default-image

রাগ বাহারে আমির খসরু গাইছেন কাওয়ালি, সামনে বসে আছেন গুরু খাজা নিজাম উদ্দিন আউলিয়া। খসরু গাইছেন, ‘সকল বন ফুল রেহি সরসো...।’ এর ভাবানুবাদ করা যেতে পারে, ‘মাঠ ভরে গেছে হলুদ শর্ষে ফুলে।...’

এর পরের লাইনগুলোর ভাবানুবাদ হতে পারে এমন—

...ফুটেছে আমের মুকুল, ছড়িয়ে পড়েছে সুবাস

কোয়েল গাইছে ডালে ডালে

সুন্দরী নারীর সজ্জা হয়েছে শেষ

মালিনী এসেছে ফুলের তোড়া হাতে।

এ গান রচনার পেছনে এক কিংবদন্তি আছে। খাজা নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার মন শোকে ভারাক্রান্ত। কারও সঙ্গে কথা বলছেন না তিনি বেশ দীর্ঘদিন। গুরুতর এ অবস্থা দেখে আনচান করে ওঠে প্রিয় শিষ্য আমির খসরুর মন। কী করবেন, ভাবতে ভাবতে হঠাৎ একদিন তিনি দেখলেন, একদল নারী বাসন্তী রঙের শাড়ি পরে হাতে হলুদ ফুল নিয়ে কোথায় যেন চলেছেন। কৌতূহলী খসরু জিজ্ঞেস করে জানলেন, নারীরা চলেছেন মন্দিরে। খসরু চটজলদি নিজেই হলুদ রঙের শাড়ি পরে, হাতে হলুদ ফুল নিয়ে গেলেন নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার সামনে। প্রিয় শিষ্যের এ পাগলামি দেখে নিজাম উদ্দিন হাসলেন দীর্ঘদিন পর। খসরু তখন লিখে ফেলেন তাঁর সে বিখ্যাত কাওয়ালি।

খাজা নিজাম উদ্দিনের মৃত্যুর পর থেকে দিল্লিতে তাঁর মাজারে এখনো নিয়ম করে গাওয়া হয় আমির খসরুর সে কাওয়ালি প্রতি বসন্ত পঞ্চমীতে। সেদিন নিজাম উদ্দিনের মাজার ঢেকে দেওয়া হয় হলুদ কাপড়ে। আর তাঁর শিষ্যদের পরনে থাকে হলুদ উত্তরীয়, পাগড়িসহ হলুদ পোশাক।

বিজ্ঞাপন

আধুনিক ফ্যাশনজগতে রং যখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল পোশাকে ভিন্ন অর্থ তৈরি আর দৃঢ় বক্তব্য প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে, আমির খসরুর সে ঘটনা তার কয়েক শ বছর আগের। কিন্তু তারও আগে থেকেই মানুষ বসন্তের রং হিসেবে বেছে নিয়েছিল বাসন্তী রংকে, অর্থাৎ হালকা হলুদ রংকে। কিন্তু কেন? সে প্রশ্নের অনেকগুলো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।

নবপ্রাণ প্রকৃতিতে, মনে

শীতের বিবর্ণ সময়কে পাশ কাটিয়ে বসন্ত নতুন প্রাণের সূচনা করে। শীতের শেষ দিক থেকেই প্রকৃতি রঙিন হতে থাকে ধীরে ধীরে। সে রঙে থাকে হলুদের প্রভাব। ফুলগুলো বেশির ভাগই হলুদ। পরিপক্ব ফল এবং ফসলের মাঠের রং থাকে হলুদ কিংবা হলুদাভ। ফলে উষ্ণ বসন্তে মানুষের মনে হলুদ রঙের প্রভাব থাকে সবচেয়ে বেশি। মানুষের মনে প্রকৃতির এ প্রভাব থেকেই বসন্তের রং হলুদ বা বাসন্তী।

পরিপক্ব ফসলের ধারণা থেকে প্রাচীন ভারতবর্ষে হলুদ রং হয়ে গিয়েছিল জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও জ্ঞানদানের প্রতীক। উষ্ণ সময়ের রং বলেই সম্ভবত এটি আশা আর সুখের প্রতীক। শুধু ভারতবর্ষে নয়, পুরো পৃথিবীতেই হলুদ রং সুখ, শান্তি, সাহস, উষ্ণ, সতেজ, ইতিবাচকতার প্রতীক হিসেবে পরিচিত। যেমন প্রাচীন চীনে হলুদ রংকে ধরা হতো সুখ, গৌরব ও প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে। আধুনিক চীন দেশেও সে ধারা অব্যাহত রয়েছে। জাপানে এই রংটি সাহসের প্রতীক। আবার ইসলাম ধর্মে হলুদ রং জ্ঞান আর প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

পোশাকে হলুদের ছোঁয়া

আমাদের মনে রাখতে হবে, এখন যেমন আমাদের কাপড়ের মূল উৎস যান্ত্রিক তাঁত বা পাওয়ার লুম, তেমনি একসময় পরিধেয় বস্ত্রের মূল উৎস ছিল হাততাঁত। তাঁতে তৈরি সেসব কাপড়ে করা হতো প্রাকৃতিক রং। বসন্তকালে বা শীতের শেষ দিকে প্রাকৃতিক রং বা ন্যাচারাল ডাইয়ের জন্য স্বাভাবিকভাবে পাওয়া যেত হলুদ রঙের উপকরণ। সেসব দিয়ে কাপড়ে রং হতো হলুদ। কিন্তু সেটা খুব উজ্জ্বল হলুদ নয়। কিছুটা ফ্যাকাশে হলুদ, যেটাকে আমরা এখন বলি বাসন্তী রং।

আমাদের দেশের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিও এই হলুদ রংকে গ্রহণ করেছে বসন্তের রং হিসেবে এক দীর্ঘ ইতিহাসের উত্তরাধিকার হিসেবেই। অবশ্য আমাদের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে বসন্ত উৎসবের আলাদা পোশাক তৈরির গল্প খুব বেশি দিনের পুরোনো নয়।

মোগল ফ্যাশনে হলুদের প্রাধান্য ছিল বসন্তবরণ উৎসবের ক্ষেত্রে। হোলি বা বসন্ত পঞ্চমীর মিনিয়েচারগুলো খেয়াল করলে সেটা বোঝা যায়। এ বিষয়ে একটি ঘটনার উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না এখানে। দিল্লিতে বসন্ত পঞ্চমীর আবেশ এসেছে। শোনা গেল, একই দিনে সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের জন্মদিন। সম্রাটকে সম্মান জানাতে পুরো দিল্লি শহর ছেয়ে গেল বাসন্তী রঙে। বাড়িঘরের রং হলো হলুদ, পোশাক-পাগড়ি-শাড়ির রং হয়ে গেল বাসন্তী। তেমন অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখেই হয়তো কবি মির লিখলেন—

বাসন্তী কাবা পর তেরি মর গায়া হুঁ

কাফন দিজিও মির কো জাফরনি।

তোমার বাসন্তী বসনে মরি আমি

মিরকে দিয়ো তবে জাফরানি রঙের কাফন।

(অনুবাদ জাভেদ হুসেন)

আমাদের নবীন ফ্যাশনশিল্পে বাসন্তী রং গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে। আগামী এক দশক নববর্ষের চেয়ে বসন্ত উৎসব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে আমাদের ফ্যাশনজগতে। বাসন্তী রং তাই আমাদের জন্য ইতিবাচক ভাবনার প্রতীক হয়ে উঠবে ভবিষ্যতে।

বিজ্ঞাপন
নকশা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন