default-image

চলমান এই কোভিড মহামারির মূল বৈশিষ্ট্য হলো, যাঁদের এই ধাক্কা সহ্য করার ক্ষমতা সবচেয়ে কম, তাঁরাই এতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। তবে দেশে দেশে সরকার এই মানুষদের সহায়তায় বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েছে—মজুরি ভর্তুকি, বেকার ভাতাসহ রাজস্ব নীতিবিষয়ক ব্যবস্থা। কিন্তু স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও অন্যান্য মৌলিক সেবায় আরও বেশি বিনিয়োগ দরকার। এই বিনিয়োগের জন্য আমাদের মূল্য দিতে হবে। ব্যাপারটা হলো, যেভাবে বৈষম্য এবং সরকারি ঋণ বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে সরকারকে রাজস্ব আদায়ে আরও উদ্ভাবনী পথ বেছে নিতে হবে।

এই বাস্তবতায় অনেক দেশের সরকার এখন করপোরেশন ও সচ্ছল ব্যক্তিদের দিকে নজর দিচ্ছে, যাঁদের কর দেওয়ার সক্ষমতা আছে। এতে মহামারির বাস্তবতায় প্রয়োজনীয় অর্থায়নের একটা সুরাহা যেমন হবে, তেমনি সামাজিক সংহতিও বৃদ্ধি পাবে। মহামারিতে অনেক কিছুই বদলে যাচ্ছে। ভালো দিক হলো, এর মধ্য দিয়ে কর আহরণ এবং কাদের কত কর দেওয়া উচিত, তা নিয়ে নতুন ঐকমত্য সৃষ্টি হচ্ছে।
এই সময় কর আহরণের সময়োচিত পদক্ষেপ হচ্ছে অনুক্রমিক কর বা প্রোগ্রেসিভ ট্যাক্সেশনে জোর দেওয়া। যে সরকার এটা করবে, তারা রাজনৈতিক সমর্থনও পাবে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ২ হাজার ৫০০ অধিবাসীর ওপর পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, মহামারির ধাক্কায় অনুক্রমিক কর ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়তে পারে। বিষয়টি হলো, সংকটের সময় সরকারি নীতির প্রতি মানুষের মনোভাব বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

সমীক্ষায় দেখা গেছে, যাঁরা মহামারিতে গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়েছেন বা চাকরি হারিয়েছেন, অন্যদের তুলনায় অনুক্রমিক কর ব্যবস্থার প্রতি তাঁদের আগ্রহ বেশি। যাঁরা এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাননি, তাঁদের এ নিয়ে অত আগ্রহ নেই। দুই দলের মধ্যকার ব্যবধানও বেশ বড়—১৯ শতাংশীয় পয়েন্ট।

বিজ্ঞাপন
নীতিপ্রণেতারা কোভিড-১৯ রিকভারি কন্ট্রিবিউশন তহবিল গঠন করে অন্তর্ভুক্তিমূলক পুনরুদ্ধারের পথ সুগম করার চিন্তা করতে পারেন। এটা অনেকটা ধনীদের আয়ের ওপর সারচার্জের মতো, তবে সম্পদ করের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা যাবে না। মূল কথা হলো, যাঁরা বেশি আয় করছেন বা যেসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত মুনাফা করছে, তারা বেশি কর দেবে।

তবে সমীক্ষার ফলাফল সতর্কতার সঙ্গে বিশ্লেষণ করা দরকার। দেখা গেছে, যাঁরা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, রাষ্ট্রীয় সহায়তার ব্যাপারে তাঁরাই সবচেয়ে বেশি সোচ্চার। কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপার হলো, তাঁদের বড় একটি অংশ আগে রাষ্ট্রীয় সহায়তার ব্যাপারে অত আগ্রহী ছিলেন না। সে কারণে এখন তাঁদের এই মতের ভিত কতটা শক্তিশালী বা তা কত দিন স্থায়ী হবে, সে ব্যাপারে একধরনের অনিশ্চয়তা থেকেই যায়। এ ছাড়া অন্যান্য কারণে তাঁদের মত একইভাবে পাল্টে যেতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অতীতে মহামারির পর সরকারের ওপর মানুষের আস্থা কমেছে। তা সত্ত্বেও বলা যায়, অনুক্রমিক কর ব্যবস্থার প্রতি মানুষের সমর্থন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে নীতিপ্রণেতারা কোভিড-১৯ রিকভারি কন্ট্রিবিউশন তহবিল গঠন করে অন্তর্ভুক্তিমূলক পুনরুদ্ধারের পথ সুগম করার চিন্তা করতে পারেন। এটা অনেকটা ধনীদের আয়ের ওপর সারচার্জের মতো, তবে সম্পদ করের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা যাবে না। মূল কথা হলো, যাঁরা বেশি আয় করছেন বা যেসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত মুনাফা করছে, তারা বেশি কর দেবে। মূলত সামাজিক সংহতি বজায় রাখার ধারণা থেকে এই করের চিন্তা, অর্থাৎ যারা বেশি আয় করতে পারছে না, তাদের ক্ষতি পোষাতে ধনীদের এগিয়ে আসা। কয়েকটি খাত ধরেই ব্যাপারটা পরিষ্কার করা যায়, যেমন মহামারির মধ্যে রেস্তোরাঁ, পর্যটনের মতো খাত যেখানে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে ওষুধ ও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো বিপুল মুনাফা করছে। প্রযুক্তি ও ওষুধ কোম্পানিগুলো এখন চাইলে বাড়তি দায়িত্ব পালন করতেই পারে।

ঠিক এসব কারণেই সামাজিক সংহতি ও সরকারের কার্যকারিতার বড় পরীক্ষাক্ষেত্র হয়ে ওঠে মহামারি। যাঁরা মহামারিতে আক্রান্ত হচ্ছেন, স্বাভাবিকভাবে তাঁরা আরও বেশি পুনর্বণ্টনের দাবি তুলবেন। কিন্তু এসব দাবি অপূরিত থাকলে সরকারের ওপর আস্থাহীনতা তৈরি হবে তাঁদের, যাকে বলে মোহভঙ্গ ঘটবে। এরপর সংকট কেটে গেলে যদি প্রতীয়মান হয়, সরকার ধনী ব্যক্তি ও করপোরেশনগুলোর প্রতি বেশি পক্ষপাত দেখিয়েছে, তাহলে সমাজে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে। সামাজিক অস্থিরতার আশঙ্কা সৃষ্টি হবে। অর্থাৎ ঝুঁকি অনেক বেশি। সে জন্য কোভিড মহামারিতে নীতিপ্রণেতাদের শুধু স্বাস্থ্য খাত নিয়ে ভাবলে চলবে না, আয় বণ্টনে অধিকতর সমতার নীতি প্রণয়নের চিন্তাও করতে হবে। মানুষ যাতে সহজে সরকারি সেবার নাগাল পায়, সে ব্যবস্থা করতে হবে।

সামগ্রিকভাবে বললে, চ্যালেঞ্জ এখন দুটি। একদিকে মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের চিন্তাও করতে হবে। মহামারিতে যাঁরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাঁরা যেন পিছিয়ে না পড়েন, সেটা নিশ্চিত করাই এখন নীতিপ্রণেতাদের মূল কাজ।

আইএমএফের ব্লগ থেকে নেওয়া, লেখক চারজন আইএমএফের অর্থনীতিবিদ

অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন।

বিজ্ঞাপন
প্র বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন