default-image

বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি শেষের আগেই সংসারে ঢুকে পড়েন সাফিয়া শামা। ১৯৯৭ সালে পড়াশোনা শেষে পুরোপুরি সংসারী হয়ে ওঠেন। কোলজুড়ে আসে এক মেয়ে ও এক ছেলে। স্বামী-সন্তান নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। ২০০৩ সালে এসে জীবন নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেন। স্থির করেন, ভালোমতো টিকে থাকতে প্রয়োজন নিজস্ব পরিচিতি ও আর্থিক সচ্ছলতা। এমন চিন্তা থেকে কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই ওই বছরেই সেলাই মেশিন কিনে বাসায় মেয়েদের জামা তৈরি শুরু করেন।

শুরুর দিকে পুঁজি ছিল মাত্র চার হাজার টাকা। প্রথমে একজন কর্মী দিয়ে বাসাতেই ব্যবসা শুরু করেন। এরপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। বড় কারখানা হয় রাজধানীর গ্রিন রোডে। ২০১১ সালে কর্মী বেড়ে হয় প্রায় ১০০ জনে। আর ২০১২ সালে বিক্রি এক কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। ওই সময়ে সাফিয়া শামা বাংলার মেলা ও প্রাইড টেক্সটাইলে নকশা পরামর্শক এবং পোশাক সরবরাহকারী। সারা দেশেই তাঁর পোশাক সরবরাহ হতো। সব মিলিয়ে ভালোই চলছিলেন। তবে জেদ ছিল আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের এবং স্বাতন্ত্র্য কিছু করার; যা কাপড় দিয়ে সম্ভব নয়।

বিজ্ঞাপন

নতুন কিছু করার তাড়না থেকে ২০১২ সালে পাট নিয়ে কাজ শুরু করেন। ধীরে ধীরে ছেড়ে দেন কাপড়ের কাজ। পাটপণ্যের বহুমুখীকরণ করে কীভাবে বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, সেই সুযোগ খুঁজতে শুরু করেন। ২০১৩ সালে পাট প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার আমন্ত্রণ পান কেয়ার বাংলাদেশ থেকে। পাট নিয়ে কাজ করে, সারা দেশের এমন ২০ উদ্যোক্তাকে হাতে–কলমে প্রশিক্ষণ দেয় কেয়ার বাংলাদেশ। তাদের বিদেশে প্রশিক্ষণের সুযোগ করে দেয়। পাশাপাশি বিদেশি ক্রেতার সঙ্গে সংযোগ ঘটায় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পণ্য বিক্রিরও ব্যবস্থা করে দেয়। এই প্রকল্প চলে ২০১৭ সাল পর্যন্ত।

default-image

সাফিয়া শামা বলেন, ‘এটাই ছিল আমার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। এই সুযোগ না পেলে পাটের সঙ্গে এত ওতপ্রোতভাবে যুক্ত হতে পারতাম না। আর উদ্যোক্তা হওয়াও সম্ভব হতো না। পাটের কারণেই আমার এত বৈশ্বিক যোগাযোগ গড়ে উঠেছে।’

সাফিয়া শামার বহুমুখী পণ্য তৈরির কারখানা রাজধানীর হাজারীবাগে। যেখানে গড়ে ২০ জন কর্মচারী কাজ করতেন। এর বাইরে আরও চার-পাঁচটি কারখানা থেকে কাজ করিয়ে নেন। তবে করোনাভাইরাস সব উলটপালট করে দিয়েছে। মে পর্যন্ত কারখানা কোনোমতে চালু ছিল, এরপর বন্ধ করে দিতে হয়েছে। নতুন কাজের আদেশ না পাওয়ায় বাইরের কারখানাগুলোতেও কাজ বন্ধ।

default-image
বিদেশেও পাটপণ্য রপ্তানি করেছেন সাফিয়া শামা। নেদারল্যান্ডসে রপ্তানি করেছেন মদের (পানীয়) বোতলের ব্যাগ। এ ছাড়া আরও কয়েকটি দেশের পাটের তৈরি এই ব্যাগ পাঠিয়েছেন সাফিয়া শামা।

সম্প্রতি নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে সাফিয়া শামার ব্যবসা। পাটপণ্য সরবরাহের আদেশ পেয়েছেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, ব্র্যাকসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান থেকে। ব্র্যাক, ব্র্যাক ব্যাংক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, রবি এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশে (আইসিডিডিআরবি) শুরু থেকে পাটপণ্য সরবরাহ করে আসছেন তিনি। পাটের প্রশিক্ষণ ব্যাগ, পাটের ফাইল, পর্দা, কুশন কভারসহ নানা পণ্য সরবরাহ করেছেন সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে।

এমনকি বিদেশেও পাটপণ্য রপ্তানি করেছেন সাফিয়া শামা। নেদারল্যান্ডসে রপ্তানি করেছেন মদের (পানীয়) বোতলের ব্যাগ। এ ছাড়া আরও কয়েকটি দেশের পাটের তৈরি এই ব্যাগ পাঠিয়েছেন সাফিয়া শামা। করোনার আগে বছরে পাঁচ–ছয় কোটি টাকার পণ্য সরবরাহ করতেন সাফিয়া শামা।

সাফিয়া শামা বলেন, করোনা সব শেষ করে দিয়েছে। একেবারে নতুন করে শুরু করতে হচ্ছে। কারখানার কর্মীরা অনেকেই বাড়ি ফিরে গেছেন। তাঁদের বাড়িতে থেকেই কাজ দেওয়া হচ্ছে। যত দ্রুত সম্ভব কারখানাও খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন
default-image

পাট দিয়ে তৈরি হওয়া পণ্যের মধ্যে রয়েছে শাড়ি, ব্লেজার, ফতুয়া, কটি, শাড়ি। এ ছাড়া জুতা, জানালার পর্দা, বেড কভার, কুশন কভার, সোফা কভার, কম্বল, পর্দা, টেবিল রানার, টেবিল ম্যাট, কার্পেট, ডোরম্যাট, শতরঞ্জি, শোপিস, গৃহস্থালি কাজে ব্যবহারের বহুবিধ পণ্য পাট দিয়ে তৈরি হয়। এ ছাড়া ফাইল কভার, বিভিন্ন প্রকার ব্যাগ, বিভিন্ন হ্যান্ডিক্রাফটসহ পাটের আরও বহুমুখী পণ্য রয়েছে। সাফিয়া শামার পণ্যের ব্র্যান্ডের নাম ‘উড়ান’। এখন অনলাইনেও পণ্য বিক্রি করছেন।

দেশে ব্যবসা করা কঠিন। পদে পদে নানা ভোগান্তি। বেশি দামে কাঁচামাল কিনতে হয়। ঋণের সুদ যা বলা হয়, তার অনেক বেশি আদায় করে। ব্যবসায় সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ মুনাফা হয়, আর ঋণের সুদ দিতে হয় ১৭ শতাংশ।
সাফিয়া শামা

সাফিয়া শামা পাটের কাঁচামাল সংগ্রহ করেন স্থানীয় সরবরাহকারীদের কাছ থেকে। তবে পাট রপ্তানিতে ২০ শতাংশ ভর্তুকি থাকায় এসব পণ্যের মূল্যও ধরা হয় বাড়িয়ে। সাফিয়া শামা বলেন, ‘দেশে ব্যবসা করা কঠিন। পদে পদে নানা ভোগান্তি। বেশি দামে কাঁচামাল কিনতে হয়। ঋণের সুদ যা বলা হয়, তার অনেক বেশি আদায় করে। ব্যবসায় সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ মুনাফা হয়, আর ঋণের সুদ দিতে হয় ১৭ শতাংশ। এসব বিষয়ে সরকারের বিশেষ নজর প্রয়োজন।’

সাফিয়া শামা ব্যবসার শুরুর দিকে ব্র্যাক ব্যাংক থেকে ঋণ পেয়েছেন। পরে ইস্টার্ণ ব্যাংক থেকে। এখন ব্যাংকিং করছেন সাউথইস্ট ব্যাংকের সঙ্গে। তিনি বলেন, প্রণোদনার ঋণে বলা হয়েছে, ব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতে ঋণ মিলবে। কিন্তু কয়জন উদ্যোক্তার সঙ্গে ব্যাংকের সুসম্পর্ক থাকে। ফলে ঋণ শুধু বড়রাই পাচ্ছে। ছোট উদ্যোক্তাদের খবর কেউ রাখে না।

মন্তব্য পড়ুন 0