default-image

তখন আমি নেহাতই ছোট। ভোরবেলা বাড়ির কাছেই লেকে সকালে হাঁটতে গেছি। হঠাৎ চোখে পড়ে দীর্ঘ, সুঠাম চেহারার এক যুবক লেকে ঢুকছেন। পরনে সাদা–কালো ডোরাকাটা টি–শার্ট আর সাদা সুতির প্যান্ট। চোখ ফেরানো যাচ্ছে না। সেই প্রথম তাঁকে দেখা। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

আজও স্পষ্ট মনে আছে সেই স্মৃতি। পরবর্তী সময়ে পেশার সূত্রে যখন দেখা হয়েছে তাঁকে বলেছিলাম সে কথা। আবার এই বছর পাঁচেক আগের কথা। বিশিষ্ট এক মনোবিদের বাড়িতে গেছি সাক্ষাৎকার নিতে। দেখি বাগ্রু প্রিন্টেড ট্রাউজার আর কুর্তা পরে এসেছেন নিছক ঘরোয়া আড্ডায়, বন্ধুর বাড়িতে। সেই ছেলেবেলায় যেমন মুগ্ধ হয়েছিলাম, এবারও তেমনই। বাগ্রু প্রিন্টেড ট্রাউজার বহন করা চাট্টিখানি কথা নয়।

বিজ্ঞাপন
default-image

আসলে তিনি সচেতনভাবে যে স্টাইল গড়ে তোলার চেষ্টা করতেন, তা নয়। সবটাই তাঁর সামগ্রিক নান্দনিক বোধের প্রতিফলন এবং সাহস। তাই রংচঙে টি–শার্ট কিংবা ধাক্কা পাড়ের ধুতি, খাদির বারমুডা কিংবা কাঁথা ফোঁড়ের আলোয়ান, সবেতেই তিনি ছিলেন সমান স্বচ্ছন্দ, তীব্র তার আবেদন। বারবারই উপলব্ধি করেছি তাঁর আভিজাত্য, রুচি, বৈদগ্ধ, পরিশীলিত আচার–আচরণ। একটা আলাদা স্বতন্ত্র ছিল তাঁর মধ্যে। ফ্যাশন, স্টাইল, গ্ল্যামার তো বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়, সামগ্রিক জীবনবোধ সঞ্জাত।

সুপার মডেল এবং সৌমিত্রের ভাইঝি নয়নিকা চ্যাটার্জি জানালেন, ফ্যাশন বা চলতিধারা নিয়ে কাকা মাথা ঘামাতেন না, কিন্তু নিজস্ব একটা স্টাইল ছিল। আসলে আদ্যন্ত একজন শিল্পী মানুষ ছিলেন তিনি। অভিনয়, সাহিত্য, সম্পাদনা, ছবি আঁকা, লেখা সবকিছুতেই সৃজনশীল ভাবনার ফসল, নান্দনিক বোধের পরিচায়ক। সত্যিই তো। তিনি নিজেও বলেছেন কোনো এক সাক্ষাৎকারে, চোখে সানগ্লাস পরলেই তো আর গ্ল্যামার বাড়ানো যায় না। খাঁটি কথা। এই উপলব্ধিটা ছিল বলেই তাঁর বাইরের সাজপোশাক নিছক বাইরের থেকে জানি। অন্তর বাইরে মিলেমিশে একাকার হয়েছে বলেই তো তিনি আমাদের প্রাণে এমনভাবে ঠাঁই পেয়েছেন।

default-image

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এমন এক ব্যক্তিত্ব, যিনি অনুসরণযোগ্য, আইডল, শ্রদ্ধার পাত্র, অথচ স্পর্শাতীত নন। নয়নিকা যথার্থই বলেছেন, ‘দারুণ মিষ্টি ব্যক্তিত্ব ছিল কাকার। সবার সঙ্গে একই ব্যবহার করতেন। আড্ডাবাজ মানুষ ছিলেন। মুড়ি–চপের আড্ডায় যেমন জমাটি, পানীয় আর গানের আসরেও তেমনই অব্যর্থ। খাবার ব্যাপারে তেমন খুঁতখুতে ছিলেন না। কিন্তু স্বাদ বুঝতেন দারুণ। আর আমাদের বাড়ির মানুষদের মিষ্টিপ্রীতি তো সকলের জানা।’

বিজ্ঞাপন
default-image

তাঁর জীবনের ক্যানভাসটাই বৈচিত্র্যে ভরা। অভিনেতা, কবি, আবৃত্তিকার, নির্দেশক, সম্পাদক, নাট্যকার নানা শিরোপায় ভূষিত বর্ণময়, ‘জীবনের থেকে বড়’ মানুষকে আমাদের চেনা ছকের মাপকাঠিতে ধরতে গেলে আসল নির্যাসটুকুই হারিয়ে ফেলব আমরা। যে মানুষটা কাজ আশ্রয় করেই বেঁচেছিলেন, কাজকে ভালোবেসেই জীবন ধারণ করতেন, সেই কাজের আলোকেই সমুজ্জ্বল হয়ে থাকবেন আমাদের মানসপটে।

লেখক: পশ্চিমবঙ্গের সাময়িকী সানন্দা–র সাবেক সম্পাদক

মন্তব্য পড়ুন 0