default-image

লকডাউন শব্দটা আগে শুনলেও তেমন কোনো ধারণা ছিল না। লকডাউন হতে পারে কিংবা হবে, এমন কথা যখন শুনছিলাম, তখনো ভাবিনি সবকিছু স্থবির হয়ে যাবে। আমরা বিভিন্ন সময়ে কারফিউ, হরতাল বা অবরোধ দেখেছি। তবে হারতাল বা অবরোধের পরও আমরা দোকান খুলেছি। সে সময় ব্যবসা খারাপ গেলেও একধরনের বেচাকেনা ছিল।

লকডাউনের শুরুর দিকে মনে হয়েছিল, সবকিছু দ্রুতই আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে। যদিও তখন করোনা সংক্রমণের হার ও মৃত্যু বাড়ছিল। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই পয়লা বৈশাখ চলে এল। আমরা কিছু করতে পারলাম না। তারপর ঈদও এল। ব্যবসার তেমন কিছু হলো না। সীমিত পরিসরে দোকানপাট খোলা হলেও বড় বড় বিপণিবিতান বন্ধই ছিল। ঈদের মতো বড় উৎসবে বিক্রি না হওয়ায় আমরা বড়সড় ধাক্কা খেলাম। আসলে বিপদে পড়লাম।

কারণ, পয়লা বৈশাখ ও ঈদকে সামনে রেখে বড় আকারে বিনিয়োগ করি। বাইরে থেকে সেটি বোঝার উপায় নেই। এই সময়ে যেটি হয়, নিজের যা আছে, সবটাই বিনিয়োগ করি। ফ্যাশন হাউসের অধিকাংশ উদ্যোক্তাই সেটি করেন। কারণ, সবাই ভাবেন, ঈদে পুরো বিনিয়োগটা উঠে আসবে।

বিজ্ঞাপন

লকডাউনের শুরুতে প্রায় তিন মাস বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ ছিল। তারপর লকডাউন উঠে যাওয়ার পর মানুষ অভ্যস্ত হতে আরও দুই থেকে তিন মাস লাগল। এই ছয় মাস দোকানভাড়া, সার্ভিস চার্জ ও কর্মীদের বেতন আমাদের পরিশোধ করতে হয়েছে। সংকট থেকে উত্তরণের জন্য পোশাকের বাজারে মূল্যছাড়ের প্রতিযোগিতা শুরু হলো। আমারও দিতে বাধ্য হলাম। কারণ, পয়লা বৈশাখ ও ঈদে বিক্রি না হওয়ায় বিপুল পরিমাণ পোশাক আটকে আছে। সরবরাহকারীদেরও অর্থ পরিশোধ সম্ভব হয়নি। তবে বড় অঙ্কের মূল্যছাড় লাভজনক তো নয়ই, বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে লোকসানও হয়েছে।

বর্তমানে যে পরিমাণ বিক্রি হয়, সেটি দিয়ে প্রতিষ্ঠানের খরচ চালানো যাচ্ছে। তবে করোনাকালের যে লোকসান হয়েছে, সেটি পূরণ হতে অনেক সময় লেগে যাবে। গত আট মাস দোকানভাড়া ও কর্মীদের বেতন দেওয়ার জন্য ধার করতে হয়েছে। সেই ঋণ পরিশোধ করতে হবে। আবার করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ের শঙ্কা তো রয়েছে। আগামী দুই বছর মুনাফা করার সুযোগ না-ও হতে পারে। টিকে থাকাটাই মূল সংগ্রাম হবে।

করোনাকালে নিজেদের চাঙা রাখার জন্য সমিতির মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে আলোচনা করতে শুরু করলাম। আশা তৈরি করার চেষ্টা করলাম। অবশ্য তার আগেই সরকার এগিয়ে এল। প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করল। তবে যে প্রক্রিয়ায় সেটি দেওয়ার বন্দোবস্ত হলো, তাকে প্রণোদনা প্যাকেজ বলা যায় কি না, সেটি নিয়ে প্রশ্ন আছে। আমাদের মতো উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংক এগিয়ে এল না। কঠিন সময়ে প্রণোদনাটাও আমাদের জন্য অধরা থেকে গেল।

করোনাকালে আর্থিক সংকটের কারণে কর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়েছি। এখনো বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ করতে হয়নি। তবে শিগগিরই হয়তো সেটি করতে হবে। কারখানার উৎপাদন বন্ধ রেখেছি দীর্ঘদিন। গত মাসে সীমিত পরিসরে চালু হলেও আগামী দিনে আউটসোর্সিংয়ের দিকে যেতে হবে। কারণ, আগামী দিনে ব্যবসা টিকাতে হলে খরচ কমানো ছাড়া কোনো উপায় নেই। আবার পণ্যের বিজ্ঞাপনের নতুন চিন্তা করতে হচ্ছে। আগে পত্রিকা কিংবা বিলবোর্ডের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে সহজে ক্রেতাদের আকর্ষণ করা গেলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমটাই বর্তমানে বড় জায়গা হয়ে উঠেছে। তাই নতুন চিন্তা ও বিনিয়োগ করতে হচ্ছে।

অন্যদিকে অনলাইনে নতুন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। ঈদের সময় অনলাইনে ভালো বিক্রি হলেও বিপণিবিতান খোলার পর আবার কমে গেছে। তারপরও করোনার পর নতুন স্বাভাবিক সময়ে ব্যবসাকে টেকসই করতে হলে অনলাইনে জোর দিতেই হবে। সেখানেও তুমুল প্রতিযোগিতা। তাই পোশাকের নকশায় নতুনত্বে আগের চেয়ে বেশি জোর দিচ্ছি।

বিজ্ঞাপন

করোনার আগে কখনোই মাথায় আসেনি, লম্বা সময় বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ থাকলে ব্যবসায় টিকে থাকতে বিকল্প কী ব্যবস্থা রাখা জরুরি। সেটি নিয়ে আমরা চিন্তাভাবনা শুরু করেছি। এ ছাড়া পয়লা বৈশাখ ও ঈদে আমরা যে সবকিছু বিনিয়োগ করি, সেটি থেকেও সরে আসতে হবে। করোনার মধ্যে আরেকটি বিষয় বোঝা গেছে, আর্থিকভাবে শক্তিশালী না হলে টিকে থাকা সম্ভব নয়। রাষ্ট্র বা ব্যাংক এগিয়ে আসবে, এমনটা ভেবে বসে থাকা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আমাদের মতো ছোট-মাঝারি ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি বেশি প্রযোজ্য।

প্র বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন