default-image

একটি গাড়ির স্বপ্ন কে না দেখে। কিন্তু করোনার কারণে জীবন ও জীবিকা যখন হুমকির মুখে, তখন গাড়ির কেনার পরিকল্পনা অনেকেই পিছিয়ে দিয়েছেন। ফলে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবসায় টান পড়েছে। ২০২০ সালে গাড়ি বিক্রি কমেছে প্রায় ২৬ শতাংশ। তবে করোনার ধাক্কা সামলে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করায় গত জানুয়ারি মাস থেকে আবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছে গাড়ির ব্যবসা।

গত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) প্রায় তিন হাজার নতুন ব্যক্তিগত গাড়ি নিবন্ধিত হয়েছে; যা গত দুই বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি। মূলত সরকারি কর্মকর্তা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গাড়ি বিক্রি বেড়েছে বলেই গাড়ির ব্যবসা ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপ করে এসব তথ্য জানা গেছে।

নতুন ও রিকন্ডিশন্ড গাড়ি—এই দুই ধরনের গাড়ি বিক্রি হয়। তবে মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্তের কাছে রিকন্ডিশন্ড গাড়িই বেশি পছন্দ। বর্তমানে গাড়ির বাজারে ৭৫ শতাংশের মতো দখল করে এই রিকন্ডিশন্ড গাড়ি। রিকন্ডিশন্ড গাড়ি অনেকটা পুরোনো গাড়ির মতো। এসব গাড়ি জাপানে ১ থেকে ৫ বছর চলেছে। এরপর বাংলাদেশে এসেছে। দামে কম হওয়ায় বাজার দখল করে আছে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি। তবে ইদানীং নতুন গাড়ির প্রতি আগ্রহ বেড়েছে ক্রেতাদের।

গত মার্চ মাসে করোনার প্রকোপ শুরু হয়। এপ্রিল ও মে—এই দুই মাস গাড়ির শোরুমগুলো বন্ধ ছিল। জুন মাস থেকে ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করে শোরুমগুলো। জুলাই-আগস্ট মাসের দিকে গাড়ি বিক্রি শুরু হয়। তবে করোনার আগের মতো বিক্রি হয়নি। গত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে গাড়ি বেচাকেনা বেশ ভালো।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানিকারক ও পরিবেশক সমিতির (বারভিডা) সাবেক সভাপতি হাবিব উল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ধীরে ধীরে গাড়ি বিক্রি আগের অবস্থায় ফিরে আসছে। জুন-জুলাইয়ে যখন শোরুম খোলা হয়েছিল, তখন আয়–রোজগার, ব্যবসা-বাণিজ্য কেমন যাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। তখন খুব একটা গাড়ি বিক্রি হয়নি। তাহলে কীভাবে বিক্রি বাড়ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, উপসচিব ও তধোর্ধ্ব পদের সরকারি কর্মকর্তারা গাড়ি কেনার জন্য ৩০ লাখ টাকা ঋণ পান। তাঁদের অনেকেই এখন গাড়ি কিনছেন। এ ছাড়া বহু প্রতিষ্ঠান এক বছর গাড়ি কেনা বন্ধ রেখেছিল, সেসব প্রতিষ্ঠানও গাড়ি কেনা শুরু করেছে। এসব কারণে বাজার ঘুরে দাঁড়াচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

যেসব গাড়ির চাহিদা বেশি

এ দেশের মধ্যবিত্তের গাড়ির স্বপ্নই পূরণ হয় রিকন্ডিশন্ড কিংবা পুরোনো গাড়ি দিয়ে। জাপানের টয়োটা কোম্পানির রিকন্ডিশন্ড গাড়ির চাহিদা বেশি। সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়, এমন গাড়ির তালিকায় আছে টয়োটা করোলা, ফিল্ডার, প্রিমিও, এক্সিও, এলিয়ন মডেলের গাড়ি। এই গাড়িগুলোই ক্রেতাদের কাছে বেশি জনপ্রিয়। এসব গাড়ি ১২-১৪ লাখ টাকা থেকে শুরু করে ৩০ লাখ টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। এ ছাড়া টয়োটার রিকন্ডিশন্ড গাড়ির যন্ত্রাংশের বিশাল বাজারও তৈরি হয়েছে। ফলে গাড়ির মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণও খরচও তুলনামূলক সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য।

এবার আসি, নতুন গাড়ির বাজারে। করোনার কারণে পুরোনোর পাশাপাশি নতুন গাড়ির বিক্রিও কমেছে। সুজুকি ব্র্যান্ডের নতুন গাড়ি বিক্রি করে উত্তরা মোটরস লিমিটেড। জানা গেছে, করোনার কারণে সুজুকি ব্র্যান্ডের বিক্রি কমে গেছে। প্রতি মাসে যেখানে অন্তত ৪০টি গাড়ি বিক্রি হতো, এখন এই সংখ্যা ৩০-৩৫–এ নেমেছে। গত জুলাই-আগস্ট মাসে এই সংখ্যা আরও কম ছিল। তবে ধীরে ধীরে বিক্রি বাড়ছে। সুজুকির আরটিগা মডেলের গাড়িটি এখন বেশি বিক্রি হচ্ছে। এই গাড়িটির ২০ থেকে ২২ লাখ টাকার মধ্যেই পাওয়া যাচ্ছে।

উত্তরা মোটরসের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, মধ্যবিত্তদের কাছে নগদ টাকা নেই। আবার তাঁরা এই মুহূর্তে ব্যাংকঋণ নেওয়ার ঝুঁকি নিচ্ছেন না। এখন ব্যক্তির চেয়ে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বেশি গাড়ি কিনছে।

নতুন ও পুরোনো গাড়ির বৈষম্যমূলক কর কাঠামোর কারণে বাজারে এই দুই ধরনের গাড়ির দামে পার্থক্য কমে এসেছে। ফলে ক্রেতারা নতুন গাড়ি কিনতেই বেশি আগ্রহী। নতুন গাড়ি আমদানিকারকেরা উৎপাদক কোম্পানির কাছ থেকে যে দামে গাড়ি কেনেন, সেই দামেই শুল্কায়ন হয়।

মিতসুবিশি, নিশান, হোন্ডা, হুন্দাই, টাটাসহ বিভিন্ন কোম্পানির নতুন গাড়ি বিক্রি হয়। নিশানের এক্স-ট্রেইল মডেলভেদে গাড়ি ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকার মধ্যে বিক্রি বেশি। হোন্ডার ভেজেল মডেলের গাড়িও বেশ চলছে। হোন্ডা ভেজেল গাড়ির দাম ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা। ২০১৪ ও ২০১৫ সালের দিকে যেসব গাড়ি তৈরি হয়েছে, সেগুলোর দাম তুলনামূলক কম। এদিকে মিতসুবিশি পাজেরো ও ল্যান্সার মডেলের গাড়ি তুলনামূলক বেশি বিক্রি হয়।

default-image

নতুন গাড়ির বাজার বাড়ছে

পাঁচ বছর আগে গাড়ির বাজারে পুরোনো রিকন্ডিশন্ড গাড়ির দখলে ছিল ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ। বাকিটা নতুন গাড়ির বাজার। গত পাঁচ বছরে তা বেড়ে ২৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। নতুন গাড়ি বিক্রিও বেড়েছে প্রায় তিন গুণ। করোনার আগপর্যন্ত বছরে আড়াই থেকে তিন হাজার নতুন গাড়ি বিক্রি হয়েছে।

নতুন ও পুরোনো গাড়ির বৈষম্যমূলক কর কাঠামোর কারণে বাজারে এই দুই ধরনের গাড়ির দামে পার্থক্য কমে এসেছে। ফলে ক্রেতারা নতুন গাড়ি কিনতেই বেশি আগ্রহী। নতুন গাড়ি আমদানিকারকেরা উৎপাদক কোম্পানির কাছ থেকে যে দামে গাড়ি কেনেন, সেই দামেই শুল্কায়ন হয়।

রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানিকারকদের দাবি, উৎপাদক প্রতিষ্ঠান আমদানিকারককে গাড়িমূল্যের যে সনদ দেয়, তা–ই গ্রহণ করেন শুল্ক কর্মকর্তারা। অনেক আমদানিকারক উৎপাদকের কাছ থেকে প্রকৃত মূল্য লুকিয়ে কম মূল্যের সনদ দাখিল করেন বলে অভিযোগ আছে। ফলে শুল্ক-করও কমে যায়। অন্যদিকে জাপান সরকারের ইয়েলো বুকের মূল্য অনুযায়ী রিকন্ডিশন্ড গাড়ির অবচয়ন সুবিধা ও শুল্ক-কর আরোপ করা হয়।

বিজ্ঞাপন

গাড়ির বাজারে করোনার প্রভাব

গাড়ি তো কিনেই সঙ্গে সঙ্গে রাস্তায় নামিয়ে চালাতে শুরু করবেন, তা হবে না। শোরুম থেকে গাড়ি কেনার পর তা চালানোর জন্য সরকারের অনুমতি নিতে হবে। ঠিকমতো শুল্ক-কর দিয়েছেন কি না, আপনার বিস্তারিত পরিচয়; গাড়ি কেনার রসিদ বা চুক্তিপত্র—এসব দেখিয়ে অনুমতির জন্য আবেদন করতে হয়। সরেজমিনে গাড়ি পরিদর্শনও হয়। সার্বিকভাবে গাড়ি রাস্তায় নামার এই অনুমোদনের কাজটি করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)।

করোনার জন্য গত এক বছরে নতুন ও পুরোনো ব্যক্তিগত গাড়ির নিবন্ধন প্রায় চার ভাগের এক ভাগ কমেছে। বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালে ১২ হাজার ৪০৩টি ব্যক্তিগত গাড়ি নিবন্ধন হয়েছে। আগের বছর এমন নিবন্ধনের সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ৭৭৯। এক বছরের ব্যবধানে ৪ হাজার ৩৭৬টি বা ২৬ শতাংশ গাড়ির নিবন্ধন কমেছে। তবে ২০২১ সালের শুরু থেকে পরিস্থিতি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ব্যক্তিগত গাড়ি নিবন্ধন বাড়ছে। গত দুই মাসে ২ হাজার ৮৯০টি ব্যক্তিগত গাড়ি নিবন্ধন হয়েছে।

বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, গত মার্চ মাসে করোনার প্রকোপ শুরু হওয়ার পর প্রায় তিন মাস বিআরটিএর প্রায় সব কার্যক্রম বন্ধ ছিল। এই সময়ে কেউ ব্যক্তিগত গাড়ির নিবন্ধনও নেননি।

করোনায় গাড়ি আমদানি কমেছে

করোনার কারণে নতুন ও পুরোনো—দুই ধরনের গাড়ি আমদানি কমেছে। এমনিতেই কয়েক বছর ধরে পুরোনো গাড়ির আমদানি কমেছে। করোনার কারণে পুরোনো গাড়ির আমদানি আরও কমেছে।

রিকন্ডিশন্ড গাড়ি ব্যবসায়ীদের সংগঠন বারভিডার হিসাবে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সব মিলিয়ে দেশে ২৩ হাজার রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি হয়। পরের অর্থবছরে (২০১৮-১৯) রিকন্ডিশন্ড গাড়ির আমদানি প্রায় অর্ধেক হয়ে যায়। ওই অর্থবছরে সাড়ে ১২ হাজারে নেমে আসে। সর্বশেষ গত অর্থবছরে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানির সংখ্যা ১০ হাজারের নিচে নেমে আসে। গত জুলাই মাস থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত চার হাজারের কম গাড়ি আমদানি হয়েছে।

রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানিতে বছরভিত্তিক অবচয়ন সুবিধায় আছে। এক থেকে পাঁচ বছরের পুরোনো গাড়িতে ১০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত অবচয়ন সুবিধা মেলে। অবচয়ন সুবিধার কারণে রিকন্ডিশন্ড গাড়ির দাম কম।

অন্যদিকে রিকন্ডিশন্ড গাড়ির আমদানি কমে যাওয়ায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক-কর প্রাপ্তিও অর্ধেকে নেমেছে। এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি খাতে ২ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা পেয়েছে। পরের বছর তা ১ হাজার ৪৫০ কোটি টাকায় নামে। গত অর্থবছরে তা ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার মতো আদায় হয়েছে বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে গত কয়েক বছরে নতুন গাড়ির আমদানি তিন গুণ বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, পাঁচ বছর আগে বছরে সাত শ থেকে এক হাজার নতুন গাড়ি আমদানি হতো। করোনার আগপর্যন্ত বছরে ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার গাড়ি আমদানি হয়েছে। ২০২০ সালে আড়াই হাজারের মতো নতুন গাড়ি আমদানি হয়েছে।

প্র বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন