বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বৈশ্বিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইএমএআরসি গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে বিশ্বে সুগন্ধি বাজারের আকার ছিল ৩ হাজার ২৮০ কোটি মার্কিন ডলারের। প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য ৮৫ টাকা ধরে স্থানীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২ লাখ ৭৯ হাজার কোটি টাকায়। ২০১৯ সালের হিসাব অনুযায়ী, বৈশ্বিক সুগন্ধি বাজারে ফরাসি সুগন্ধি ও প্রসাধনশিল্পের অংশ ১ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের। অর্থাৎ বৈশ্বিক বাজারের অর্ধেকের বেশি ফ্রান্সের সুগন্ধির দখলে।

ফরাসি সুগন্ধি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই আসে প্রভেন্স আর ফ্রান্সের উপকূলীয় অঞ্চলের কথা। এই দুটো অঞ্চলেই ফরাসি সুগন্ধির মূল বিকাশ হয়েছে। এই অঞ্চল দুটিই হলো সুগন্ধি তৈরিতে ব্যবহৃত নানা উদ্ভিদ এবং প্রয়োজনীয় উপকরণের ভান্ডার। বিশেষত ফ্রান্সের উপকূলীয় শহর ঘাহস ফরাসি সুগন্ধির কাঁচামালের মূল কেন্দ্র। এই শহরকে বিশ্বের সুগন্ধির রাজধানী বলা হয়। বিখ্যাত সিনেমা ‘পারফিউম: দ্য স্টোরি অব আ মার্ডারার’ এই অঞ্চলকে অমর করে রেখেছে।

ছোট একটি শহর ঘাহস, মাত্র ৪০ হাজার মানুষের বাস। কীভাবে সুগন্ধিশিল্পে তারা জগৎজুড়ে সাফল্য ও পরিচিতি অর্জন করেছে জানতে হলে একটু ইতিহাস ঘেঁটে আসতে হবে। দ্বাদশ শতাব্দীর দিকে ঘাহস না ছিল কোনো বিখ্যাত শহর। না ছিল এখানে কোনো সুগন্ধির নামডাক। ইতিহাস বলে, যে জায়গাগুলোতে সবচেয়ে বেশি দুর্গন্ধ হয়, সেগুলোই সুগন্ধি উৎপাদনের ক্ষেত্রে পাওয়ার হাউসে রূপান্তরিত হয়। আবার ফিরে যায় দ্বাদশ শতাব্দীতে। সে সময় বিশ্বজুড়ে ফ্রান্সের প্রভেন্স বেশ পরিচিত ছিল ট্যানারিশিল্পের জন্য। আর চামড়াশিল্পে তৈরি হওয়া দুর্গন্ধ যে উৎকট হয়, তা মোটামুটি সবারই জানা। এভাবে চলতে থাকে ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত। ট্যানারির কারণে দুর্গন্ধ এতটাই অসহ্য হয়ে ওঠে যে এ দুর্গন্ধ দূর করার লক্ষ্যে ও ক্রমবর্ধমান বায়ুদূষণ মোকাবিলায় ষোড়শ শতাব্দীতে এই এলাকায় সুগন্ধিশিল্পের কারখানা করার চিন্তা শুরু করা হয়। মজার বিষয়, সুগন্ধি তৈরিতে ব্যবহৃত উদ্ভিদ চাষের জন্য এই অঞ্চল বেশ উপযোগী। তাই ধীরে ধীরে ঘাহসের জমিতে সুগন্ধির প্রয়োজনীয় উদ্ভিদ চাষের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। তারই ধারাবাহিকতায় একসময় সুগন্ধি শিল্প স্থানীয় ট্যানারিমালিকদের গুরুত্বকে ছাড়িয়ে গেল।

প্যারিসের সবচেয়ে বিখ্যাত ফ্যাশন ডিজাইনারদের জন্য সুগন্ধি তৈরি হতে লাগল ঘাহস অঞ্চল থেকে। ঘাহসের বিশেষ আবহাওয়া সুগন্ধি উদ্ভিদ জন্মানোর জন্য উপযুক্ত জায়গা। উষ্ণ আবহাওয়া, পর্যাপ্ত মাটি এবং প্রচুর পানি সুগন্ধি গাছ জন্মানোর ক্ষেত্রে ঘাহসের গোপন রহস্য। ঘাহসের বিস্তীর্ণ ভূমিতে জুঁই, গোলাপ, লজ্জাবতী লতা এবং কমলার চাষ হয়। এখানে যখন ল্যাভেন্ডার ফোটে, তখন এই অঞ্চল রীতিমতো পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়। পুরো এলাকা বেগুনি রঙে আচ্ছাদিত হয়ে থাকে। তখনই বোঝা যায়, কেন এই অঞ্চলকে সুগন্ধির রাজধানী বলা হয়। এই অঞ্চলে অনেকেই বেড়াতে যান দুই হাজারের বেশি রকমের ঘ্রাণ আলাদা করা শিখতে। ঘাহসে ৬০টির বেশি সুগন্ধি কোম্পানি আছে। স্থানীয় প্রায় ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান এই সুগন্ধিশিল্পে। ঘাহসের আদায় হওয়া করের অর্ধেকই আসে সুগন্ধিশিল্প থেকে। সেই সঙ্গে এই শিল্প ঘিরে ব্যাপক প্রসার লাভ করেছে পর্যটন ও সেবা খাত।

তবে ফরাসি সুগন্ধিশিল্পের এই প্রসার কখনোই সম্ভব হতো না, যদি তীব্র ঘ্রাণের অনুভূতিসম্পন্ন মানুষ এ কাজে নিয়োগ করা না হতো। এখনো সুগন্ধি তৈরিতে বিশেষ ঘ্রাণের অনুভূতিসম্পন্ন মানুষেরা কাজ করেন। বলা হয়, স্বর্ণের দামের মতো তাঁদের কাজের দাম। মাত্র ৫০ জনের মতো বিশেষজ্ঞ রয়েছেন ফ্রান্সে। সারা বিশ্বেই সুগন্ধিশিল্প খাতে তাঁদের ব্যাপক চাহিদা। ঘাহসের কিছু প্রাচীন সুগন্ধি বা পারফিউম নির্মাতাপ্রতিষ্ঠান আজও রয়েছে, যেমন গালিমার্ড পারফিউমিউর (আনুমানিক ১৭৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল), মলিনার্ড পারফিউমিউর (আনুমানিক ১৮৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল)।

সুগন্ধির ক্ষেত্রে ফ্রান্সের দীর্ঘ এবং সমৃদ্ধ ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই বোঝা যায়, কেন অনেক সুপরিচিত পারফিউম কোম্পানির শিকড় ফ্রান্সে। শ্যানেল, ডায়র, গেরলাইন, ক্লো, থিয়েরি মুগলার, ইভেস সেন্ট লরেন্ট এবং ল্যানকোমের মতো ব্র্যান্ডগুলো ফ্রান্স থেকেই এসেছে। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে সুগন্ধি ব্যবসায়ীরা ফ্রান্সের বিশেষজ্ঞদের কাছে আসেন ঘ্রাণ চিনে নিতে।

প্র বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন