমায় নায়কদের পোশাক-পরিকল্পনাও মানানসই আর মার্জিত। ‘ঘরে-বাইরে’ সিনেমায় ভিক্টর ব্যানার্জির শালগুলোর কথাই ধরুন। কাহিনিচিত্রের সঙ্গে মানিয়ে আদ্দির, সিল্ক, খদ্দর, পাঞ্জাবি, কাশ্মীরিসহ নানা রকমের দৃষ্টিনন্দন শাল পরেছেন তিনি। আর ‘চারুলতা’ সিনেমায় ‘অমল’রূপী সৌমিত্র চ্যাটার্জির পোশাক তো রীতিমতো ফ্যাশন আইকনে পরিণত করেছিল এই অভিনেতাকে।

কথায় বলে পোশাক নাকি রুচির বাহক। নিজের রোজকার পোশাক বাছাইয়ে তো বটেই, সিনেমার চরিত্রগুলোর পোশাক-পরিকল্পনায়ও সে কথার সত্যতা প্রমাণ করেছেন তিনি। মানানসই, মার্জিত পোশাকে তিনি ও তাঁর সিনেমার চরিত্রগুলো হয়ে উঠেছে ‘পারফেকশন’-এর উপযুক্ত সংজ্ঞা ও উদাহরণ।

নকশা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন