বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সম্ভাবনা থাকার পরও পর্যটন খাতকে কাজে লাগাতে পারছে না বাংলাদেশ। এর মধ্যে করোনা মহামারিতে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে পর্যটনশিল্প। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়াতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে এখনো বড় কোনো পরিকল্পনাও দেখা যাচ্ছে না। যদিও মহামারির সংক্রমণ কমায় দেশের অভ্যন্তরের পর্যটনকেন্দ্র খুলে দেওয়া হয়েছে।

ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের (ডব্লিউটিটিসি) তথ্যানুযায়ী, ২০১৯ সালে বৈশ্বিক জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান ছিল ১০ দশমিক ৪ শতাংশ বা ৯ লাখ ১৭ হাজার কোটি ডলার। পরের বছর সেটি কমে সাড়ে ৫ শতাংশ বা ৪ লাখ ৬৭ হাজার কোটি ডলার হয়েছে। আবার ২০১৯ সালে যেখানে বৈশ্বিক পর্যটন খাতে ৩৩ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান ছিল, সেখানে গত বছর করোনাকালে তা কমে ২৭ কোটিতে নেমে আসে। তার মানে বিশ্বব্যাপী পর্যটন খাতে ৬ কোটি ১৬ মানুষ চাকরি হারিয়েছে। তারপরও প্রতি ১১ জনের মধ্যে ১ জনের কর্মসংস্থান হয় পর্যটনশিল্পে।

ডব্লিউটিটিসির তথ্য অনুযায়ী ২০১৯ সালে পর্যটন খাতে বাংলাদেশে কর্মসংস্থান ছিল ১৮ লাখ ৫৯ হাজার মানুষের। গত বছর করোনায় সেটি কমে সাড়ে ১৪ লাখে নামে, যা দেশের মোট কর্মসংস্থানের ২ দশমিক ৩ শতাংশ। বাংলাদেশের পর্যটন খাতে বিদেশিদের তুলনায় দেশীয় মানুষের অবদানই বেশি। ২০১৯ সালে বিদেশি পর্যটকেরা এ দেশে তিন হাজার কোটি টাকা খরচ করেন। অন্যদিকে দেশীয় পর্যটকেরা খরচ করেন ৬৮ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। গত বছর করোনার কারণে বিদেশিদের খরচ ৫৯ শতাংশ এবং দেশীয় পর্যটকদের খরচ ৩৪ শতাংশ কমেছে।

জানতে চাইলে ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সভাপতি মো. রাফেউজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, করোনার ধাক্কা কাটিয়ে পর্যটন খাতকে চাঙা করতে হলে বিভিন্ন দেশের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ, করোনা পরিস্থিতিতে অনেক দেশই বাংলাদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে। তিনি আরও বলেন, ‘দেশের অভ্যন্তরে কক্সবাজার, কুয়াকাটা, সুন্দরবনসহ কয়েকটি স্পটেই কেবল পর্যটকেরা যান। তবে আমাদের দেশে পর্যটকদের জন্য ১ হাজার ৬৮টি গন্তব্য রয়েছে। সেসব জায়গায় যাতায়াত ও অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি ব্র্যান্ডিংও করতে হবে। মোদ্দা কথা হচ্ছে পর্যটনের বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে।’

পর্যটনকে এগিয়ে নিতে ১৯৯২ সালে প্রথম জাতীয় পর্যটন নীতিমালা করা হয়। এতে বলা হয়েছিল, বিদেশি পর্যটকদের জন্য আধুনিক ও চিত্তবিনোদনের সব সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করা হবে। কক্সবাজার ও সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে নেওয়া হবে মহাপরিকল্পনা। পর্যটন খাতের বিকাশে বার্ষিক ও পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে এগুলোর কিছুই হয়নি।

প্রথম জাতীয় পর্যটন নীতিমালা তৈরির ১৮ বছর পর ২০১০ সালে তা হালনাগাদ করা হয়। আগের নীতিমালায় যা ছিল, তার সবই রয়ে গেছে নতুন নীতিমালায়। এতে কক্সবাজার, টেকনাফ, সোনাদিয়া, সেন্ট মার্টিন ও কুয়াকাটা ঘিরে নানা পরিকল্পনার কথা বলা হয়। সিলেটের জাফলং, মাধবকুণ্ড, শ্রীমঙ্গল, লাউয়াছড়া, সুনামগঞ্জ ও সিলেটের হাওর, নেত্রকোনার বিরিশিরি, পদ্মা–মেঘনা–যমুনা নদীর তীরবর্তী আকর্ষণীয় স্পট ও পার্বত্য চট্টগ্রামসহ অন্যান্য পরিবেশে সংকটাপন্ন অঞ্চলে ইকো ট্যুরিজমের বিকাশে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে ইকো-লজ, ওয়াচ টাওয়ার, রোপওয়ে, ওয়াকওয়ে, নাইট-হাইকিংসহ অন্যান্য সুবিধা সৃষ্টি করা হবে।

কিন্তু নীতিমালা অনুযায়ী কেবল কক্সবাজারেই কিছু কাজ হয়েছে। কক্সবাজারের কলাতলী থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সমুদ্রের পাড়ে মেরিন ড্রাইভ সড়ক হয়েছে। চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ট্রেনলাইনের কাজ চলছে। কক্সবাজার বিমানবন্দর সম্প্রসারণের কাজ সম্প্রতি শুরু হয়েছে। তবে বাইরে অন্যান্য পর্যটনকেন্দ্রকে ঘিরে পরিকল্পিত কাজ খুব একটা চোখে পড়ছে না।

এক দশক আগে কক্সবাজারের টেকনাফের সাবরাংয়ে একটি বিশেষ পর্যটন অঞ্চল করার দায়িত্ব পেয়েছিল পর্যটন করপোরেশন। কিন্তু তারা ঢিমেতালে কাজ করছে। এখনো মাস্টারপ্ল্যানই তৈরি করতে পারেনি। শুধু জমির ধরন বা প্রকৃতি নির্ধারণ, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন ও মাপজোখ করতে করতেই তাদের পাঁচ বছর কেটে গেছে। ২০১৪ সালে এ পর্যটন অঞ্চলের দায়িত্ব পায় আরেক সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)। পর্যটন অঞ্চলটিকে ঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা করতে পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ ১৫ ফুট উঁচু বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান হোটেল-রিসোর্ট করার জন্য জমি ইজারা নিয়েছে।

পর্যটন সক্ষমতা সূচকের বাংলাদেশ অংশের গবেষকদের মধ্যে রয়েছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, পর্যটন খাতের বিকাশে পর্যটন করপোরেশন নানাভাবে বাধা সৃষ্টি করছে। ধীরে ধীরে সরকারের এ লোকসানি প্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধা বেসরকারি খাতে দিলে পর্যটন খাতের উন্নতি হবে।

সিপিডির এই গবেষক আরও বলেন, প্রকৃতিকে ঘিরেই বাংলাদেশের পর্যটন বিকাশিত হওয়ার সুযোগ আছে। তাই কোনোভাবেই পরিবেশের ক্ষতি করা যাবে না। বিদেশি পর্যটকদের দেশে আনতে বিশেষ কৌশল নিতে হবে। ভারত, থাইল্যান্ডসহ আশপাশের দেশগুলোতে বৈশ্বিক অনেক পর্যটক আসেন। সেই পর্যটকদের এক বা দুই দিনের জন্য নিয়ে আসার ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য অভ্যন্তরীণ নৌ যোগাযোগ উন্নত করার ওপর জোর দেওয়া উচিত।

বাংলাদেশের পর্যটন খাত

জিডিপিতে অবদান

২০১৯ ২.৭%

২০২০ ১.৭%

কর্মসংস্থানে পর্যটন খাতের অংশ

২০১৯ ২.৯%

২০২০ ২.৩%

বিদেশি পর্যটকেরা কত খরচ করেন

সাল খরচ (কোটি টাকা)

২০১৯ ৩,০০০

২০২০ ১,২০০

দেশি পর্যটকেরা কত খরচ করেন

সাল খরচ (কোটি টাকা)

২০১৯ ৬৮,৬০০

২০২০ ৪৫,৩০০

বিদেশি পর্যটক এসেছে যেসব দেশ থেকে

২০১৯ সাল ২০২০ সাল

ভারত ৫৩% ৬৪%

চীন ১৬% ১৬%

পাকিস্তান ৮% ১০%

যুক্তরাষ্ট্র ৭% ৫%

দক্ষিণ কোরিয়া ৫% ৫%

অন্যান্য দেশ ১১% ২%

বাংলাদেশি পর্যটকেরা যেসব দেশে গেছেন

২০১৯ সাল ২০২০ সাল

ভারত ৫৯% ৬৬%

সৌদি আরব ৮% ৯%

সংযুক্ত আরব আমিরাত ৩%

মালয়েশিয়া ৫%

থাইল্যান্ড ৪% ২%

কুয়েত ৩% ৩%

অন্যান্য দেশ ২০% ১৭%

সূত্র: ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিল (ডব্লিউটিটিসি)

প্র বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন