default-image
বহুমুখী পাটপণ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তুলিকা। কয়েক বছর ধরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাটের ব্যাগ ও গৃহসজ্জার বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করছে প্রতিষ্ঠানটি। করোনাকালের চ্যালেঞ্জ ও বর্তমান ব্যবসা-বাণিজ্য পরিস্থিতি নিয়ে প্র বাণিজ্যের সঙ্গে কথা বলেছেন তুলিকার স্বত্বাধিকারী ইসরাত জাহান চৌধুরী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শুভংকর কর্মকার

প্র বাণিজ্য: বছরখানেক আগে দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। তারপর মহামারি এই ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে লম্বা সময়ের জন্য লকডাউন আরোপ করে সরকার। সেই সময়কার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

ইসরাত জাহান চৌধুরী: লকডাউন শুরু হওয়ার পর আমরা কারখানা বন্ধ করে দিই। আমি নিজে মাস দুয়েক বাসায় ছিলাম। তবে মাসে মাসে কর্মীদের বেতন পাঠিয়ে দিয়েছি। তিন মাস বন্ধ থাকার পর কারখানার উৎপাদন শুরু করি আমরা। কারণ, ছোট উদ্যোক্তা হিসেবে বেশি সময় বসে থাকা সম্ভব ছিল না। তারপর টুকটাক ক্রয়াদেশ আসতে থাকে। তবে করোনার আগের চেয়ে বর্তমানে ক্রয়াদেশ কিছুটা কমেছে। তারপরও ব্যবসা খারাপ চলছে না।

বিজ্ঞাপন

ব্যবসায় করোনার আগের ও বর্তমান সময়ের মধ্যে তফাত কী?

ইসরাত জাহান চৌধুরী: করোনার আগে ও পরের তফাত অনেক। মহামারির আগে চিন্তাভাবনা ছিল একরকম। বর্তমানে অনেক কিছুই গভীরভাবে ভাবতে হচ্ছে। নতুন নতুন অনেক চ্যালেঞ্জ চলে আসছে। ব্যবসা টেকসই করতে বহুমুখী পণ্য উৎপাদনের দিকে যেতে হচ্ছে। উৎপাদন সক্ষমতা কীভাবে বাড়ানো যায়, তার ওপর বাড়তি নজর দিতে হচ্ছে। করোনার রপ্তানি একেবারে শূন্যের কোঠায় নেমেছিল। তখন বিকল্প হিসেবে আমরা খাদ্য অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত সরবরাহকারী হয়েছি। সরকারি সংস্থাকে আমরা পাটের বস্তা সরবরাহ করছি। একভাবে না হলে অন্যভাবে টিকে থাকতে হবে, এটিই আসলে করোনা শিখিয়ে দিয়েছে।

লকডাউনের সময়ে কর্মীদের বেতন কীভাবে দিলেন? সরকারের প্রণোদনা তহবিল থেকে কি ঋণ পেয়েছিলেন?

ইসরাত জাহান চৌধুরী: নিজের পুঁজি ভেঙে শ্রমিকের বেতন দিতে হয়েছে। কারখানার ভাড়া দিতে হয়েছে। প্রণোদনার ঋণের জন্য আবেদন করিনি। ঋণ আবেদন করতে যেসব কাগজপত্র দরকার, তার মধ্যে অডিট রিপোর্ট আমার ছিল না। তিন বছরের অডিট রিপোর্ট প্রস্তুত করার পর জানতে পারলাম আবেদন করার সময় শেষ। তা ছাড়া ব্যাংক থেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে জানাল, যাঁদের আগে ঋণ নেওয়া আছে, তাঁরাই কেবল সহজে ঋণ পাবেন। ফলে আমি আর প্রণোদনার ঋণের জন্য আবেদন করিনি।

কাঁচা পাটের দাম তো আকাশ ছুঁয়েছে। ২০০০-২৫০০ টাকা মণের পাট বিক্রি হচ্ছে ছয় হাজার টাকায়। ব্যবসা কীভাবে টিকিয়ে রেখেছেন?

ইসরাত জাহান চৌধুরী: এখন আসলে আমরা একপ্রকার হাত-পা গুটিয়ে বসে আছি। ক্রেতারা এত দামে পণ্য কেন নেবে? যেসব পণ্যের মোড়কীকরণের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে লাগবে তারাই শুধু পাটপণ্য নিচ্ছে। তবে তারা বিরক্ত হচ্ছে। বর্তমানে বাধ্য হয়ে নিলেও সে হয়তো বিকল্প ভাবছে।

কাঁচা পাটের দাম সহনীয় রাখতে আপনার পরামর্শ কী?

ইসরাত জাহান চৌধুরী: সারা দুনিয়াতেই পরিবেশবান্ধব পণ্য হিসেবে পাটজাত পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। আমাদের দেশে পাট আছে, আমরা সেটিকে বিক্রি করতে পারি। কিন্তু আমরা পাটকে বড্ড বেশি অবহেলা করছি। প্রতিবছর প্রচুর পরিমাণে কাঁচা পাট ও সুতা অল্প দামে রপ্তানি হয়ে যাচ্ছে। অথচ মূল্য সংযোজন করে রপ্তানি করতে পারলে কয়েক গুণ বেশি পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। পাট হচ্ছে প্যাকিং প্রোডাক্ট বা মোড়কীকরণের পণ্য। বর্তমানের মতো অস্বাভাবিক দাম হলে পাট থেকে অনেকেই মুখ ফিরিয়ে নেবে। তাই দাম যৌক্তিক জায়গায় রাখতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। সে জন্য কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধ করা উচিত। এ ছাড়া উৎপাদন খরচ হিসাব করে দাম নির্ধারণ করে দেওয়া দরকার।

প্র বাণিজ্য: বর্তমান চ্যালেঞ্জিং সময়ে বহুমুখী পাটপণ্যের রপ্তানিকারকদের জন্য কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন?

ইসরাত জাহান চৌধুরী: ক্রয়াদেশ পেতে আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীগুলো বেশ কাজে দেয়। তবে ছোট উদ্যোক্তাদের পক্ষে ছয়-সাত লাখ টাকা খরচ করে বিদেশে প্রদর্শনী অংশ নেওয়া সম্ভব না। এ ক্ষেত্রে জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টার (জেডিপিসি) বিভিন্ন প্রদর্শনী থেকে ক্রয়াদেশ আনতে পারে। সেগুলো ছোট ছোট প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে উৎপাদন করিয়ে রপ্তানি করা সম্ভব। কারণ, আমাদের অধিকাংশ উদ্যোক্তাই সচেতন নয়। তারা মানসম্মত পণ্য উৎপাদন করতে পারলেও কোথায় বিক্রি করবে, সেটি জানে না। করোনার চ্যালেঞ্জে মোকাবিলা করে ছোট উদ্যোক্তাদের টিকিয়ে রাখতে প্রণোদনা দরকার। তবে কেবল ঘোষণা দিলে হবে না, ছোটদের প্রণোদনা দেওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই সদিচ্ছা লাগবে। অনেক বড় উদ্যোক্তাই ব্যাংকের টাকা না দিয়েই হয়তো বিদেশে চলে গেছেন। ছোটদের বেলায় এমন ঘটনা খুব একটা শোনা যায় না। তাই ছোটদের একটু ভরসা করতে হবে। সহজ শর্তে জামানতবিহীন ঋণ দিতে কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য আলাদা নীতি করতে হবে।

বিজ্ঞাপন
প্র বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন