default-image

কোভিড-১৯ সংক্রমণের পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাপী কর্মীদের জীবনে নানা ধরনের প্রভাব পড়েছে। এই সময়ে তাঁরা চাকরির নিরাপত্তা ও কাজের নতুন ধরন নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ভুগেছেন। বাসায় থেকে কাজ করতে গিয়ে কর্মীরা যেন একাকিত্ব ও নিঃসঙ্গতা অনুভব করেছেন। কোভিডের কারণে তাঁদের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রায় বিঘ্ন ঘটেছে, উৎপাদনশীলতা কমেছে, কাজের চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হয়েছে। বিশেষ করে কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বড় ধরনের আঘাত পড়েছে।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) এবং বাজার গবেষণা ও জনমত জরিপকারী প্রতিষ্ঠান ইপসস-এর এক জরিপে এমন সব তথ্য উঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, করোনাকালে চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে ৫৬ শতাংশ কর্মীই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় পড়েছেন। অর্ধেকের বেশি কর্মী বাসায় থেকে কাজ করার সময় একাকিত্ব কিংবা নিঃসঙ্গতায় ভুগেছেন।

এই জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়, কোভিড-১৯ সংক্রমণ আবার বেড়ে যাওয়ায় কর্মীরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চাপ অনুভব করেন। এতে একাকিত্ব ও নিঃসঙ্গতা বাড়ছে। গত ২০ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত হয় এই জরিপ। এতে অংশ নেওয়া কর্মীদের অর্ধেকের বেশি জানান, করোনাকালে তাঁরা বাড়িতে থেকে কাজ করেন। ৩২ শতাংশ কর্মী দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করেছেন, ৩২ শতাংশ কর্মী কম কাজ করেছেন, ৩০ শতাংশ কর্মী অনুপস্থিতিজনিত ছুটিতে থেকেছেন। এ ছাড়া ১৫ শতাংশ কর্মী চাকরি বা কাজ ছেড়ে চলে যান।

বিজ্ঞাপন
default-image

প্রতিবদেনে বলা হয়, প্রাপ্তবয়স্ক কর্মীদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি তাঁদের চাকরির নিরাপত্তার পাশাপাশি কাজের ধরন বদলে যাওয়ার কারণেও উদ্বেগে পড়েন। করোনাকালে পরিবর্তিত রুটিনে কাজ করতে হয়েছে ৫৫ শতাংশ কর্মীকে, যাঁরা প্রাতিষ্ঠানিক চাপের মুখেও পড়েন। জরিপে অংশ নেওয়া ৪০ শতাংশের বেশি উত্তরদাতা জানান, কোভিডের কারণে তাঁদের উৎপাদনশীলতা কমেছে এবং বাড়িতে থেকে কাজ করা কঠিন বলে মনে করেন।

ডব্লিউইএফ-ইপসস বলছে, সারা বিশ্বে সব অঞ্চলে কোভিড-১৯ সংক্রমণ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ায় মানুষের জীবনযাত্রায় বিঘ্ন ঘটেছে। এই মহামারির কারণে মানুষের শারীরিক স্বাস্থ্যের চেয়ে মানসিক স্বাস্থ্যে বেশি প্রভাব পড়েছে। দীর্ঘদিনের অভ্যাস ছেড়ে বাড়িতে থেকে কাজ করার সময় তাঁদের ওপর পারিবারিক চাপও বেড়েছে। সে জন্য তাঁদের কাজ ও চাপের ভারসাম্য রক্ষা করে চলতে হয়েছে।

কাদের কষ্ট বেশি, কাদের ক্ষতি বেশি

করোনাকালে অনেকেই বাড়িতে থেকে কাজ করার সুযোগ পান। তবে এ ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতাও দেখা গেছে। যেমন যাঁরা বাসায় থেকে দায়িত্ব পালন করেছেন, তাঁদের বেশি সময় কাজ করতে হয়েছে। আবার বৈশ্বিক ওয়ার্কফোর্স বা শ্রমশক্তির বিশাল অংশের সামনেই বাড়ি বা দূরবর্তী অবস্থানে থেকে কাজ করার সুযোগ কমই ছিল কিংবা ছিলই না। কারণ, এ ধরনের শ্রমজীবীদের সরাসরি মেশিন বা যন্ত্র চালিয়ে বা সশরীরে উপস্থিত থেকে তবেই কাজ করতে হয়।

উত্তরদাতাদের অনেকেই জানান, করোনা পরিস্থিতিতে তাঁদের উৎপাদনশীলতা কমেছে। অথচ তাঁদের খুব ভোরে কাজ শুরু করতে হয়েছে। আবার কাজও করতে হয়েছে গভীর রাত পর্যন্ত। বাসা-অফিসে যাতায়াত কিংবা আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা অপর্যাপ্ত হওয়ায় সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে অনেককে।

এক দেশের সঙ্গে আরেক দেশের কর্মীদের কাজের ধরন, সময়, সমস্যা, সুবিধা এসবে প্রচুর পার্থক্যও লক্ষ করা গেছে। তবে সার্বিকভাবে জরিপের উত্তরদাতারা জানান, তাঁরা বাসায় বা দূরবর্তী অবস্থানে (রিমোটলি) থেকে কাজ করতে গিয়ে একাকিত্বে ভোগেন। সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ উত্তরদাতা এমন মত দেন তুরস্কে। আর জাপানে এই হার ২৪ শতাংশ। ৪০ শতাংশের বেশি উত্তরদাতা জানান, বাসায় বা দূরবর্তী অবস্থানে থেকে কাজ করার সময় তাঁরা নিঃসঙ্গতায় ভুগেছেন।

জরিপে দেখা যায়, কিছু কর্মীর ওপর অন্যদের তুলনায় করোনাভাইরাস অনেক বেশি প্রভাব ফেলেছে, অর্থাৎ বেশি ক্ষতি করেছে। এতে তাঁরা নিজেদের ভালো থাকায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, এমন আশঙ্কায় ভোগেন। ৩৫ বছরের কম বয়সী, ব্যবসায়ের স্বত্বাধিকারী, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী, স্বল্প আয়ের শ্রমিক এবং নারীরা এ রকম মত দেন। সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে, এত কষ্ট কেন করোনায়?

বিজ্ঞাপন

মানসিক স্বাস্থ্যের পেছনে ব্যয়

এদিকে উদ্বেগের বিষয় হলো, কোভিড-১৯ বা করোনাভাইরাসের কারণে গয়রহ শ্রম ও কর্মজীবীদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও সমস্যা তৈরি করেছে—এমন তথ্য উঠে এসেছে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) ও অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সমীক্ষায়। এতে বিশেষ করে তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যে বেশি অবনতি ঘটার কথা বলা হয়েছে।

বেষকেরা বলছেন, করোনার জেরে ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মনস্তাত্ত্বিক দুর্দশা, হাসপাতালে ভর্তি এবং এমনকি আত্মহত্যার কারণে উৎপাদনশীলতায় যে পরিমাণ ক্ষতি হবে, তার আনুমানিক আর্থিক মূল্য দাঁড়াবে ১১ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার। এই অর্থ বাংলাদেশের প্রায় ৯ লাখ ৬৯ হাজার কোটি টাকার সমান। গবেষকেরা হলেন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের হেড অব সিস্টেমস মডেলিং অ্যান্ড সিমুলেশন জো-অ্যান অ্যাটকিনসন এবং ডব্লিউইএফের শেপিং দ্য ফিউচার অব হেলথ অ্যান্ড হেলথকেয়ারের প্রকল্প বিশেষজ্ঞ ক্যামেরন ফক্স।

ডব্লিউইএফ-সিডনি বিশ্বিবিদ্যালয়ের ওই সমীক্ষায় করোনাজনিত মানসিক সমস্যা লাঘবে পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি প্রচুর অর্থ বিনিয়োগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তারা অবশ্য এ-ও বলেছে, লক্ষ্যভিত্তিক কার্যক্রমের মাধ্যমে ওই ব্যয় কমিয়ে আনার কিছু সুযোগও রয়েছে। যেমন করোনা সংকটজনিত মানসিক সমস্যা লাঘবে সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হচ্ছে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির কর্মসূচি।

প্র বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন