খোঁড়া আইডিআরএ দিয়ে চালানো হচ্ছে বিমা খাত

নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি সময় পেল ১০ বছর। কিন্তু এত বছরেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে এটিকে গড়ে উঠতে দিল না সরকার নিজেই।

বিমা অধিদপ্তর দিয়ে কাজ চলছিল না। ফলে এটিকে বিলুপ্ত করে ২০১১ সালে গঠন করা হলো বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (আইডিআরএ)। কিন্তু এই আইডিআরএ দিয়ে এখন না হচ্ছে উন্নয়ন, না হচ্ছে নিয়ন্ত্রণ। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শেষ দিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে বিমা খাতকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আওতায় নিয়ে আসা হয়। তাতেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। নামে নিয়ন্ত্রক এই আইডিআরএ ১০ বছর ধরেই চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।

এমন ভগ্নস্বাস্থ্য আইডিআরএ দিয়েই চালানো হচ্ছে বিমা খাত। খাতটির স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য যথা জায়গায় যথা লোক নিয়োগের দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তর হচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। আজ ১ মার্চ সোমবার দেশব্যাপী যখন পালন করা হচ্ছে জাতীয় বিমা দিবস, আর্থিক প্রতিষ্ঠান তখন এসেছে এ দিবস আয়োজন করছে তারা। মূল অনুষ্ঠান ঢাকার আগারগাঁওয়ে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধান অতিথি হিসেবে ভার্চ্যুয়ালি এই অনুষ্ঠান উদ্বোধন করবেন। এবারের প্রতিপাদ্য—‘মুজিব বর্ষের অঙ্গীকার, বিমা হোক সবার’।

বিমাশিল্পের উন্নয়ন ও বিমা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এ দিবস উদ্‌যাপন করা হচ্ছে—এ কথা জানিয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলাম সব জায়গায় দাওয়াত কার্ড দিয়েছেন। তাতে দেখা যায়, তিনি নিজে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেবেন। আর সভাপতিত্ব করবেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এ ছাড়া বিমা কোম্পানির মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) সভাপতি শেখ কবির হোসেনও থাকছেন অতিথি হিসেবে।

বিজ্ঞাপন
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ আইন, ২০১০ অনুযায়ী ২০১১ সালের জানুয়ারি থেকে একজন চেয়ারম্যান ও চারজন সদস্য নিয়ে যাত্রা শুরু করে আইডিআরএ। এই পাঁচজনকে নিয়োগ দেওয়ার দায়িত্ব আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের। শুধু এটুকু কাজ করেই এত বছর দায়িত্ব সেরেছে বিভাগটি।

বিস্ময়কর যে বিমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ চেয়ারম্যান এম মোশারফ হোসেনের কোনো জায়গা নেই এখানে। বিষয়টি অনেকটা এমন যে ব্যাংক খাতের অনুষ্ঠানে গভর্নর ফজলে কবিরকে এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কোনো অনুষ্ঠানে চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামকে কোনো আকারেই রাখা হলো না। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে বিমা খাতকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, এই একটি অবহেলাই হতে পারে তার শ্রেষ্ঠতম উদাহরণ।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলাম গত ২২ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোকে বলেন, ‘যেহেতু জাতীয় বিমা দিবস, ফলে সবকিছু মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানেই হবে। আইডিআরএ এখানে সহযোগিতাকারী।’ তবে সূত্রগুলো জানায়, বিমা দিবসের কর্মসূচি বাস্তবায়নে এক মাস ধরে একনাগাড়ে কাজ করে যাচ্ছে আইডিআরএর সবাই। করোনার মাঝখানে যখন চেয়ারম্যান ও দুই সদস্য ছাড়া সবার বেতন অর্ধেক করে দেওয়া হয়েছে, তখনো বিমা দিবস আয়োজনের মূল কাজের সঙ্গে আইডিআরএর কর্মচারীদেরই নিবেদিত থাকতে দেখা গেছে।

রহস্যজনক নিয়োগহীনতা

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ আইন, ২০১০ অনুযায়ী ২০১১ সালের জানুয়ারি থেকে একজন চেয়ারম্যান ও চারজন সদস্য নিয়ে যাত্রা শুরু করে আইডিআরএ। এই পাঁচজনকে নিয়োগ দেওয়ার দায়িত্ব আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের। শুধু এটুকু কাজ করেই এত বছর দায়িত্ব সেরেছে বিভাগটি।

অথচ রাষ্ট্রায়ত্ত সাধারণ বীমা করপোরেশন ও জীবনবীমা করপোরেশনসহ ৭৯টি বিমা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ। বিমা খাতের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বলছেন, এই প্রতিষ্ঠানগুলো কি তাহলে একজন চেয়ারম্যান ও চারজন সদস্যই দেখভাল করবেন? তা–ও আবার সব সময় চার সদস্য নিয়োগই দেওয়া হয়নি সংস্থাটিতে। ২০১১ সালে একবার মাত্র চারজন সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।

চার সদস্যের মধ্যে থাকার কথা একজন নন-লাইফ, একজন লাইফ, একজন আইন ও একজন প্রশাসনের দায়িত্বে। কিন্তু সংস্থাটিতে চার বছর ধরে নন-লাইফ সদস্য নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না। ছয় মাস ধরে সদস্য নেই লাইফেরও। বিমা খাতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত নন এমন দুজন সদস্য রয়েছেন বর্তমানে।

শুরু থেকে যখন চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগ দিয়ে বিমা খাত চালানোর কাজ সেরেছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, আইডিআরএর তৎকালীন চেয়ারম্যান এম শেফাক আহমেদ অস্থায়ী ভিত্তিতে লোক নিয়োগ দিয়ে কাজ চালিয়ে আসছিলেন, যাঁরা এখন পর্যন্ত সংস্থাটিতে আছেন। প্রায় ১০ বছরে এই অস্থায়ী লোকেরা বিমা খাতে অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছেন।

এই আইডিআরএকে খোঁড়া বললেও কম বলা হবে। চাকরির অনিশ্চয়তায় থাকা সব লোক এবং প্রেষণে অর্থাৎ ধার করা কিছু লোক দিয়ে চলছে আইডিআরএ। এ দিয়ে বিমা খাতের উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কোনোটাই সম্ভব নয়।
বিআইএ চেয়ারম্যান শেখ কবির হোসেন

অনুমোদিত জনবল-কাঠামো না থাকায় সংস্থাটিতে নিয়মিত কোনো লোক নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছিল না। আইডিআরএর জনবল-কাঠামো চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হয় ২০১৬ সালের জুলাইয়ে। এরপরও কেটে গেছে সাড়ে চার বছর। জনবল-কাঠামোতে চেয়ারম্যান ও সদস্যদের বাইরে মোট পদ ১৫৫টি। এর মধ্যে নির্বাহী পরিচালক ৪, পরিচালক ৭, উপপরিচালক ১৫, সহকারী পরিচালক ২৫ ও কর্মকর্তার পদ ২৮টি। এর বাইরে কম্পিউটার অপারেটর, ডেটা এন্ট্রি অপারেটর, গাড়িচালক, অফিস সহায়ক—এসব পদ রয়েছে ৭৭টি।

নির্বাহী পরিচালক, পরিচালক, উপপরিচালক ও সহকারী পরিচালকের দায়িত্বে মন্ত্রণালয় থেকে বিমা খাতের জন্য অপেশাদার লোকদের প্রেষণে নিয়োগ দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে।

বিআইএ চেয়ারম্যান শেখ কবির হোসেন গত ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই আইডিআরএকে খোঁড়া বললেও কম বলা হবে। চাকরির অনিশ্চয়তায় থাকা সব লোক এবং প্রেষণে অর্থাৎ ধার করা কিছু লোক দিয়ে চলছে আইডিআরএ। এ দিয়ে বিমা খাতের উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কোনোটাই সম্ভব নয়। অন্তত আইডিআরএর সদস্যদের তো নিয়োগ দিতে পারে মন্ত্রণালয়। সেটা কেন করছে না, তা–ও এক রহস্য।’

বিজ্ঞাপন
দেশের অর্থনীতির অন্যতম তিন খাত হলো ব্যাংক, বিমা ও পুঁজিবাজার। ব্যাংক খাতের জন্য নিয়ন্ত্রক বাংলাদেশ ব্যাংক, পুঁজিবাজারের জন্য বিএসইসি এবং বিমা খাতের জন্য আইডিআরএ। দেশের ৬০টি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের রয়েছে ৭ হাজারের মতো কর্মকর্তা-কর্মচারী। বিএসইসির কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন ২৫০ জন, আরও নিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে। আর আইডিআরএর জনবল মাত্র ৪৮ জন।

দোষ আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের

এর পেছনেও কাহিনি রয়েছে। আইডিআরএ ১৯৫ জনবল-কাঠামোর একটি প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিল ২০১২ সালেই। কিন্তু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তা কেটে দিয়ে শুধু ৯৫ জনের কাঠামো অনুমোদন করে, যা তখনকার আইডিআরএ মেনে নেয়নি। ২০১৪ সালের জুলাইয়ে আবার ১৯৫ জনের অনুমোদন চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এ দফায় অনুমোদন করে ১৫৫টি পদ। সমস্যা কেটে যায়নি। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে আটকে রয়েছে আইডিআরএর কর্মচারী নিয়োগ বিধিমালা। এটি পাস না হলে আইডিআরএ কাউকে নিয়োগ দিতে পারবে না।

দেশের অর্থনীতির অন্যতম তিন খাত হলো ব্যাংক, বিমা ও পুঁজিবাজার। ব্যাংক খাতের জন্য নিয়ন্ত্রক বাংলাদেশ ব্যাংক, পুঁজিবাজারের জন্য বিএসইসি এবং বিমা খাতের জন্য আইডিআরএ। দেশের ৬০টি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের রয়েছে ৭ হাজারের মতো কর্মকর্তা-কর্মচারী। বিএসইসির কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন ২৫০ জন, আরও নিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে। আর আইডিআরএর জনবল মাত্র ৪৮ জন।
সচিব আসাদুল ইসলাম এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ‘দোষ আমাদেরও আছে। তবে নিয়োগের বিষয়ে আইনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। দেখা যাক, কী হয়।’

জনবলসংকট থাকায় সংস্থার স্বাভাবিক কাজ চালিয়ে নিতে ২০১১-১২ সময়ে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০ জন স্নাতক ও স্নাতকোত্তরকে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ দেয় আইডিআরএ। তাঁদের অনেকের সরকারি চাকরির বয়সও শেষ হয়ে গেছে। এসব অস্থায়ী কর্মকর্তাকে দিয়ে তদন্ত ও পরিদর্শন দল গঠন করে অনেক বেসরকারি বিমা কোম্পানির বিরুদ্ধেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে আইডিআরএ। এসব বিষয়ে ১০ বছর ধরেই চুপ ছিল আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।

অস্থায়ীদের চাকরির কী হবে, জানতে চাইলে আইডিআরএ চেয়ারম্যান এম মোশারফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিমার মতো একটি বিশেষায়িত খাতে আইডিআরএতে অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগপ্রাপ্তদের অভিজ্ঞতাকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সেই চিন্তা করা হচ্ছে। একটা পথ তৈরি করতেই হবে। তাদের বিষয়টিকে সরকারের শীর্ষ মহল ইতিবাচকভাবে দেখবে বলেই আশা করছি।’

প্র বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন