default-image

সমসাময়িক উদ্যোক্তাদের মধ্যে নাজমা খাতুন অপরিচিত মুখ নন। তাঁর জুতা তৈরির কারখানা কুসুমকলিও আলোচনায় এসেছে বিস্তর। সেরা মাঝারি উদ্যোক্তাও হয়েছিলেন। এতটা প্রচার পাওয়ার পর সাধারণত সংবাদপত্র থেকে হারিয়ে যান নবীন উদ্যোক্তারা। তবে নাজমা খাতুনের বিষয়টা আলাদা। তিনি প্রতিনিয়ত নিজের জীবনের গল্পে নতুন নতুন অধ্যায় বাড়াচ্ছেন—তাই আবার এ প্রতিবেদন।

নাজমা খাতুনের কুসুমকলি ২০০৫ সালে শুরু হয়েছিল শূন্য থেকে। ২০১০-১১ নাগাদ নিজেকে একটা ভালো জায়গায় দাঁড় করিয়েছিলেন তিনি। দেশের শীর্ষস্থানীয় জুতা ব্র্যান্ডগুলোর জন্য জুতা বানাত নাজমার প্রতিষ্ঠান। ২০১২ সালে এসে পুড়ে যায় কারখানাটি। সেই নাজমা ২০১৯-এ যখন সেরা মাঝারি উদ্যোক্তা হন, তখন অবাক হয়েছিল অনেকেই। তবে নাজমার দেখানো বাকি ছিল অনেকটাই, এক বছর হলো সম্পর্ক চুকিয়ে দিয়েছেন নামী সব ব্র্যান্ডের সঙ্গে। পুরোদমে চলছে তাঁর কারখানা। কারণ, নাজমা ঠিক করেছেন, তিনি নিজের একটা ব্র্যান্ড তৈরি করবেন, যে ব্র্যান্ডের জুতো পরবে দেশের সব মানুষ। গত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি রাজধানীর এক পাঁচ তারকা হোটেলে জমকালো অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে নাজমার নিজস্ব জুতার দুটি ব্র্যান্ড ‘ভিনকা’ ও ‘ড. মার্ক’।

বিজ্ঞাপন

নাজমার অবস্থাও ব্যতিক্রম নয়। সপ্তম শ্রেণিতে থাকা অবস্থায় বিয়ে হয় তাঁর। বছর না ঘুরতেই সন্তান। তবে নিঃসন্দেহে নাজমা নিজে ব্যতিক্রমী ছিলেন। আড়াই বছরের মেয়ে কুসুমকে নিয়ে এসএসসি পরীক্ষা দেন। শুরু করেন প্যারামেডিকে পড়াশোনা। এ পড়াশোনার যোগ্যতা নিয়েই ঢাকায় আসেন নাজমা। শুরু করেন চাকরি।

নাজমা বলেন, ‘আমাদের পরিবারে পুরুষদের লেখাপড়াই খুব বেশি না। মেয়ে পড়বে, চাকরি করবে, এগুলো একটু বাড়াবাড়ি। জানেন, যখন খুব ছোট ছিলাম, তখন কিছুই বুঝতাম না। আমি ভাবতাম, খেয়ে–পরে মরে গেলাম—এ জীবনের কী দাম আছে? আমি জীবনের একটা দাম খুঁজতাম।’

চাকরি ভালোই করছিলেন নাজমা। কিন্তু চাকরি করে কি আর বড় কিছুর পেছনে ছোটা যাবে? নাজমার স্বামী তখন জুতা বিপণনে কাজ করতেন। এ থেকে নাজমার মাথায় বুদ্ধি আসে জুতা তৈরি করার। এখন কথা হচ্ছে, টাকা কোথা থেকে আসবে? একটা সমিতি থেকে ২০ হাজার টাকা ঋণ নিলেন নাজমা। ‘বিশ্বাস করবেন, মুহূর্তেই নাই হয়ে গেল সেই টাকা। শুধু তা–ই না, অনেকে কাজের আগে টাকা নিয়েও পালিয়ে গেলেন। এখানে থেমে গেলে ২০ হাজার টাকা শোধ করা কষ্টকর হবে। তা ছাড়া যদি হেরে যাই, সারা জীবন কথা থাকবে যে আমি পারি না। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম ব্যবসায় টিকে থাকব।’

নাজমার প্রত্যয় নজরে আসে তাঁর প্রতিষ্ঠানের বড়কর্তার। তিনি নাজমাকে এক বছর ধরে কয়েক দফায় প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা ধার দিলেন। এরপরও দাঁড় করানো গেল না ব্যবসা। সে সময় বিসিকের একটা প্রশিক্ষণের সুযোগ এল। কীভাবে উৎপাদন করা যায় ও কীভাবে ব্যবসা চালাতে হয়। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের তো সবটাই করতে হয় একহাতে। প্রশিক্ষণ শেষে চার লাখ টাকার একটা ব্যাংকঋণের ব্যবস্থাও হয়ে গেল।

নাজমা বললেন, ‘টাকাটা খুব জোর দিল আমায়। শুরুতেই ঋণগুলো সব পরিশোধ করলাম। হাতে রইল মাত্র ৪০ হাজার টাকা। এরপর চাকরি ছেড়ে পুরোদমে নেমে গেলাম ব্যবসায়।’ নাজমার চিন্তার ধারাটাই অন্য দশজনের মতো নয়। সবাই যেখানে আয় বুঝে ব্যয় করে নাজমা আগে হিসাব করলেন তাঁর কারখানার ব্যয় কত, এরপর ঠিক করলেন কত টাকা বিক্রি করতে হবে। উৎপাদনের কাজ তাঁর, বিক্রির কাজ স্বামীর। ‘বেঁধে দিতাম ঠিক কতগুলো জুতো প্রতিদিন বিক্রি করতে হবে। এভাবে একটু একটু করে দাঁড় করিয়ে ফেললাম ব্যবসা। সে স্বপ্নের ব্যবসা ২০১২ সালে নিমেষেই ছাই হয়ে গেল আগুনে।’

এবার নাজমা হিসাব কষলেন ঠিক কী করলে ঘুরে দাঁড়ানো যাবে। ব্যাংকের হিসাবে তখন ১৭ লাখ টাকা ছিল। কয়েক দিন আগেই পাওয়া একটা বিল। এ টাকাটা রাখা ছিল নতুন একটা কারখানা কেনার বায়নার টাকা দেওয়ার জন্য। নাজমা জানালেন, ‘এই কারখানার মালিক এমনিই আমাকে তাঁর কারখানা ব্যবহার করতে দিলেন। শুধু তা–ই না, টাকা ছাড়াই লিখে দিলেন। আমারও জেদ চেপে গেল, সেই কারখানাটির টাকা পাঁচ বছরেই পরিশোধ করে দিলাম।’

বিজ্ঞাপন

কঠোর পরিশ্রম আর দৃঢ় প্রত্যয় নাজমাকে বড় সব জুতার ব্র্যান্ডের প্রধান ঠিকাদার করে তুলল। ‘আপনি বিশ্বাস করবেন? বড় ব্র্যান্ড সব কটির সবচেয়ে বড় কাজগুলো আমি করতাম, আমার কারখানায় তৈরি জুতা বিলবোর্ডের প্রদর্শনের পণ্য হতো। এ বিষয়টিই সাহস দেয় আমাকে।’

এক বছর ধরে একটু একটু করে কাজ করেছেন নাজমা। নিজের ব্র্যান্ডের জুতা হবে এমন যে সমানে টক্কর দিতে পারে দেশসেরা ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে। ফেব্রুয়ারিতে পাঁচ তারকা এক হোটেলে মোড়ক উন্মোচন হলো নাজমার নিজের ব্র্যান্ডের। অভিষেক পরে হলেও নাজমার জুতা ইতিমধ্যে বাজারে চলে গেছে। করোনার আকালে যখন সবার ব্যবসায় মন্দা, সরকারকে তখন ২৫ লাখ টাকা আয়কর দিয়েছেন তিনি।

নাজমার লক্ষ্য খুব পরিষ্কার। নিজেই বললেন, ‘মেয়ে বলে কে কবে, কী ভেবেছে, কী বলেছে, এগুলো যার যার বিশ্বাস। আমি জানি, আমি কোথায় যেতে পারি। আমি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জুতার ব্র্যান্ড তৈরি করতে পারি। আমি সেই পথেই আগাচ্ছি। একই সঙ্গে আমার তিন মেয়ে কুসুম, কলি আর নয়নাকে সফল হিসেবে দেখতে চাই। ব্যস।’ ‘এতটুকুই তো আমার চাওয়া,’ সব শেষে বললেন প্রত্যয়ী নাজমা।

প্র বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন