default-image

আমাদের সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে শেয়ার মার্কেটের ওঠানামা এক দুর্বোধ্য ব্যাপার। স্বল্প বা মধ্য মেয়াদে ব্যাপারটা আসলে তা-ই, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে সাফল্যের কিছু পরীক্ষিত নিয়ামক আছে, যেমন—

১. কোম্পানির গুণগত অবস্থান

কোনো কোম্পানির শেয়ার কেনার মানে আসলে সেই কোম্পানির আংশিক মালিকানা কেনা। সুতরাং সেই কোম্পানির গুণগত দিকগুলোর সঠিক পর্যালোচনা একান্ত জরুরি

—নিচের বিষয়গুলো বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে—

ক. কোম্পানিটির পণ্য বা সেবাগুলো তাদের গ্রাহকদের কাছে জনপ্রিয় কি না (বা প্রতিযোগিতামূলক কি না) যেমন স্কয়ারের ওষুধ, ব্র্যাক ব্যাংকের বিকাশ, গ্রামীণফোনের ডেটা সার্ভিস ইত্যাদি।

খ. কোম্পানিটির পরিচালকেরা কেমন—তারা আপনার পার্টনার হিসেবে বিশ্বাসযোগ্য কি না—এ ক্ষেত্রে আপনারা গুগল সার্চ করে দেখতে পারেন বা পরিচিত লোকজনের কাছ থেকে খোঁজ নিতে পারেন।

গ. কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ অন্যান্য সিনিয়র অফিসারদের দক্ষতা, সততা ও উদ্ভাবনীশক্তি কেমন—তাদের যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ, ব্যবসায়িক সাফল্য কেমন।

ঘ. বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনের মান কেমন—তাতে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ তথ্য দেওয়া আছে কি না—দেশসেরা অডিটর দিয়ে অডিট করা হয়েছে কি না।

ঙ. কোম্পানিটি সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডারদের অধিকার যথাযথভাবে সম্মান করছে কি না—যেমন বার্ষিক মুনাফার তুলনায় লভ্যাংশ দেওয়ার হার যথেষ্ট কি না।

চ. প্রাতিষ্ঠানিক ও বিদেশি শেয়ারহোল্ডারদের ধারণকৃত শেয়ার কেমন—পরিচালকদের ধারণকৃত শেয়ার কতখানি।

বিজ্ঞাপন

২. কোম্পানির (বিনিয়োগকৃত অর্থের ওপর) মুনাফা করার ক্ষমতা

একটি কোম্পানি তার মূলধন বিনিয়োগ করে তার ওপর যে হারে বার্ষিক মুনাফা লাভ করে, সাধারণত, সেই হারেই ওই কোম্পানির শেয়ারমূল্য দীর্ঘমেয়াদি বাড়ে বা কমে।

উদাহরণ দিয়ে বলতে গেলে স্কয়ার ফার্মার কারখানা এবং অন্যান্য উৎপাদনশীল সম্পদগুলোতে যদি ওই কোম্পানির মোট ১,০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ থেকে থাকে এবং তা থেকে যদি সংস্থাটি প্রতিবছর ২০০ কোটি টাকা অপারেটিং মুনাফা বা নগদপ্রবাহ তৈরি করতে পারে, তবে স্কয়ার ফার্মার বিনিয়োজিত মূলধনের হার ২০০/১০০০ বা ২০%। এর অন্য নাম রিটার্ন অন ইনভেস্টটেড ক্যাপিটাল (আরওআইসি) বা মূলধন বিনিয়োগ থেকে আয়। তাই স্কয়ার ফার্মার শেয়ারহোল্ডার হিসেবে, আপনি দীর্ঘ মেয়াদে এই ২০% হারেই রিটার্ন পাওয়ার প্রত্যাশা করতে পারেন।

সুতরাং কোনো কোম্পানির শেয়ার কেনার আগে, বার্ষিক আর্থিক বিবরণী থেকে তার আরওআইসি হিসাব করে দেখে নেবেন (আয় বিবরণী থেকে পরিচালন মুনাফা নিয়ে তাকে নগদ ও বিনিয়োগ ছাড়া মোট সম্পদ দিয়ে ভাগ করে বের করে নেবেন)। আমি মনে করি যেসব কোম্পানির আরওআইসি বছরের পর বছর ১০%–এর কম, সেসব শেয়ার দীর্ঘ মেয়াদে ধরে রাখা ঠিক হবে না।

৩. কোম্পানির মূলধন ব্যবহার করার দক্ষতা

যে কোম্পানি তার মূলধন বেশির ভাগ অংশ বেশি লাভজনক প্রজেক্টে বিনিয়োগ করতে পারবে, তার শেয়ারহোল্ডাররা তত লাভবান হবেন। অন্যদিকে কোনো কোম্পানি যদি অনেক বেশি মূলধন স্বল্প লাভজনক প্রকল্পে বিনিয়োগ করে তবে তার মুনাফা এবং শেয়ারমূল্য খুব ভালো না করার সম্ভাবনা বেশি (উদাহরণ এসিআইয়ের ‘স্বপ্ন’ প্রকল্পের বিনিয়োগ)। যেসব ব্যাংক গত ১০ বছর মোবাইল ব্যাংকিং বা ডিজিটাল ব্যাংকিং প্রকল্পে বেশি মূলধন বিনিয়োগ করেছে তারা—যেসব ব্যাংক স্টক ব্রোকারেজ প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছে তাদের চেয়ে মুনাফা ও শেয়ারমূল্যের দিক থেকে অনেক ভালো করেছে।

সুতরাং, কোনো কোম্পানির শেয়ার কেনার আগে দেখতে হবে, তারা এখন কী ধরনের প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে, সেই প্রকল্পগুলো কি কম মূলধন ব্যবহার করে ভবিষ্যতে তুলনামূলক বেশি মুনাফা দিতে পারবে কি না। মনে রাখতে হবে যে কোম্পানি ধারাবাহিকভাবে বেশি লাভজনক প্রকল্পে বেশি বিনিয়োগ করতে পারবে, তারাই শেয়ারহোল্ডারদের সবচেয়ে বেশি রিটার্ন দিতে পারবে।

৪. শক্তিশালী ব্যালান্সশিট

সাধারণত যেসব কোম্পানির আর্থিক দেনা তার মোট সম্পদের তুলনায় অনেক বেশি হয় (৭০% বেশি), তার শেয়ারহোল্ডারদের পুঁজি হারানোর ঝুঁকি বেশি থাকে (যেমন কেয়া কসমেটিকস, বেশির ভাগ স্টিল রি-রোলিং মিল ইত্যাদি)। সুতরাং, এ ধরনের কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে।

৫. অতিমূল্যায়িত দামে শেয়ার না কেনা

অনেক বেশি দাম দিয়ে কিনলে, সবচেয়ে ভালো শেয়ার থেকেও তেমন ভালো ফল লাভ করা যায় না। তাই কোনো শেয়ার কেনার আগে দেখতে হবে তার মূল আয় অনুপাত বা প্রাইস টু আর্নিং রেশিও (ব্যাংকের ক্ষেত্রে প্রাইস টু বুক ভ্যালু রেশিও) কত এবং তা অন্যান্য কোম্পানির তুলনায় বা ওই কোম্পানির নিজের অতীতের গড় থেকে কতটা বেশি। মনে রাখতে হবে শেয়ারবাজারে তাড়াহুড়া করে সিদ্ধান্ত নিলে ভালো করা যায় না।

পুনশ্চ: লেখকের ব্যক্তিগত মতামত। উল্লিখিত সিকিউরিটিজগুলোতে, লেখকের ব্যবসায়িক স্বার্থ জড়িত থাকতে পারে।

বিজ্ঞাপন
প্র বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন