default-image

মেয়েটির নাম খাইদেম সিঁথি সিনহা। মণিপুরি জাতিগোষ্ঠীর মেয়েটির বাড়ি সিলেটের আম্বরখানায়। স্কুল-কলেজ পাস করে ঢাকায় চলে আসেন উচ্চতর শিক্ষা নিতে। ভর্তি হন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে। স্নাতক পর্যায়ের লেখাপড়াও শেষ হয়েছিল, বাকি ছিল শুধু স্নাতক সমাপনী পরীক্ষা। এর মধ্যে করোনার হানা। এর প্রকোপে পড়াশোনা বাদ দিয়ে বাড়ি ফিরে যান সিঁথি। সিঁথিসহ এ রকম অনেকে ফিরে আসায় বদলে যায় তাঁর জাতিগোষ্ঠীর মানুষদের অনেকের জীবন।

মণিপুরি ঘর মানেই একটি করে তাঁত। নিজেদের পরিধেয় বস্ত্র নিজেরাই বানান তাঁরা। অতিরিক্তগুলো বিক্রি করেন বাজারে। কিন্তু বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে সংযোগ করতে না পারা, মণিপুরি ডিজাইন ব্যবহার করে অন্যান্য জেলায় কম দামের নকল মণিপুরি কাপড় তৈরি ইত্যাদি নানা কারণে কমে গিয়েছিল মণিপুরিদের কাপড় বোনা। করোনায় সিঁথিদের মতো ছেলেমেয়েদের ঘরে ফেরায় সরাসরি অনলাইনে চলে আসেন মণিপুরি তাঁতিরা।

বিজ্ঞাপন

সিঁথি বলেন, ‘বিষয়টা একদম আকস্মিক। বাড়ি ফিরে সারা দিনই কাটত অনলাইনে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সেখানে দেখতাম মানুষ মণিপুরি শাড়ি বিক্রি করে। যেহেতু আমরা তাঁত বোনার কাজটা ছোটবেলা থেকেই করে এসেছি, আসল-নকল বুঝতে পারি সহজেই। আমি ভাবি, মণিপুরি তাঁত এবং এতে তৈরি কাপড় সম্পর্কে অনলাইন গ্রুপগুলোতে লিখলে কেমন হয়?’

সিঁথির লেখার প্রভাব হয় তাৎক্ষণিক। লেখা আর ছবি দেখে সবাই সিঁথিকে জিজ্ঞেস করা শুরু করেন তাঁর নিজের কোনো পেজ আছে কি না। আশপাশের তাঁতিদের থেকে কাপড় নিয়ে সিঁথি শুরু করেন তাঁর নিজের ফেসবুক পেজ ইঙেলৈ। মণিপুরি ভাষায় ইঙে অর্থ ঝোলানো আর লৈ অর্থ ফুল। ইঙেলৈ এমন একটা ফুলের নাম, যেটা শুধু জুলাই মাসে ফোটে, বলেন সিঁথি। জুলাই মাসে পেজটা খোলা হয়। তাই তার নাম হয় ইঙেলৈ। শুরু করার পরই দারুণ সাড়া পেতে থাকেন সিঁথি।

‘মণিপুরি পোশাক মানেই সবাই টেম্পল পাড়ের শাড়ি ভাবে, কিন্তু আমাদের মণিপুরের সংস্কৃতি এবং পোশাকের বৈচিত্র্য অনেক বেশি। এমনকি আমরা যে গামছা ব্যবহার করি, তা-ও কয়েক ধরনের হয়। ইঙেলৈ পাতায় আমি সেই বিষয়গুলোর সঙ্গে মানুষকে পরিচয় ঘটানোর চেষ্টা করি।’

মণিপুরিদের আরও কাছে থেকে জানার সুযোগ পাওয়ায় ক্রেতারা আটকে থাকেন ইঙেলৈতে। মণিপুরিদের বৈচিত্র্যময় পোশাক, নতুন ডিজাইন ইত্যাদি খুব আকর্ষণ করে তাঁদের। এসবের ওপর কম দামে মণিপুরিদের মান তো ছিলই, ফিরে ফিরে আসেন ক্রেতারা। জানান সিঁথি।

সিঁথির ইঙেলৈর প্রসারে কাজ বাড়তে থাকে তাঁর আশপাশে থাকা তাঁতিদের। এমনকি তাঁর এলাকার দরজি বা কাপড় মাড় দিয়ে দেন, এমন মানুষদেরও। বাড়তে থাকে মণিপুরিদের কাজের প্রকরণের সঙ্গে পরিচয়।

বিজ্ঞাপন

শুধু সিঁথি নন, করোনায় অন্য অনেক মণিপুরি শিক্ষিত ছেলেমেয়ে শুরু করেছেন অনলাইনে মণিপুরি তাঁতের কাপড় বিক্রি। কেউ কেউ অন্য ব্যবসায়ীদের সরবরাহের কাজ করছেন। তাঁদের একজন সাগর হামোম। সাগর বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষি অর্থনীতিতে লেখাপড়া করছিলেন, করোনায় ফিরে আসেন বাড়িতে, শ্রীমঙ্গলের কমলগঞ্জে।

কমলগঞ্জ প্রসিদ্ধ মণিপুরি তাঁত বোনার জন্য। এখান থেকে সারা দেশে কাপড় যায়। মহাজনেরা কাপড় তাঁতিদের থেকে কাপড় নিয়ে তা হাটে তোলেন। সেখান থেকে কয়েক হাত হয়ে কাপড় যায় ঢাকার বাজারে। স্বভাবতই দাম বেড়ে যায় কয়েক গুণ।

‘আমাদের জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরা তথ্যপ্রযুক্তিতে ততটা অগ্রসর নন। আমরা তরুণেরা যখন মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক ইত্যাদি ব্যবহার করে পণ্য অনলাইনে দিই, এর দামও কম হয়। আবার মণিপুরি তাঁতের মানও পাওয়া যায়। তাই আমাদের কদরটাই হয় আলাদা,’ বলেন সাগর। গত প্রায় আট মাসে সাগর অন্তত চারটি পেজকে সরবরাহ করছেন মণিপুরি শাড়ি। আরও অনেকেই যোগাযোগ করছেন তাঁর সঙ্গে।

সাগরের মতোই বিশ্ববিদ্যালয় ফেরত নন্দিনী। নিজের ঘরেই আছে তাঁত, করোনার আগে থেকেই চেষ্টা করছিলেন বন্ধুদের নিয়ে একটা ব্যবসা দাঁড় করাতে। করোনায় দাঁড়িয়ে যায় সে ব্যবসা। এখন তাঁর মালিকানায় তিনটা পেজ। একটি নিজের দুটি বন্ধুদের সঙ্গে যৌথ মালিকানায়।

নন্দিনীদের গ্রাম ছনগাঁওয়ে ঘরে ঘরে তাঁত। আগে প্রতিজন তাঁতি মাসে বড়জোর পাঁচ থেকে ছয়টি শাড়ি বুনতেন, এখন সপ্তাহে পাঁচ-ছয়টি করে শাড়ি বুনছেন। তাও তাঁত খালি পাওয়া দায়। শুধু ছনগাঁওয়ে সাগর-নন্দিনীদের মতো অন্তত ২০ জন ছেলেমেয়ে কাজ করছেন। তাঁদের কারণে ঢাকার ক্রেতারাও এখন খুব সাবধানী সঠিক মণিপুরি কাপড়ের বিষয়ে।

মণিপুরিদের ঐতিহ্য রক্ষায় অনেক দিন ধরে কাজ করছেন চাউবা মেমোরিয়াল মণিপুরি ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি মিউজিয়ামের পরিচালক হামোম তনু। তরুণদের এ উদ্যমের প্রশংসা করেন তিনি। বলেন, ‘আমাদের ঐতিহ্য অনেক দিনের, এসব ব্যবহার করে অন্যরা লাভবান হচ্ছিল। তরুণেরা আবার এগিয়ে আসায় শুধু আমরা শুধু আর্থিকভাবেই লাভবান হইনি, আমাদের ঐতিহ্যও হারিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা পাচ্ছে।’

প্র বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন