default-image

করোনা সংক্রমণের পর যখন লকডাউন ঘোষণা করা হলো, তখন আমাদের ব্যবসা থমকে গেল। কারখানার শ্রমিকেরা কোথাও যেতে পারেনি। সবাই কারখানায় আটকা পড়ল। শ্রমিকেরা গ্রামে যেতে পারছে না। আবার কারখানা থেকে বেরও হতে পারছে না। যাত্রাবাড়ীর ডেমরায় আমার কারখানা, যেখানে ৫০০ শ্রমিক কাজ করে। সবাই যখন কারখানায় আটকা পড়ল, তাদের সবার খাওয়া ও থাকার ব্যবস্থা করলাম। তা ছাড়া ডেমরা এলাকায় নিম্ন আয়ের মানুষের সংখ্যা বেশি। স্থানীয় ওয়ার্ড কমিশনারের সহযোগিতায় নিম্ন আয়ের মানুষকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে গেলাম।

বর্ষার আগপর্যন্ত আমাদের পিক বা ব্যবসার জন্য সবচেয়ে ভালো সময়। এ সময়ের জন্য কারখানায় বাড়তি রডের মজুত রেখেছি। তখন দাম বেশি থাকে। কিন্তু সেই মাল কাঙ্ক্ষিত দামে বিক্রি করতে পারিনি। লোকসান হয়েছে। সরকারের যতটুকু সাহায্য দেওয়ার কথা, ততটুকু আমরা পাইনি। তবে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড আবার শুরু হয়েছে। রডের সঙ্গে ইট, বালু, সিমেন্ট—সব ব্যবসা সচল হয়েছে। এটা বেশি দরকার ছিল। যদিও করোনার আগের সময়ের মতো কাজে সেই গতি নেই। সরকারকে ধন্যবাদ, তারা উন্নয়নকাজ আবার সচল করেছে। এত সংকটের মধ্যেও উন্নয়নকাজ চালু করেছে।

বিজ্ঞাপন

যত দিন লকডাউন ছিল, তত দিন কারখানা বন্ধ ছিল। আমাদের শ্রমিকেরা কারখানাতেই ছিল। ছোট পরিসরে কাজ চালু রেখেছিলাম। ধীরে ধীরে কাজের পরিধিও বেড়েছে। আমরা একজন শ্রমিকও ছাঁটাই করিনি। বরং আমরা সবাইকে নিয়ে কাজ করেছি। স্বাস্থ্যবিধি মেনেই উৎপাদন করেছি। পালা করে কাজ করেছি। আমাদেরটা ভারী শিল্প। যন্ত্রপাতি ব্যবহারে একসঙ্গে বেশি শ্রমিকের প্রয়োজন হয় না। একটা মেশিন একজনই চালায়। এখানে শ্রমিকেরা অভিজ্ঞ। ছাঁটাই করলে অভিজ্ঞ শ্রমিক আর পাওয়া যায় না। তাই কোনো শিল্পকারখানার মালিক শ্রমিকদের ছাড়তে চায় না।

অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের পুরো বেতন দিতে পারিনি। কিন্তু বেতন বন্ধ করিনি। যারা কর্মচারী, তাদের আমি পরিবারের সদস্য মনে করি। তাদের যদি একসূত্রে নিয়ে আসতে না পারি, তারা যদি আমার কোম্পানিকে নিজের মনে না করে, তাহলে তো আমি বেশি দূর এগোতে পারব না। সবাইকে নিয়েই আমাকে কাজ করতে হবে।

করোনা থেকে যে শিক্ষা নিয়েছি, তা হলো শুধু আমি একা ভালো থাকলেই হবে না। আমার আশপাশে যারা আছে, তাদের নিয়েই ভালো থাকতে হবে। আমি শুধু নিজেকে রক্ষা করতে পারব না। সবাইকে সুরক্ষায় রাখতে হবে। এই বিষয়ে আগে তেমন নজরদারি ছিল না। তবে করোনা এসে চোখ খুলে দিয়েছে।

এখন অবশ্য রডের দাম বাড়ছে। কিন্তু ঠিকাদারদের যেভাবে বিল পাওয়ার কথা, সেভাবে পাচ্ছে না। সে কারণে সমস্যা হচ্ছে। অনেক ঠিকাদার বলছে, দু–তিন মাস হয়ে গেছে, তারা সরকারের কাছ থেকে বিল পাচ্ছে না। আমরাও শুনছি, করোনার কারণে আয় কমে যাওয়ায় সরকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার, মধ্যম অগ্রাধিকার, নিম্ন অগ্রাধিকার—তিন ক্যাটাগরিতে প্রকল্প চিহ্নিত করেছে। যেগুলো অগ্রাধিকার প্রকল্প, সেখানে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে। এ কারণে কিছুটা টানাপোড়েন তো আছেই।

এমনিতে আমাদের স্টিলের বাজার হলো খুবই অস্থির। হঠাৎ রডের দাম বেড়ে যায়, আবার কমে যায়। এখানে সরকারকে আলাদা করে চিন্তা করতে হবে। বিশেষ করে ভ্যাট–ট্যাক্সের যে নীতিমালা আছে, এগুলোর মধ্যে অনেক জটিলতা আছে, পরিচ্ছন্ন নয়। নিয়মনীতিতে যথেষ্ট দুর্বলতা আছে, সংস্কার জরুরি। ব্যবসায়ীদের যেমন পরিচ্ছন্ন হওয়া দরকার, তেমনি আমলাদেরও। আমলারাই চিন্তা করবে, কত সহজভাবে আমাদের কাছ থেকে ভ্যাট আদায় করা যায়। সরকারকে সত্যিকারের ব্যবসাবান্ধব হতে হবে। একটা গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার জন্য নয়। দেখা যাচ্ছে, অব্যবসায়ীদের হাতে সব চলে যাচ্ছে। করোনার সময় সরকারের যে প্রণোদনা এল, তার কতটুকু সাধারণ ব্যবসায়ীদের কাছে পৌঁছায়, এটার দেখভাল যারা করবে, তারা যদি পরিচ্ছন্ন না হয়, তাহলে সমস্যা থেকেই যাবে। এককথায় সুশাসন দরকার।

শেখ মাসাদুল আলম, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, শাহরিয়ার স্টিল মিলস লিমিটেড

বিজ্ঞাপন
প্র বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন