default-image

করোনাভাইরাসের কারণে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট মোকাবিলায় সরকার যে ১ লাখ ১১ হাজার ১৩৭ কোটি টাকার ২০টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, সেগুলোর কোনো কোনোটি শতভাগ বাস্তবায়িত হয়ে গেছে। কিছু প্যাকেজের বাস্তবায়ন অবশ্য শুরুই হয়নি।

কিছু প্যাকেজ বাস্তবায়িত হচ্ছে ব্যাংক খাতের মাধ্যমে, আর কিছু হচ্ছে মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মাধ্যমে। ব্যাংক খাতের প্যাকেজ থেকে বড় ব্যবসায়ীরা ঋণ নিতে পারলেও ক্ষুদ্র, মাঝারি ও ছোট উদ্যোক্তারা নিতে পারছেন সামান্যই। ওদিকে স্বাস্থ্য খাতে দেওয়া প্রণোদনা চলছে ধীরগতিতে। শুরু হয়নি কর্মসৃজন কার্যক্রমের বিপরীতে ঋণ। এই হলো করোনা মোকাবিলায় নেওয়া তহবিলগুলোর সার্বিক অবস্থা।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ গত ১৭ আগস্ট প্যাকেজগুলোর হালনাগাদ চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি প্রতিবেদন পাঠিয়েছে।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর এ নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, বড়রা সব সময়ই ঋণে আগ্রহী। এর সুফল পাচ্ছে পোশাক খাত। তবে ক্ষুদ্র ও মাঝারিদের নিয়ে কারও নজর নেই। আসলে যে সুদ বেঁধে দেওয়া হয়েছে, তাতে খরচ উঠছে না। এ জন্য ব্যাংকগুলো আগ্রহী নয়। এদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। কারণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারিরাই সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে।

বিজ্ঞাপন

করোনাভাইরাসের কারণে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার করতে সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের মধ্যে সবচেয়ে বড়টি হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও সেবা খাতের জন্য। এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য শুরুর দিকে ৩০ হাজার কোটি টাকা চলতি মূলধন ঘোষণা দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা দাঁড়িয়েছে এখন ৩৩ হাজার কোটি টাকায়।

৩১ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ১ হাজার ৭৮৬টি প্রতিষ্ঠানের ২৩ হাজার ১৭৯ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন হয়েছে। এ প্যাকেজের আওতায় ৯ শতাংশ সুদের মধ্যে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান দেবে, বাকিটা বহন করবে সরকার। গত ৪ মে থেকে এই প্যাকেজ বাস্তবায়ন শুরু হয়।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে সোনালী ব্যাংক এক হাজার কোটি টাকা দিয়েছে এ প্যাকেজ থেকেই। এ ছাড়া বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি ১১৫ কোটি, সিটি সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ ৫০ কোটি, আবুল খায়ের স্টিল ৩৫ কোটি টাকা পেয়েছে। চলতি মূলধন ঋণের ৩০ শতাংশ পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে, তাই বেশির ভাগই ৫০ কোটি টাকার নিচে।
প্রণোদনা প্যাকেজের মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকারটি দ্বিতীয় বৃহত্তম। ক্ষুদ্র (কুটিরশিল্পসহ) ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর চলতি মূলধন দিতে গঠন করা হয়েছে এটি। এর সুদহারও ৯ শতাংশ, তবে গ্রাহকদের সুদের ভাগ ৪ শতাংশ। বাকি ৫ শতাংশের বহনকারী সরকার।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত তথ্য হচ্ছে, ৬ হাজার ২০০ প্রতিষ্ঠান ঋণ পেয়েছে ১ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। মোট ৫৩ হাজার কোটি টাকার দুই প্যাকেজের এই হলো সংক্ষিপ্ত চিত্র।
বিজ্ঞাপন

যেগুলোর বাস্তবায়ন ভালো

রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীদের এপ্রিল-জুন সময়ের বেতন-মজুরি দিতে প্রথম গঠিত এই প্যাকেজ ছিল ৫ হাজার কোটি টাকার। ২ শতাংশ সার্ভিস চার্জের মাধ্যমে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে কারখানার মালিকেরা ঋণ নিয়ে বেতন-মজুরি দিয়েছেন। তবে জুন মাসের বেতন-মজুরি দেওয়ার আগেই টাকা শেষ হয়ে যায়। তহবিলের আকার আরও ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বাড়ানো হয়। এ টাকায়ও না কুলালে আরও দেওয়া হয় ৩ হাজার কোটি টাকা।

রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) সুবিধা ৩৫০ কোটি মার্কিন ডলার থেকে ৫০০ কোটি ডলারে উন্নীত করা হয়। ফলে অতিরিক্ত যোগ হয় ১৫০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ ১২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা। ৫৬টি ব্যাংকের মাধ্যমে এ থেকে গত ৩১ জুলাই পর্যন্ত ১ হাজার ১০৯টি ঋণ আবেদন অনুমোদিত হয়েছে। বিতরণ করা হয়েছে ৭৬ কোটি ৫২ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার।

১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রি বাবদ ২৫১ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। এই প্যাকেজের আওতায় করোনাভাইরাসে ক্ষতিগ্রস্ত নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৩ মাসে ৭৪ হাজার ৮০০ টন চাল দেওয়ার কাজ শেষ করেছে খাদ্য অধিদপ্তর।

বিজ্ঞাপন

বাস্তবায়নের করুণ দশা

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ‘প্রাক্জাহাজীকরণ ঋণ পুনঃ অর্থায়ন কর্মসূচি’ নামক প্যাকেজে রাখা হয় ৫ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংককে নতুন এই ঋণ কর্মসূচি চালু করতে বলা হয় ৭ শতাংশ সুদে। এর বাস্তবায়ন শুরু হয় ১৩ এপ্রিল থেকে। কিন্তু এ থেকে পুনঃ অর্থায়ন নিতে আবেদন জমা পড়েছে মাত্র একটি। অথচ ৩০টি ব্যাংক পুনঃ অর্থায়ন নিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে।
এদিকে ৫ হাজার কোটি টাকার কৃষি পুনঃ অর্থায়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন চিত্রও ভালো নয়। ব্যাংকব্যবস্থার মাধ্যমে করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষি খাতকে সহায়তা দিতে এ তহবিল গঠন করা হয়। কৃষক পর্যায়ে সুদ ৪ শতাংশ। বাকি ৫ শতাংশের বহনকারী সরকার। ৭ আগস্ট পর্যন্ত ৪৯৭ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে বেশি দিয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক।

নিম্ন আয়ের পেশাজীবী, কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য রয়েছে ৩ হাজার কোটি টাকা তহবিল। বাংলাদেশ ব্যাংক ১ শতাংশ সুদে ব্যাংকগুলোকে ঋণ দিচ্ছে। আর ব্যাংকগুলো ৩ দশমিক ৫ শতাংশ সুদে দিচ্ছে ক্ষুদ্র ঋণ সংস্থার অনুমোদিত ক্ষুদ্র ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে (এফএফআই)। এ পর্যন্ত ২৬৬ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। তবে কত কৃষক বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ঋণ পেয়েছেন, সে তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থ বিভাগকে জানাতে পারেনি।

এমএফআইগুলোকে ঋণ দেওয়ার ব্যাপারে ব্যাংক রক্ষণশীল কি না, জানতে চাইলে অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস-উল-ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘মোটেও তা নয়। যোগ্য এমএফআইকে ঋণ দেওয়ার জন্য আমরা বসে আছি।’
বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ২০২০ সালের এপ্রিল-মে মাসে স্থগিতকৃত ঋণের আংশিক সুদ মওকুফ বাবদ সরকারের ভর্তুকি হিসেবে একটি প্যাকেজ রয়েছে ২ হাজার কোটি টাকার। এ পর্যন্ত ৪৭টি আবেদন জমা পড়লেও কেউ টাকা পায়নি।

বিজ্ঞাপন
ক্ষতিপূরণের আবেদন এলে যাচাই-বাছাই করে সেগুলো অর্থ বিভাগে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
আবদুল মান্নান, সচিব, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ

স্বাস্থ্যের স্বাস্থ্য খারাপ

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত দুটি প্যাকেজ রয়েছে। একটি হচ্ছে, কোভিড–১৯–এর কারণে সরাসরি কাজে নিয়োজিত সরকারি কর্মচারীদের সংক্রমিত বা মৃত্যুর ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ। এ জন্য প্রণোদনা বাবদ ৭৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
সরাসরি কোভিড–১৯–এর সময়ে কাজের সঙ্গে জড়িত থেকে যেসব সরকারি কর্মচারী সংক্রমিত বা মৃত্যুবরণ করেন, গ্রেডভেদে তাঁরা আক্রান্তের ক্ষেত্রে ৫ লাখ থেকে ১০ লাখ এবং মারা যাওয়ার ক্ষেত্রে ২৫ লাখ থেকে ৫০ লাখ টাকা পাবেন। এ পর্যন্ত এক কোটি টাকা পেয়েছে দুটি পরিবার।

চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী যাঁরা চিকিৎসাকাজে সরাসরি নিয়োজিত, তাঁদের জন্য ১০০ কোটি টাকার একটি প্যাকেজ রয়েছে। বলা হয়েছে, দুই মাসের মূল বেতনের সমান সম্মানী পাবেন। এ থেকে কেউ কোনো টাকা পাননি।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আবদুল মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, ‘ক্ষতিপূরণের আবেদন এলে যাচাই-বাছাই করে সেগুলো অর্থ বিভাগে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আর সম্মানীর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।’

কর্মসৃজন কার্যক্রম শুরুই হয়নি

এই প্যাকেজ ২ হাজার কোটি টাকার। কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, কুটিরশিল্প, বিদেশফেরত শ্রমিকদের চারটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঋণ দেওয়া হবে। ৫০০ কোটি টাকা করে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক, প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক এবং পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনকে (পিকেএসএফ) টাকা দেবে সরকার। তারা স্বল্প সুদে গ্রাহকদের ঋণ দেবে। পিকেএসএফ ও অন্য তিন ব্যাংক ২৫০ কোটি করে ১ হাজার কোটি টাকা পেয়েছে। প্রতিবেদন বলছে, এ থেকে বিতরণ কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি।

বিজ্ঞাপন

অন্যগুলোর অবস্থা

৫০ লাখ দরিদ্র পরিবারকে আড়াই হাজার টাকা করে দিতে ১ হাজার ২৫৮ কোটি টাকার প্যাকেজ রয়েছে। ১৫ লাখ পরিবার এখনো টাকা পায়নি। এর বাস্তবায়নের দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের। বিনা মূল্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণের জন্য ২ হাজার ৫০৩ কোটি টাকার একটি প্যাকেজ রয়েছে, যা থেকে ৯৪৪ কোটি টাকার চাল, ৯৫ কোটি টাকার নগদ এবং ২৭ কোটি টাকার শিশুখাদ্য বিতরণ করা হয়েছে।

কৃষকের উৎপাদিত ধান-চালের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে এবং বাজারে চালের দাম স্থিতিশীল রাখতে সরকারি সংগ্রহ ও বিতরণ লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে ২ লাখ টন। এতে ৮৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ৭০ হাজার টন কেনা হয়েছে

বলে অর্থ বিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
অর্থ বিভাগ এখন থেকে প্রতি মাসেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্যাকেজগুলোর অগ্রগতি চিত্র তুলে ধরবে।

করোনায় যে অর্থনৈতিক ক্ষত হচ্ছে, তা থেকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে এক বছর সময় লেগে যাবে। করোনার কারণে আমরা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছি, সবাই খরচ সমন্বয়ের চেষ্টা করছে।
আবুল কাসেম খান, বিল্ড ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন

সার্বিকভাবে জানতে চাইলে বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন ও এ কে খান অ্যান্ড কোম্পানির পরিচালক আবুল কাসেম খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘করোনায় যে অর্থনৈতিক ক্ষত হচ্ছে, তা থেকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে এক বছর সময় লেগে যাবে। করোনার কারণে আমরা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছি, সবাই খরচ সমন্বয়ের চেষ্টা করছে। এ কারণে বড়দের আরও সহায়তা লাগবে। আর এসএমই খাত ও ক্ষুদ্রদের জন্য যে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এসব খাত এমনিতেই ঋণবঞ্চিত। এ জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তদারকি বাড়াতে হবে।’

মন্তব্য পড়ুন 0