default-image

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির প্রথম দিন থেকে আমাদের কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। দোকানপাট বন্ধ থাকায় বিক্রিও শূন্যের কোটায় নামে। তখন ভেতরে-ভেতরে ধৈর্য ও সাহস ধরে রাখার চেষ্টা করলেও অজানা শঙ্কা নিজেকে গ্রাস করে ফেলেছিল। প্রায়ই মনে হতে থাকে, এত দিনের কষ্টের ব্যবসা বোধ হয় আর টিকিয়ে রাখা যাবে না।

তিন ভাগের এক ভাগ সক্ষমতায় কারখানা চললেও খরচ ওঠে না। সে কারণে টানা তিন মাস পুঁজি ভেঙে কর্মীদের বেতন দিলাম। ইতিমধ্যে সরকার প্রণোদনা তহবিলও ঘোষণা করেছে। প্রণোদনা তহবিল থেকে ঋণ পাব কি না, সেটি নিয়ে আশার সঙ্গে শঙ্কাও ছিল।
কাজী সাজেদুর রহমান, চেয়ারম্যান, কেপিসি ইন্ডাস্ট্রিজ

করোনার শুরুর দিকে কী করব, বুঝতে পারছিলাম না। তখন আবার বাজারে সুরক্ষাসামগ্রীর ব্যাপক চাহিদা ছিল। বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে মিলে মাস্ক ও পিপিইর মতো সুরক্ষাসামগ্রীর ব্যবসায় নেমে পড়লাম। কিছু মুনাফাও করলাম। এরই মধ্যে দেখলাম, গ্রামগঞ্জে পেপার কাপের চাহিদা বাড়ছে। মানুষজন সিরামিক ও প্লাস্টিকের কাপের বদলে একবার ব্যবহারযোগ্য কাগজের কাপের দিকে ঝুঁকছে। সে কারণে ১৫ দিন বন্ধ রাখার পর আমরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে কারখানা সীমিত পরিসরে চালু করলাম। তখন সক্ষমতার ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কাগজের কাপ, থালাবাটি ইত্যাদি উৎপাদন করতাম।

বিজ্ঞাপন

তিন ভাগের এক ভাগ সক্ষমতায় কারখানা চললেও খরচ ওঠে না। সে কারণে টানা তিন মাস পুঁজি ভেঙে কর্মীদের বেতন দিলাম। ইতিমধ্যে সরকার প্রণোদনা তহবিলও ঘোষণা করেছে। প্রণোদনা তহবিল থেকে ঋণ পাব কি না, সেটি নিয়ে আশার সঙ্গে শঙ্কাও ছিল। কারণ, আমাদের দেশে অনেক কিছুই ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে যায়। যাহোক, শেষ পর্যন্ত আমরা প্রণোদনা পেয়েছি। তাতে ঘুরে দাঁড়ানোটা সহজ হয়েছে।

করোনা কাগজের কাপশিল্পের জন্য অনেকটা আশীর্বাদ হয়ে এসেছিল। বিষয়টি আমরা দুই-আড়াই মাস পর বুঝতে পারি। যখন অর্থনীতি স্বাভাবিক গতিতে ফিরিয়ে আনতে সরকার উদ্যোগ নিল, তখন দেখা গেল করোনার সংক্রমণ থেকে দূরে থাকতে চা, কফি ও পানি পানে কাগজের কাপের চাহিদা তিন-চার গুণ বেড়ে গেল। সে কারণে সেপ্টেম্বর আমরা পুরোদমে কারখানা চালু করলাম। কর্মিসংখ্যাও ১৫-১৬ জন বাড়ালাম। এক মাস ভালো ব্যবসা করলাম।

অবশ্য বেনাপোল বন্দর পুরোপুরি সচল হওয়ার পর ব্যবসা আবার কমে গেল। কারণ, প্রতি কেজিতে মাত্র দেড় ডলার শুল্ক দিয়ে কোটি কোটি কাগজের কাপ দেশে আমদানি হতে শুরু হয়। অন্যদিকে ৬১ শতাংশ শুল্ক ও কর দিয়ে কাঁচামাল আমদানি করে কাগজের কাপ উৎপাদন করে বিদেশি পণ্যের সঙ্গে টিকতে পারছে না আমার মতো দেশীয় উদ্যোক্তারা। বিষয়টি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) দীর্ঘদিন দেনদরবার করেও আমরা কোনো সুরাহা করতে পারছি না।

করোনাকালে আমরা অনলাইন ব্যবসায় জোর দিই। তাতে মোটামুটি ভালো সাড়া পেয়েছি। ব্যবসায় টিকে থাকতে নতুন বছরে আমরা আগের চেয়ে বেশি পরিশ্রম করার নীতি নিয়েছি। একই সঙ্গে কর্মী বাহিনী ছাঁটাই না করে বিভিন্ন খাতের অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

ব্যাপক আমদানির কারণে করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ের মধ্যেও আমাদের কাগজের কাপের ব্যবসা ভালো নয়। এর মধ্যে কাঁচামাল সময়মতো পাওয়া যাচ্ছে না। ভ্যাট অফিসও অযৌক্তিকভাবে নানা রকম চাপ দিচ্ছে। করোনা পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে সরকার প্রণোদনা তহবিল দিয়ে আমাদের অনেক সহযোগিতা দিয়েছে। শোনা যাচ্ছে, সরকার নতুন একটা প্রণোদনা প্যাকেজ আসছে। তবে আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি কিছু নীতিগত সহায়তা না পেলে পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন।

করোনাকালে আমরা অনলাইন ব্যবসায় জোর দিই। তাতে মোটামুটি ভালো সাড়া পেয়েছি। ব্যবসায় টিকে থাকতে নতুন বছরে আমরা আগের চেয়ে বেশি পরিশ্রম করার নীতি নিয়েছি। একই সঙ্গে কর্মী বাহিনী ছাঁটাই না করে বিভিন্ন খাতের অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। খরচ কমিয়ে মুনাফা না বাড়াতে পারলে প্রণোদনা ঋণ শোধ করে ব্যবসা সম্প্রসারণ করা কষ্টকর হয়ে যাবে।

বিজ্ঞাপন
প্র বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন