default-image

দেশের মোটরসাইকেল বিক্রেতাদের জন্য নতুন বছরটি বেশ ভালোভাবেই শুরু হয়েছিল। বছরের প্রথম প্রান্তিক, অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে মার্চ—তিন মাসে মোটরসাইকেল বিক্রি হয় ১ লাখ ৩৬ হাজারের মতো, যা আগের চেয়ে প্রায় ১১ শতাংশ বেশি।

বিক্রেতারা আশা করেছিলেন, পয়লা বৈশাখ ও পবিত্র ঈদুল ফিতরকে ঘিরে বেশ ভালো ব্যবসা হবে। কিন্তু আশার গুড়ে বালু ছিটিয়ে দিয়েছে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ। গত এপ্রিলের শুরুতেই করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে দেশজুড়ে ‘লকডাউন’ দেওয়া হয়। বন্ধ হয় দোকানপাট। এখন যদিও দোকান খোলা, তবে ক্রেতা কম।

বাংলাদেশ হোন্ডা প্রাইভেট লিমিটেডের (বিএইচএল) অর্থায়ন ও বাণিজ্যিক বিভাগের প্রধান শাহ মোহাম্মদ আশিকুর রহমান বলছিলেন, বছরের প্রথম তিন মাসে বাজারে যখন বেশ চাহিদা ছিল, তখন বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্নের কারণে দেশে মোটরসাইকেলের ঘাটতি ছিল। শ্রীলঙ্কা ও মালয়েশিয়ার বন্দরে জাহাজজটের কারণে আমদানির সময় বা লিড টাইম ৪০ দিন থেকে বেড়ে ৬৫ দিনে উঠে যায়। তিনি আরও বলেন, ঈদুল ফিতরের আগে বাজারে চাহিদা বাড়বে বলে আশা করা যায়।

দেশে যে কয়েকটি খাতকে উদীয়মান শিল্প হিসেবে গণ্য করা হয়, তার মধ্যে মোটরসাইকেল একটি। এ খাতে সরকারি নীতিমালা ও বেসরকারি বিনিয়োগের ফলে অন্তত সাতটি কারখানা হয়েছে। আরও কয়েকটি কারখানার উদ্যোগ চলছে। পাশাপাশি এখন যেসব কারখানা রয়েছে, সেগুলোর সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও নিয়েছেন উদ্যোক্তারা। তাঁদের দাবি, মোটরসাইকেল উৎপাদনে এখন পর্যন্ত প্রায় আট হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
default-image

সরকার উৎপাদনের শর্তযুক্ত করে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মোটরসাইকেল আমদানিতে শুল্ক ছাড় দেয়। এর উদ্দেশ্য ছিল বাজার বড় করা, যাতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কারখানা করতে উৎসাহিত হয়। বেসরকারি বাজার জরিপ বলছে, ২০১৬ সালে দেশে প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার মোটরসাইকেল বিক্রি হয়, যা আগের বছরের চেয়ে ৩৭ শতাংশ বেশি। এরপর প্রতিবছরই মোটরসাইকেল বিক্রি বাড়ছিল।

এরপর একে একে কারখানা হতে থাকে। বাজারের সবচেয়ে বড় হিস্যাধারী ভারতের বাজাজ ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেলের কারখানা করে উত্তরা মোটরস। ২০১৮ সালের মাঝামাঝিতে সাভারের জিরানিতে তাদের নতুন কারখানায় মোটরসাইকেল উৎপাদন শুরু করে। বাজাজের কারখানাটির নাম ট্রান্স এশিয়া ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। ভারতীয় আরেক ব্র্যান্ড টিভিএসের মোটরসাইকেল উৎপাদনের জন্য সনি-র‌্যাংগসের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান রিয়ান মোটরস ও ভারতের টিভিএস অ্যান্ড সন্সের যৌথ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠিত টিভিএস অটো বাংলাদেশ লিমিটেড তাদের কারখানা করে গাজীপুরের টঙ্গীতে। ভারতের হিরো ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল উৎপাদক হিরো মোটোকর্পের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে কারখানা করেছে নিটল-নিলয় গ্রুপ। এইচএমসিএল নিলয় বাংলাদেশ লিমিটেড নামের কোম্পানির অধীনে প্রতিষ্ঠিত কারখানাটি যশোরে।

মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় বেসরকারি আবদুল মোনেম ইকোনমিক জোনে ২৫ একর জমিতে বাংলাদেশ হোন্ডা প্রাইভেট লিমিটেডের (বিএইচএল) কারখানার অংশীদার জাপানের হোন্ডা ও বাংলাদেশ প্রকৌশল শিল্প সংস্থা (বিএসইসি)। বাংলাদেশেই জাপানের সুপরিচিত ইয়ামাহা ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেলের কারখানা করেছে এসিআই মোটরস। এতে কারিগরি সহায়তা দিয়েছে ইয়ামাহা। কারখানাটি গাজীপুরের শ্রীপুরে।

default-image

মোটরসাইকেলের আরেকটি জনপ্রিয় জাপানি ব্র্যান্ড সুজুকিও উৎপাদিত হয় বাংলাদেশেই। এ দেশে সুজুকির পরিবেশ র‌্যানকন মোটরবাইক লিমিটেড (আরএমবিএল)। সুজুকি ও র‌্যানকন মিলে গাজীপুরে কারখানা করেছে। ময়মনসিংহের ভালুকায় কারখানা রয়েছে একমাত্র দেশীয় ব্র্যান্ড রানারের। এর বাইরে দেশে বেনেলি ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল বিপণন করে আফতাব অটোমোবাইলস। জংশেন ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল বাজারে এনেছে রূপসা ট্রেডিং করপোরেশন এবং রাসেল ইন্ডাস্ট্রিজ লাইফান ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল বিক্রি করে।

বিনিয়োগের বিপরীতে যখন মুনাফা আসার সময়, তখনই করোনা আঘাত হানে। ২০১৬ সাল থেকে মোটরসাইকেলের বাজারে যেখানে দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি ছিল, ২০২০ সালে তা ১১ শতাংশ কমে যায়।

আসিয়ান পরিস্থিতি ও বাংলাদেশ

মোটরসাইকেলের বাজার নিয়ে তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মোটরসাইকেল ডেটার (এমসিডি) ওয়েবসাইটে দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০২০ সালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জোট আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোয় মোটরসাইকেল বিক্রি কমেছে ২৯ শতাংশ, যা ৭০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় পতন। এ সময়ে দেশগুলোতে ১ কোটি ৯ লাখের মতো মোটরসাইকেল বিক্রি হয়। এমসিডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে ইন্দোনেশিয়ায় ৪৪, ফিলিপাইনে ৩০, থাইল্যান্ডে ১০, ভিয়েতনামে ১৪, মালয়েশিয়ায় ৯, কম্বোডিয়ায় ২০ ও সিঙ্গাপুরে ৪২ শতাংশ হারে বিক্রি কমেছে। ভারতে ২০২০-২১ অর্থবছরে ১ কোটি ৭৬ লাখ মোটরসাইকেল বিক্রি হয়, যা আগের বছরের চেয়ে ৩ শতাংশ কম।

বিজ্ঞাপন
default-image

অবশ্য মোটরসাইকেল কোম্পানির শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশের বাজারে সম্ভাবনা এখনো অনেক। কারণ, মাথাপিছু মোটরসাইকেল ব্যবহার ও বার্ষিক বিক্রির পরিমাণ বাংলাদেশে এখনো কম। এ কারণে সুযোগ বেশি। একটি বহুজাতিক কোম্পানির হিসাব অনুযায়ী, ইন্দোনেশিয়ায় বছরে ৩৮ লাখ, ভিয়েতনামে ২৮ লাখ, পাকিস্তানে ২০ লাখ ও থাইল্যান্ডে ১৫ লাখ মোটরসাইকেল বিক্রি হয়।

উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ভারতের পরিস্থিতি

বাংলাদেশে মোটরসাইকেল সরবরাহ মূলত ভারতের ওপর নির্ভরশীল। এ দেশে কারখানা প্রতিষ্ঠানগুলো বেশির ভাগ যন্ত্রাংশ আমদানি করে এবং কিছু দেশে তৈরি করে মোটরসাইকেল উৎপাদন করে। ভারতে করোনা পরিস্থিতির কারণে যন্ত্রাংশ সরবরাহে কোনো ঘাটতি হলে দেশে মোটরসাইকেল সরবরাহে টান পড়তে পারে। তখন বাজারে চাহিদা থাকলেও ক্রেতাদের মোটরসাইকেল দেওয়া কঠিন হবে বলে মনে করছেন মোটরসাইকেল কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তারা (সিইও)।

ভারতের পত্রিকার খবর বলছে, দেশটির কয়েকটি রাজ্যে কারখানা সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি মোটরসাইকেল উৎপাদনকারী কোম্পানির চারটি কারখানা রয়েছে।

সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে জাপানের সুজুকি ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেলের কারখানা করা র‌্যানকন মোটরসের হেড অব করপোরেট অ্যাফেয়ার্স ফাহিম আদনান খান প্রথম আলোকে বলেন, সরবরাহ সমস্যায় সবাই কমবেশি ভুগছে। দেখা যাচ্ছে, দুই মাস কারও সরবরাহ ভালো, আবার এক মাস ঘাটতি। তিনি আরও বলেন, আমদানির খরচও অনেক বেড়ে গেছে। যে কনটেইনার ১ হাজার ৮০০ ডলার ভাড়া দিয়ে আনা যেত, এখন তা ৩ হাজার ডলারের বেশি লাগছে।

প্র বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন