প্রিয়সঙ্গ উপভোগের জন্য পরিবেশ ও আয়োজন প্রয়োজন। যেমন দেখা যাচ্ছে সংগীতশিল্পী কনক আদিত্য ও ডিজাইনার ইশরাত জাহান দম্পতির বেলায়।
প্রিয়সঙ্গ উপভোগের জন্য পরিবেশ ও আয়োজন প্রয়োজন। যেমন দেখা যাচ্ছে সংগীতশিল্পী কনক আদিত্য ও ডিজাইনার ইশরাত জাহান দম্পতির বেলায়। ছবি: নকশা

খাবার না থাকলে নাকি ভালোবাসা জানালা দিয়ে পালায়! তাই বলে ভালোবাসা ধরে রাখার জন্য জানালা বন্ধ করে তো আর রাখা যায় না। তার চেয়ে বরং পেট ভরে খাওয়াদাওয়া করাই সহজ। আর সে জন্যই বোধ হয় বলা হয়ে থাকে, ভালোবাসার জন্মভূমি পেট। পেট খুশ তো দিল খুশ। হৃদয় যখন খুশি থাকে, তখন ভালোবাসার নদী ছুটে চলে দুকূল ছাপিয়ে।

বিজ্ঞাপন

ভালোবাসা কিংবা প্রেম—এসব অভিব্যক্তিকে যে নামেই ডাকুন না কেন; সেগুলোকে সতেজ রাখতে, বর্ণিল রাখতে খাবারদাবারের জুড়ি নেই। মোমবাতির আলোয় রাতের খাবারের আয়োজন অথবা কোনো বসন্ত গোধূলিতে নীল জলরাশিকে সামনে রেখে বালুকাবেলায় বসে স্ট্রবেরি বা চেরি দেওয়া একটি আইসক্রিম ভাগ করে খাওয়ার স্মৃতিই উজ্জ্বল থাকে জীবনে। চাকরি পাওয়া উচ্ছ্বসিত যুবক বেলা বোসকে মা–বাবার ঠিক করে রাখা সম্পর্ক যেমন ভেস্তে দিতে বলেছিল, তেমনি ‘রাস্তার কত সস্তা হোটেলে/ বদ্ধ কেবিনে বন্দী দুজনে...’ বলে স্মৃতিচারণাও করেছিল। বাঙালি তো চিরকাল রেস্তোরাঁকে হোটেলই বলে এসেছে, যেখানে সে রাতে ঘুমাক আর না ঘুমাক, পছন্দের খাবার খেতে যায়।

বাঙালির প্রধান রোমান্টিক খাবার নিঃসন্দেহে বাদাম, মানে চিনাবাদাম। আমাদের বেশির ভাগ রোমান্টিক সম্পর্কগুলোর শুরুই হয় বাদাম চিবোতে চিবোতে। নিকটতম দূরত্বে গাছের গোড়ায় বসে, দুজনের মাঝখানে বাদামের ঠোঙা রেখে, খোসা ছাড়িয়ে হাতের তালুতে আলতো ডলা দিয়ে, সে হাত মুখের কাছে এনে ফুঁ দিয়ে বাদামি স্বপ্ন উড়িয়েই বাঙালির রোমান্টিকতার শুরু। তারপর না দৃশ্যে আসে গোলাপ-রজনীগন্ধা বা সোনা অথবা হিরের আংটি। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে বাদামের ঠোঙা হাতে সমাজের ভয় তুচ্ছ করে যে সম্পর্ক তৈরি হয়, তা নিয়ে রোমান্টিকতম কোনো গান বা কবিতা আজও লিখিত হলো না। সে যাক, আমরা বরং গর্ব করতে পারি এই ভেবে যে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাদাম চিবোতে চিবোতেই কাছাকাছি আসার, একঝলক দেখে হৃদয়ে বিদ্যুৎ খেলে যাওয়ার মতো সম্পর্কের জন্ম হয়েই চলেছে একুশ শতকের প্রায় সিকি ভাগ চলে যাওয়ার পরও।

এ প্রসঙ্গে বুট ভাজা, ফুচকা কিংবা ঝালমুড়ির কথা না বললেই নয়। রিকশায় যেতে যেতে কাঁচা মরিচ, শর্ষের তেল আর টক আচারে মাখানো ঝালমুড়ি খাওয়ার মজা রসিকমাত্রই জানেন। পশ্চিমা দুনিয়া সে জন্যই হয়তো অনেক আয়োজন করে চিলি পেপারকে রেখেছে তাদের রোমান্টিক ফুডের তালিকায়। যে ফুচকা খেতে চায় না, তাকে জোর করে ফুচকা খাওয়ানো আর ফুচকায় থাকা তেঁতুলের টক জিবে পড়ার পর প্রিয় মানুষের যে বিচিত্র মুখভঙ্গি; বহু বছর পর অনেক কিছু ভুলে গেলেও একান্তে সেসব কথা মনে হয় কারও কারও।

বাঙালির জীবনে চকলেট মানেই ক্যান্ডি। আর বেবি লজেন্স বা মিমি চকলেটের মতো ক্যান্ডির সঙ্গে জড়িয়ে আছে হৃদয়ছোঁয়া রোমান্টিক সব মুহূর্ত। খাঁ খাঁ দুপুরে কতজনের বুক যে হাহাকার করে উঠত ক্যান্ডির অভাবে, সেটা এখন স্মরণ করলেই একটা ‘ফিল গুড’ অবস্থা তৈরি হবে হৃদয়ে। অনেক পরে অবশ্য কফি ফ্লেভারড ক্যান্ডির যুগ শুরু হয়। প্রেমে পড়ার সে বয়স পার হয়ে আসার পর এখন জানি, চকলেট আর কফি—দুটোই পুরো পৃথিবীতে রোমান্টিক খাবার হিসেবে স্বীকৃত। নিমেষে ডোপামিনের পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া ডার্ক চকলেট নাকি ভীষণ, ওই যাকে বলে রোমান্টিক মুহূর্ত, সেটি তৈরি করতে পারে। আর কফি? সম্পর্ক এগিয়ে নিতে তো শক্তি খরচ হয়, তাই না? তার বড় জোগান পাওয়া যায় কফিতে থাকা ক্যাফেইন থেকে। আর কফির অ্যারোমা? সেটা যদি হয় পৃথিবীবিখ্যাত অ্যারাবিকার সৌরভ, তাহলে মৌতাত জমে ওঠে দ্রুতই। এ জন্যই হয়তো হালে কফিশপ হয়ে উঠেছে হৃদয় বদলের জায়গা।

বিজ্ঞাপন

এটা অস্বীকার করা যায় না যে বাঙালির রোমান্টিকতার বোধের সঙ্গে দুনিয়ার অন্যান্য প্রান্তের মানুষের রোমান্টিকতার ফারাক আছে বিস্তর। আমাদের এই অঞ্চলে শুধু নারীরই নয়, পুরুষেরও বুক ফাটলেও মুখ ফোটে না রোমান্টিকতার ক্ষেত্রে। সেখানে রোমান্টিক খাবারের কথা ভাবাটা গুরুপাকের মতো ব্যাপার। প্রিয়সঙ্গ উপভোগের একটা পরিবেশ প্রয়োজন, আয়োজন প্রয়োজন। সেটা আমাদের ভাবনায় নেই। আমরা ভাবতেই পারি না যে প্রিয় মানুষটির সঙ্গে দেখা হলে তাকে এক ঝুড়ি আম উপহার দেওয়া যায় কিংবা এক ছড়া কলা। খেয়াল করে দেখবেন, এ দুটি ফল কিন্তু আমাদের রোমান্টিকতার সঙ্গী শত শত বছর ধরেই। প্রাচীন ভারতবর্ষে আমকে উর্বরতার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হতো। সে জন্য আমপাতা দিয়ে বিয়ের গেট সাজানো হতো বা হয়। উর্বরতার সে ধারণাকে কাজে লাগিয়ে পশ্চিমা দুনিয়া তাদের রোমান্টিক ফলের তালিকায় আমের নাম লিখে ফেলেছে। আর আমরা আমাদের তালিকায় লিখেছি স্ট্রবেরি, আপেল, চেরির নাম। অবশ্য আগেই বলেছি যে আমাদের রোমান্টিকতার সংজ্ঞাই আলাদা পশ্চিমের থেকে।

স্ট্রবেরি, আপেল, চেরি, আঙুর, ডালিম, ভ্যানিলা, ট্রাফলস, ঝিনুক, ডুমুর, কফি, লিচু, বিভিন্ন ধরনের বেরি ইত্যাদি রোমান্টিক ফল হিসেবে বিখ্যাত পুরো পৃথিবীতে। এর সঙ্গে আছে বিভিন্ন ধরনের ডেজার্ট। যেমন চকলেট ডিপ স্ট্রবেরি, ভ্যানিলা পান্না কোটা, স্প্যাগেটি কারবোনারা, সল্টেড ক্যারামেল পপকর্ন, রোমান্টিক রোজ কাপ কেক, চেরি শর্ট ব্রেড হার্ট ইত্যাদি। আর মেইন কোর্স? সে এক রাজকীয় ব্যাপারই বটে। অবশ্য রোমান্টিক খাবার হিসেবে পরিচিত পশ্চিমের মেইন কোর্সের বেশির ভাগই মূলত ওভেন বেকড। ওভেনে রান্না করা ছাড়া যে নেই, তা নয়। সেগুলোর মধ্যে অতি বিখ্যাত ডিশটির নাম ম্যারি মি চিকেন। চাইলে যে কেউই এর রেসিপি গুগলে দেখে নিতে পারেন। আছে বিফ টেন্ডারলইন, বিভিন্ন ধরনের টপিং দেওয়া বাড়িতে বানানো পিৎজা, ক্যাপ্রেস চিকেন পাস্তা, পারফেক্ট ফ্ল্যাঙ্ক স্টেক, ক্যাসিও ই পেপে, ফাইভ-চিজ মেরিনারা ইত্যাদি শত শত খাবার। এগুলোর কোনটি দিয়ে প্রিয়সঙ্গে উদর পূর্তি করবেন, সেটা এবার ভেবে নিন।

অনেক খাওয়াদাওয়া হলো। এবার মুখশুদ্ধির পালা। এক খিলি পান না হলে মুখশুদ্ধি হয় না, এটা বলে গেছেন আমাদের বুজুর্গ পূর্বপুরুষেরা। রোমান্টিক খাবার হিসেবে পানের নাম করলে অনেকেই তেড়ে আসবেন জানি। কিন্তু কী করব বলুন? মোগল ঘরানায় পান ছিল রোমান্টিক বস্তুই। অনেক পদের মসলা দিয়ে পান খাওয়ার চল ছিল রোমান্টিক মুহূর্তে, এসব তথ্য ইতিহাস ঘাঁটলেই পাওয়া যায়। এরও আগের ইতিহাস যদি দেখেন, সেখানেও পাওয়া যাবে পানের বিস্তর উপস্থিতি। তবে মোগলদের মতো অতটা বাহারি যে ছিল না, সেটা বলাই বাহুল্য। মোগল আমলে আরেকটি ফলকে খুব গুরুত্ব দেওয়া হতো, সেটি আঙুর। গোলাপের সুগন্ধের সঙ্গে থোকা থোকা আঙুর, অন্তরঙ্গ মোগল অন্তঃপুরের একটি ঐতিহাসিক দলিল।

যাহোক, মনে মন মিলুক, হাতে হাত, হৃদয়ে হৃদয় মিলুক, জিবে স্বাদ।

নকশা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন