default-image

আশির দশকেও দেশের যাত্রীবাহী বাসগুলোতে লেখা থাকত, ‘যাত্রীদের জীবন বিমাকৃত’। এখন আর শব্দ তিনটি লেখা থাকে না। না থাকার কারণও আছে। যাত্রীদের জীবন এখন আর বিমার আওতায় নেই। কেন নেই, এ প্রশ্নের জবাব হচ্ছে, এ ব্যাপারে কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে দুর্ঘটনায় চালক ও যাত্রীরা আহত হলে বা মারা গেলে কেউ ক্ষতিপূরণ পান না। সড়ক দুর্ঘটনাপ্রবণ এ দেশের সব যানবাহনই চলছে এখন জীবনবিমার আওতাবিহীন।

অথচ দেশে রয়েছে রাষ্ট্রীয় সংস্থা জীবন বীমা করপোরেশন (জেবিসি)। রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি মেটলাইফ (সাবেক আলিকো) এবং ভারতের লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানি (এলআইসি) বাংলাদেশ লিমিটেড। এ তিনটির বাইরে রয়েছে আরও ৩০টি বেসরকারি জীবনবিমা কোম্পানি। বিমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) সূত্রে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে দুই কোটি মানুষ জীবনবিমা পলিসির আওতায় আছেন।

বিজ্ঞাপন

এদিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের প্রণয়ন করা জাতীয় বিমা নীতিতে বলা হয়েছে, দেশে প্রতি হাজার মানুষের মধ্যে মাত্র চারজনের জীবনবিমা রয়েছে। সে হিসেবে মোট জনগোষ্ঠীর মাত্র ৬০ লাখ জীবনবিমার আওতায়। তবে বিভিন্ন কোম্পানির পাঁচ বছরের আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গড়ে মোট পলিসির অর্ধেকই প্রথম বছরে কিস্তি দেওয়ার পর আর সচল থাকেনি।

তামাদি হয়ে যাওয়ার জন্য বিমা খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কয়েকটি কারণকে চিহ্নিত করেছেন। এগুলো হচ্ছে নতুন পলিসি খোলার জন্য জীবনবিমা কোম্পানির প্রতিনিধিরা (এজেন্ট) যতটা মনোযোগী থাকেন, খোলার পর আর তা থাকেন না। পলিসি গ্রাহকদেরও সচেতনতার অভাব রয়েছে। কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধেও রয়েছে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের পর্যবেক্ষণেই এসেছে, অসাধু শ্রেণির বিমা প্রতিনিধিরা গ্রাহকের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে তা আত্মসাৎ করেন।

বিভাগটি আরও বলেছে, স্বল্পশিক্ষিত প্রতিনিধিরা মাঠপর্যায়ে বিমাপণ্য বিক্রিতে জড়িত। তাঁরা বিমা সম্পর্কে মানুষকে আলোকিত করার পরিবর্তে বরং প্রলুব্ধ করেন। ফলে মানুষ অনেক ক্ষেত্রে প্রতারিত হন। এ ক্ষেত্রে আইডিআরএকে প্রতারক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে।

বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) তথ্য অনুযায়ী, এক বছর পার করতে পারেনি, এমন পলিসি ৭০ শতাংশ। এর মধ্যে তিনটি কোম্পানি পলিসির মেয়াদের মাত্র ৩০ শতাংশ, তিনটি কোম্পানি মেয়াদের ৪০ শতাংশ, চারটি কোম্পানি মেয়াদের ৫০ শতাংশের বেশি পার করতে পেরেছে। চারটি কোম্পানি পলিসি মেয়াদের ৬০ শতাংশের ওপরে এবং তিনটি কোম্পানি ৭০ শতাংশের বেশি পার করতে সক্ষম হয়েছে। প্রথম বছরে প্রিমিয়াম আদায় হলেও ৭০ শতাংশই আদায় হয়নি পরের বছরে, এমন কোম্পানি রয়েছে তিনটি।

বিআইএ চেয়ারম্যান শেখ কবির হোসেন এ বিষয়ে বলেন, সমস্যা তো আছেই। তবে আইডিআরএ কিছু পদক্ষেপ নেওয়ায় তামাদি পলিসি এখন কমবে। যাত্রীদের জীবনবিমাসহ অনেক ক্ষেত্রেই বাধ্যতামূলক প্রজ্ঞাপন জারি করা যায়।

বিজ্ঞাপন

বিমা প্রতিনিধিরা ২০১২ সালের ১৩ মার্চের আগ পর্যন্ত প্রথম বছরের প্রিমিয়াম থেকে কমিশন পেয়ে আসছিলেন ৩৫ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত। কমিশন নির্ধারিত করে দেওয়ার পর প্রথম বছরের কমিশন (২০ বছরের বেশি মেয়াদের পলিসি) ৩৫ শতাংশ, আর দ্বিতীয় থেকে পরবর্তী তিন বছর পর্যন্ত কমিশন ৫-১০ শতাংশ। চলতি মাসে কমিশন পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

জীবনবিমা পলিসিগুলোর মধ্যে একক বিমা ও ক্ষুদ্র বিমার আওতায় নানা ধরনের পলিসি রয়েছে। ৩-১৮ বছর মেয়াদি এসব পলিসিতে প্রিমিয়াম নেওয়া হয় মাসিক, ত্রৈমাসিক, ষাণ্মাসিক ও বার্ষিক ভিত্তিতে। অন্যদিকে ক্ষুদ্র বিমার বিভিন্ন পলিসির প্রিমিয়ামের কিস্তি নেওয়া হয় শুধু সাপ্তাহিক ও মাসিক ভিত্তিতে। গ্রাম ও শহরের নিম্নবিত্ত মানুষকে লক্ষ্য করেই কোম্পানিগুলো ক্ষুদ্র বিমার পলিসি বিক্রি করছে। তবে বেশির ভাগ গ্রাহকেরই ১০-১২ বছর মেয়াদি পলিসির প্রতি আগ্রহ বেশি বলে জানা গেছে।

একটি জীবনবিমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা স্বীকার করে প্রথম আলোকে বলেন, অনেকেই ঝোঁকের মাথায় পলিসি খোলেন। কিন্তু পরে আর তা চালিয়ে নিতে চান না। আবার প্রথম বছরের তুলনায় পরবর্তী বছরগুলোতে কম কমিশন থাকায় আগ্রহ হারান প্রতিনিধিরা। তাই পরবর্তী বছরগুলোর কিস্তি আদায়ে তাঁরা সচেষ্ট থাকেন না। প্রতিনিধিদের কেউ কেউ প্রিমিয়ামের অর্থ কোম্পানিতে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করেন।

দেশের আট বিভাগে প্রায় ৭০টি বিক্রয়কেন্দ্র ও ৩৫০টির মতো শাখা কার্যালয় রয়েছে জেবিসির। বর্তমানে সংস্থাটিতে একক পলিসি রয়েছে চার লাখের কাছাকাছি। এ ছাড়া গ্রুপ বিমা রয়েছে ৩০০টির কাছাকাছি প্রতিষ্ঠানের, যেগুলোতে দেড় লাখের মতো সদস্য রয়েছে।

বিদেশি মেটলাইফের কার্যকর পলিসি ১২ লাখের কাছাকাছি। অথচ জেবিসি সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭৩ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত জীবনবিমা ব্যবসায় জেবিসির অবস্থানই প্রথম ছিল। বর্তমানে মেটলাইফ প্রথম। এর পরেই রয়েছে ডেলটা লাইফ, ন্যাশনাল লাইফ, প্রগতি লাইফ, মেঘনা লাইফ, রূপালী লাইফ, পপুলার লাইফ, ফারইস্ট লাইফ ইত্যাদির অবস্থান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান মো. মাইন উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘উন্নয়নের দিকে যেতে গেলে বিমাকে এড়িয়ে যাওয়া বা অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু আমাদের নীতিনির্ধারকেরা তা মনে হয় কিছুটা করছে। এ খাতে সুশাসনের অভাব এতই বেশি যে একটা শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু সরকার এ ব্যাপারে নজর দিচ্ছে না। নিয়ন্ত্রক সংস্থা শক্তিশালী হলে অনেক সমস্যারই সমাধান করা সম্ভব।’

প্র বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন