default-image

প্রথম আলো: অতিক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা কেমন আছেন?

হেলাল উদ্দিন: ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা খুবই সংকটের মধ্যে আছেন। জীবন-মরণের সন্ধিক্ষণে তাঁরা দাঁড়িয়ে আছেন। গতবারের পয়লা বৈশাখ ও ঈদে ব্যবসা হয়নি। এবারের বৈশাখেও তেমন কিছু হয়নি। চলমান একুশ দিনের বিধিনিষেধের কারণে ঈদের আগে বেচাবিক্রির ভরা মৌসুমেও দোকান বন্ধ করে ঘরে বসে থাকতে হয়েছে। বহু ব্যবসায়ী আমাকে বলেছেন, এবার পুঁজি ওঠাতে না পারলে তাঁদের বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে পড়বে। তাই ঈদের আগে কয়েক দিন ভালো ব্যবসা না করতে পারলে শেষ যে আলোটুকু ছিল, সেটিও শেষ হয়ে যাবে।

সবচেয়ে বেশি কারা ক্ষতিগ্রস্ত?

হেলাল উদ্দিন: চলতি বছর পয়লা বৈশাখ কেন্দ্র করে যাঁরা পুঁজি বিনিয়োগ করেছিলেন তাঁরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তারপর তৈরি পোশাকের পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা লোকসান গুনেছেন। আমাদের অর্থনীতিটা উৎসবকেন্দ্রিক। সারা দেশে বছরে যে অর্থ লেনদেন হয় তার তিন ভাগের এক ভাগ পয়লা বৈশাখ ও রোজাকে কেন্দ্র করে হয়। পয়লা বৈশাখে ৭ হাজার কোটি থেকে সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়। পবিত্র রমজান ও ঈদে সেই ব্যবসা বেড়ে বেশ কয়েক গুণ হয়। ঈদের আগে বিলাসী পণ্য বেশি বিক্রি হয়। করোনা যে হারে বাড়ছে তাতে মানুষের মধ্যে বিলাসী পণ্য কেনার মানসিকতা খুব একটা নেই। তারপরও শেষ ১৫ দিনে কিছুটা ব্যবসা হবে। এ সময় পুঁজির তিন ভাগের এক ভাগও যদি তুলে আনা যায় তাহলে বেঁচে থাকার অবলম্বন পাওয়া যাবে।

বিজ্ঞাপন

ব্যবসায়ীদের ক্ষতি কথা চিন্তা করে সরকার তো বিধিনিষেধ শিথিল করল। ঈদের আগের ১৫ দিন বেচাবিক্রি করতে পারলে কতটা ক্ষতি পোষানো যাবে?

হেলাল উদ্দিন: বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) একটি গবেষণায় উঠে এসেছে, ১৫ বা তার কম কর্মী নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করে তাদের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হিসেবে ধরে নেওয়া যায়। এমন প্রতিষ্ঠান রয়েছে ৫৩ লাখ ৭২ হাজার ৭১৬টি। গড়ে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ৪ জন করেও কর্মী থাকলে সংখ্যাটি হবে প্রায় ২ কোটি ১৪ লাখ। ঈদের আগে তাঁদের এপ্রিল ও মে মাসের বেতন ও বোনাস দিতে হবে। ন্যূনতম একজন কর্মীর বেতন ১৫ হাজার টাকা হলে ঈদের আগে গড়ে তাঁদের দিতে হবে ৪৫ হাজার টাকা। তাতে আমাদের টাকা লাগে ৯৬ হাজার কোটি টাকা। চলতি মাসে বিক্রি হয়নি বললেই চলে। বিধিনিষেধের কারণে ঈদের আগে ব্যবসা খুব একটা হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে কিছুটা পুঁজি হয়তো ফেরত পাবেন খুচরা ব্যবসায়ীরা। এই পুঁজিটা দিয়ে ঈদের পর দুই-তিন মাস ব্যবসা চালিয়ে নিতে পারবেন তাঁরা।

লকডাউনে তো অনলাইনে কেনাকাটা চালু ছিল। তাতে ব্যবসায়ীরা কতটা ব্যবসা করতে পারলেন?

হেলাল উদ্দিন: দোকান ও বিপণিবিতানে যে ব্যবসা হয় তার মাত্র দশমিক ৫ শতাংশ অনলাইনে বিক্রি হয়। বড় প্রতিষ্ঠান ও কিছু বুটিক হাউস অনলাইনে ব্যবসা করে। ফলে অনলাইন চালু থাকলে তা দিয়ে তেমন কিছু হয় না। আবার অনলাইনে ব্যবসা পরিচালনা করতে যে অভিজ্ঞতা ও বিনিয়োগ করতে হয়, সেই সামর্থ্য অধিকাংশেরই নেই।

আসছে বাজেটে অতিক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য আমরা ৩৫ হাজার কোটি টাকা রাখার দাবি করেছি। সেখান থেকে তারা ঋণ নেবে। অতিক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ৫ লাখ টাকা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ৩০-৩৫ লাখ টাকা করে ঋণ পেলে তারা আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।
মো. হেলাল উদ্দিন

করোনার প্রথম ধাক্কায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের সহায়তার জন্য সরকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল। দোকানদারেরা সেখান থেকে কী ঋণ পেয়েছেন?

হেলাল উদ্দিন: দোকান মালিক সমিতির চেষ্টায় ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা ও ময়মনসিংহের ফলমূল, লুঙ্গি ইত্যাদি বিক্রি করেন এমন অতিক্ষুদ্র ৫ হাজার ব্যবসায়ীকে ঋণ দেওয়া গেছে। তা–ও অনেক কষ্ট করে। সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা ঋণ পেয়েছেন এই ব্যবসায়ীরা। দোকানদারদের অধিকাংশই কোনো সহায়তা পাননি। যারা পেয়েছে সেই সংখ্যাকে সমুদ্রের মধ্যে এক ফোঁটা পানি বলতে পারেন। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, ব্যাংক ও গ্রাহকের সম্পর্কের ভিত্তিতে ঋণ দেওয়া হবে। ঋণ নিতে টিআইএন সনদ ও ট্রেড লাইসেন্স লাগবে। কিন্তু অনেক ব্যবসায়ীরই এসব নেই। আসলে অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি—তারা আসলে কারোরই না। মানে কেউ তাদের আপন ভাবে না।

করোনার ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে অতিক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কী দরকার?

হেলাল উদ্দিন: আসছে বাজেটে অতিক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য আমরা ৩৫ হাজার কোটি টাকা রাখার দাবি করেছি। সেখান থেকে তারা ঋণ নেবে। অতিক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ৫ লাখ টাকা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ৩০-৩৫ লাখ টাকা করে ঋণ পেলে তারা আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। এখন প্রত্যেকের হাতে জাতীয় পরিচয়পত্র রয়েছে। এটি জামানত হিসেবে রেখে ঋণ দেওয়া যায়। জাতীয় পরিচয়পত্র ছাড়া দেশের বাইরে যাওয়া যায় না। অন্য কোনো কাজও করা যায় না। আমি মনে করি, জাতীয় পরিচয়পত্র জামানত হিসেবে একটি গ্রুপ ঋণ দেওয়া যায়। ১০ জনের গ্রুপের মধ্যে কেউ একজন না দিলে বাকি নয়জন দায়িত্ব নেবে। আশা করছি, দুই বছরের মধ্যে ঋণও পরিশোধ করে ফেলতে পারবেন ব্যবসায়ীরা। আমাদের দেশের সুবিধা হচ্ছে, ছোট্ট জায়গায় ১৭ কোটি মানুষের বসবাস। যা বানাই তাই চলে (বিক্রি হয়)। বাজারে যা–ই আনি, তা–ই চলে।

সকাল ১০টা থেকে ৫টা পর্যন্ত দোকানপাট ও বিপণিবিতান খোলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এই সময়ে স্বাস্থ্যবিধি কতটা নিশ্চিত করতে পারবেন?

হেলাল উদ্দিন: মাস্ক ব্যবহারের বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত করতে পারব। সাবান–পানি দিয়ে হাত ধোয়ার জন্য বেসিন বসিয়ে দেব। তবে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার সুযোগ আমাদের কাছে নেই। সবাইকে নিজ দায়িত্বে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। সবাই যার যার জায়গা থেকে চেষ্টা করলেই করোনা সংক্রমণ কমানো সম্ভব। আমাদের দাবি, ২০ রোজার পড়ে সময়টা বাড়িয়ে দেওয়া হোক। সেটি বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত হতে পারে। তাহলে মানুষজন একটু সময় পাবে। সময় কম থাকলেই মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে। তখন সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা যায় না।

বিজ্ঞাপন
প্র বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন