বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

হাসান আরও বলেন, যেকোনো বড় বিপণিবিতানে গেলেই দেখা যায়, মুঠোফোনের জন্য আলাদা জোন বা ফ্লোর রয়েছে। দেশে প্রায় ১২ কোটি মানুষ এখন মুঠোফোন ব্যবহার করে। কাজেই প্রতি মুহূর্তে কেউ না কেউ নতুন ফোন কেনে। আবার অনেকে নিয়মিত বিরতিতে ফোনের মডেল বদলায়। আবার বিপণিবিতানগুলোতে অনেক দোকানে পুরোনো ফোন বিক্রি হয়। এটি বিচ্ছিন্নভাবে চলছে দেশের সর্বত্র। বিপণিবিতানে পুরোনো ফোন বেচাকেনার আলাদা দোকান দেখে নতুন ব্যবসার পরিকল্পনা মাথাচাড়া দেয় নাঈম আহমেদের। শুধু ভাবলে তো ব্যবসা হবে না, নেমে পড়লেন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে।

২০১৩ সালে উচ্চবিদ্যালয়ে পড়ার সময় নাঈম আহমেদ ব্যবসার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফেসবুকে হাম্পটিডাম্পটি নামে একটা পেজ খোলেন। এরপর খুঁজে খুঁজে বের করলেন কারা পুরোনো ফোন বিক্রি করেন, তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। একটা ছোট নেটওয়ার্ক গড়ে তুললেন। ফেসবুক পেজের মাধ্যমে পুরোনো ফোন সংগ্রহ করে তা আবার বিক্রি করতে শুরু করলেন। কিন্তু ব্যবসা করতে গেলে দরকার হয় পুঁজি। পুঁজির সন্ধান করতে গিয়ে পেয়ে গেলেন একজন বিনিয়োগকারী। ফেসবুকে অনেকে হাম্পটিডাম্পটির জন্য কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। তাতেই আনুষ্ঠানিকভাবে একটা ইলেকট্রনিক রি-কমার্স (Re-Commerece) গঠনের সিদ্ধান্ত নেন নাঈম।

সব ঠিক আছে, কিন্তু দুশ্চিন্তা চোরাই ফোন নিয়ে। পুরোনো ফোন কিনতে গিয়ে সেটি যে চোরাই না, তা কীভাবে নিশ্চিত হওয়া যাবে? এবার উদ্যোক্তারা যোগাযোগ করলেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে। তাদের নির্দেশনা মেনেই কেনা শুরু করলেন পুরোনো ফোন। জিঙ্গোর কর্মীরা তাঁদের কাছ থেকেই পুরোনো ফোন কেনেন, যাঁরা ওই ফোন কেনার রসিদ দেখাতে পারেন, ফোনের বাক্স আছে, বিক্রির সময় জাতীয় পরিচয়পত্র দিতে পারেন এবং নিজের আঙুলের ছাপ দেন। জটিল প্রক্রিয়াটি একটি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সম্পন্ন করেন জিঙ্গোর কর্মীরা। অ্যাপের মাধ্যমে ফোনের বিভিন্ন ফিচার যাচাই-বাছাইয়ের পর ফোনটির দরদাম ঠিক করা হয়। যিনি ফোনটি বিক্রি করেন, তাঁকে টাকা দেওয়া হয় ব্যাংক হিসাব বা মোবাইলে আর্থিক সেবাদাতা (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। সরাসরি টাকা লেনদেন করা হয় না। আর বিক্রেতা যদি নতুন ফোন কিনতে চান, সে ক্ষেত্রে জিঙ্গোর পক্ষ থেকে পুরোনো ফোনের দাম দোকানদারের ব্যাংক হিসাব বা এমএফএস হিসাবে পাঠানো হয়। পুরোনো ফোন কেনার জন্য সারা দেশে জিঙ্গোর প্রায় ৪০০ সংগ্রহকারী বা কালেক্টর রয়েছেন।

কীভাবে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়, তা দেখান হাসান ইসলাম। অ্যাপের মাধ্যমে ফোনের ত্রুটি শনাক্ত করার পর দরদাম ঠিক করা হয়। সংগ্রহকারীরা চুক্তি অনুযায়ী তাঁদের পাওনা পেয়ে যান। এভাবে পুরোনো ফোন সংগ্রহ করার পর তা আবার পুরোনো ফোন বিক্রেতাদের কাছে বিক্রি করা হয়। সারা দেশে প্রায় ৩০০ বিক্রেতা জিঙ্গোর কাছ থেকে পুরোনো ফোন ক্রয় করেন।

সারা দেশের সংগ্রহকারী ও ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য রাজশাহীতে রয়েছে জিঙ্গোর কল সেন্টার। সেখান থেকেই সারা দেশের কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। বর্তমানে রাজশাহীতে জিঙ্গোর কর্মী রয়েছেন ৭২ জন। এ ছাড়া ঢাকায় ৪৬ জন কর্মী রয়েছেন।

পুরোনো ফোনের বাজার

চীন ও ভারতের পর এশিয়ার মধ্যে অন্যতম বড় ফোনের বাজার বাংলাদেশে। প্রতিদিনই কেউ না কেউ বিক্রয় ডটকমসহ বিভিন্ন ক্ল্যাসিফায়েড ওয়েবসাইট বা ফেসবুকের রিসাইকেল গ্রুপে ফোন বিক্রি করার জন্য বিজ্ঞাপন বা পোস্ট দেন। কেবল ক্ল্যাসিফায়েড সাইটগুলোতে গত ৫ বছরে ১৪ লাখ ফোন বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে চোরাই ফোনের একটি বড় বাজারও গড়ে উঠেছে দেশে।

দেশের এনজেল বিনিয়োগকারীদের নেটওয়ার্কের হিসাবে, বর্তমানে দেশে পুরোনো স্মার্টফোনের বাজার ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার বেশি। একই সঙ্গে ব্যবহৃত ইলেকট্রনিক গেজেটের বাজার প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার। এদিকে ব্যবহৃত ইলেকট্রনিক পণ্য বেচাকেনার রি-কমার্স মডেল বিশ্বের নানা দেশে দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। অলিম্পাস ক্যাপিটাল, টেনসেন্ট ও সফট ব্যাংকের মতো বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা এরই মধ্যে শতকোটি ডলারের বেশি এই খাতের স্টার্টআপগুলোতে বিনিয়োগ করেছে।

হাম্পটিডাম্পটির পর ৭ লাখ টাকা সঞ্চয় নিয়ে নাঈম ও হাসান ২০১৭ সালে জিঙ্গো প্রাইভেট লিমিটেড প্রতিষ্ঠা করেন। এরই মধ্যে প্রায় ৫১ হাজার ফোন তাঁরা কেনাবেচা করেছেন। বর্তমানে মাসে গড়ে সাড়ে তিন হাজার ফোন তাঁরা গ্রাহকের কাছ থেকে কিনে ব্যবসায়ীদের কাছে (সিটুবি) বিক্রি করছেন। ২০২১ সালে তাঁদের মাসিক বিক্রয় প্রবৃদ্ধি ২০ শতাংশ। জিঙ্গো প্রাইভেট লিমিটেড ইতিমধ্যে প্রি-সিড পর্যায়ের বিনিয়োগ পেয়েছে। রাজশাহীতে মুঠোফোন মেরামতের একটা সেন্টার গড়ে তুলতে আগ্রহী জিঙ্গোর উদ্যোক্তারা।

রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল থেকে এসএসসি ও রাজশাহী মসজিদ মিশন একাডেমি থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করে নাঈম আহমেদ এখন পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশে সমাজবিজ্ঞান ও সমাজকর্মে চূড়ান্ত বর্ষে অধ্যয়ন করছেন। আর হাসান ইসলাম ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।

আমাদের দেশে ই-বর্জ্য নিয়ে তেমন চিন্তা হচ্ছে না, কিন্তু এটি বাড়ছে। আইনিভাবে পুরোনো ফোন বেচাকেনা এবং সেগুলোকে পুনরায় ব্যবহারের উপযোগী করতে পারলে এ খাতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে বলে মনে করেন জিঙ্গোর তরুণ এ দুই উদ্যোক্তা।

প্র বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন