default-image

করোনার শুরুর দিকে আতঙ্ক ঘিরে ধরেছিল। কারণ, মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে বিদেশি ক্রেতা প্রতিষ্ঠান বহুমুখী পাটপণ্যের ক্রয়াদেশ বাতিল ও স্থগিত করেন। মাসের শেষ দিকে দেশেও লকডাউন জারি করা হয়। তখন কারখানা বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। বেতন নিয়ে দুশ্চিন্তা না করার কথা বলে কর্মীদের বাড়িতে থাকার পরামর্শ দিয়ে পাঠিয়ে দিলাম।

একদিকে পণ্য রপ্তানি হচ্ছে না। অন্যদিকে দিনের পর দিন কারখানা বন্ধ। আবার প্রণোদনা তহবিল থেকে ঋণ পাওয়ার আশা নেই। তাই এপ্রিলে নিজের স্থায়ী আমানত ভেঙেই আমার প্রতিষ্ঠানে তিন হাজার কর্মীর বেতন দিলাম। কিছুটা ভারমুক্ত হলাম। কিন্তু অনিশ্চিত পরিস্থিতি। রপ্তানি করতে না পারলে এক থেকে দুই মাস হয়তো এভাবে চালানো যাবে। তারপর কী হবে? এসব ভাবতে ভাবতে কিছুটা ঘাবড়ে গেলাম।

বিজ্ঞাপন

এক মাসের বেশি সময় বন্ধ রাখার পর ৭ মে কারখানার উৎপাদন শুরু হলো। বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গেও যোগাযোগ শুরু করলাম। কেউ কেউ ক্রয়াদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে এলেন। কারণ, বিদেশে অনলাইনে কিছু কিছু বিক্রি হচ্ছিল। আবার চীনের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে কয়েকজন ক্রেতা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর বাংলাদেশে কারখানা পরিদর্শন করে ক্রয়াদেশ দেওয়ার আশ্বাস দিলেন। ধীরে ধীরে আবার আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে শুরু করলাম।

বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদনে দক্ষ কর্মী দরকার। একেকজন কর্মীকে প্রস্তুত করতে তিন-চার বছর লেগে যায়। সে কারণে করোনার শুরুতেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম কষ্ট হলেও কাউকে ছাঁটাই করব না। শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্তে অটল থাকতে পেরেছি। কারখানা বন্ধের সময় প্রত্যেক কর্মীকে পুরো বেতন দিয়েছি। ঈদের সময় বোনাসও দেওয়া হয়েছে। তাঁরাই পরে প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনে বাড়তি কাজ করে রপ্তানিতে গতি ফিরিয়ে এনেছেন। শেষ পর্যন্ত ২০১৯ সালের চেয়ে গত বছর আমাদের বহুমুখী পাটপণ্যের রপ্তানি ২০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

করোনার কারণে সস্তা পণ্যের চাহিদা বেড়ে যায়। আর আমরা আগে থেকে বহুমুখী পণ্য উৎপাদন করায় ভালো করতে পেরেছি। আগামী তিন মাস আমাদের কারখানায় পূর্ণ সক্ষমতায় চালানোর মতো ক্রয়াদেশ রয়েছে। যদিও ১০-২৫ ডলারের, অর্থাৎ দামি পণ্যের চাহিদা ৮০ শতাংশের মতো কমে গেছে। কারণ, দামি পণ্য কেনার আগে ক্রেতারা স্বচক্ষে দেখে নিতে চান। অনলাইনে সেটি সম্ভব না হওয়ার কারণেই সস্তা পণ্য বেশি বিক্রি হচ্ছে।

যেসব প্রতিষ্ঠান ১-২ ক্যাটাগরির পণ্য উৎপাদন করে, তারা অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে আমরা ৭-৮ ক্যাটাগরিতে প্রায় ৫ হাজার পণ্য উৎপাদন করে থাকি। করোনায় বন্ধ থাকার পর যখন চালু হলো, তখন আমরা ব্যবসায়িক কৌশল হিসেবে নিত্যনতুন নকশার পণ্য ক্রেতাদের কিনতে অফার করেছি। এতে আমাদের রপ্তানি যেমন বেড়েছে, তেমনি আমাদের বিদেশি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের বিক্রিও বেড়েছে। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতেও আমরা আমাদের মেশিন ও কর্মীদের কাজে লাগিয়ে আরও অনেক ধরনের বহুমুখী পণ্য উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছি। কারণ, ভবিষ্যতে টিকে থাকার পাশাপাশি ব্যবসা সম্প্রসারণে এর কোনো বিকল্প নেই।

বিজ্ঞাপন

করোনার মতো বিশেষ পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সঞ্চয় থাকা দরকার। একসময় আমরা মুনাফার ৫ শতাংশ জমা রাখতাম। মাঝে দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। করোনার অভিজ্ঞতার পর আমরা আবারও মুনাফার ৫ শতাংশ জমা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

তৈরি পোশাকশিল্প ছাড়া অন্য খাতের গুটিকয় উদ্যোক্তা সরকারের প্রণোদনা তহবিল থেকে ঋণ পেয়েছে। ফলে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেরই চলতি মূলধনে টান পড়েছে। সরকার যদি কোনো প্রক্রিয়ায় চলতি মূলধন সরবরাহ করে তাহলেই প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়বে।

মো. রাশেদুল করিম: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ক্রিয়েশন প্রাইভেট লিমিটেড

প্র বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন