default-image

এখনো ব্যাংক খাতই প্রধান ভরসা

আপনি প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ আয় করেন। চাকরি করলে বোনাস মিলে, ব্যবসাতেও অনেক সময় লক্ষ্যের বেশি মুনাফা হয়। আবার প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ খরচও থাকে। এর মধ্যে থেকেই ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করতে হয়। আবার চাইলে বিনিয়োগও করতে পারেন। সবই ভবিষ্যতের জন্য।

কিন্তু গত এপ্রিলে ব্যাংকঋণের সুদহার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। ফলে আমানতের সুদের হার সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে এসেছে। তবে সুদের চেয়ে বড় বিষয় হলো টাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

কিন্তু বাংলাদেশে সঞ্চয় বা বিনিয়োগের জন্য খুব বেশি দরজা খোলা নেই। থাকলেও এসব থেকে ভালো মুনাফা পাওয়া যায় না। সঞ্চয়পত্রে যৌথভাবে এক কোটি টাকার বেশি রাখা যায় না। দেশের শেয়ারবাজারও টালমাটাল। তাই দিন শেষে ব্যাংক খাতই প্রধান ভরসা।

কিন্তু গত এপ্রিলে ব্যাংকঋণের সুদহার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। ফলে আমানতের সুদের হার সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে এসেছে। তবে সুদের চেয়ে বড় বিষয় হলো টাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সময়মতো ফেরত পাওয়া। আগে একসময় ব্যাংকে টাকা রাখলে ৯ বছরে টাকা ৩ গুণ হয়ে যেত। আমানতের সুদহার ছিল ১৪ শতাংশ পর্যন্ত। এখন সেই পরিস্থিতি নেই। অনেক ব্যাংক দীর্ঘমেয়াদি আমানত নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।

আজ আমরা কয়েকটি ব্যাংকের আমানতের সুদহারের তথ্য তুলে ধরব। আপনি নিজ উদ্যোগে ব্যাংকগুলোর ওয়েবসাইটে গিয়েও সুদের তথ্য দেখতে পারেন। আর কোথায় সঞ্চয় বা বিনিয়োগ করবেন, সে সিদ্ধান্ত একান্তই আপনার।

বিজ্ঞাপন
default-image

বেসরকারি খাতের দি সিটি ব্যাংক ৬ মাস থেকে ৫ বছরের স্থায়ী আমানতে ৪ শতাংশ সুদ দেয়। বিমা সুবিধা আছে এমন আমানতে সুদ দেয় ৭ শতাংশ পর্যন্ত। ইস্টার্ন ব্যাংকের আমানতের সুদহার সর্বোচ্চ সাড়ে ৪ শতাংশ। একসময় আমানতে সাড়ে ১০ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিত, যা এখন বন্ধ হয়ে গেছে।
বেসরকারি খাতে ঢাকা ব্যাংকে সাড়ে ৫ শতাংশ পর্যন্ত সুদ পাওয়া যাচ্ছে। ১১ বছর ৬ মাসে টাকা দ্বিগুণ করা যাচ্ছে।

ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ১০ বছর ৬ মাসে টাকা দ্বিগুণ করছে। আর যমুনা ও পূবালী ব্যাংকে টাকা দ্বিগুণ হচ্ছে ১০ বছরে। আর ১৫ বছর ৯ মাসে টাকা ৩ গুণ করছে যমুনা ব্যাংক। তবে নতুন প্রজন্মের ব্যাংকগুলোতে আমানতের সুদ কিছুটা বেশি। আর সরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর সুদহার কম।

সুদহার কমায় আমানতকারীরা টাকা কম পাচ্ছে। এরপরও বিভিন্ন পণ্য রয়েছে, যেখানে সুদহার বেশি। গ্রাহকেরা যদি জেনেশুনে টাকা জমা রাখেন, তাহলেই ভালো।
ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরফান আলী

এদিকে ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে টাকা রেখে এখনো কিছুটা বেশি মুনাফা মিলছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইপিডিসি গ্রাহকদের ৮ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা দিচ্ছে। আইডিএলসি মুনাফা দিচ্ছে সাড়ে ৭ শতাংশ পর্যন্ত। ৯ বছর ৭ মাসে টাকা দ্বিগুণ ও ১৫ বছর ২ মাসে টাকা ৩ গুণ টাকা ফেরত দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। লঙ্কাবাংলা ফাইন্যান্স সাড়ে ৮ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিচ্ছে।

দেশে ৫৯টি ব্যাংক ও ৩৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করছে। একেক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানত পণ্যও ভিন্ন।

এ নিয়ে জানতে চাইলে ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরফান আলী প্রথম আলোকে বলেন, সুদহার কমায় আমানতকারীরা টাকা কম পাচ্ছে। এরপরও বিভিন্ন পণ্য রয়েছে, যেখানে সুদহার বেশি। গ্রাহকেরা যদি জেনেশুনে টাকা জমা রাখেন, তাহলেই ভালো।

default-image

বিমা কোম্পানিতেও সঞ্চয় করা যায়

সুদের হার কমায় ব্যাংকে স্থায়ী আমানত (এফডিআর) এখন আগের চেয়ে অনাকর্ষণীয়। আগের চেয়ে কড়াকড়ি হলেও মানুষ সঞ্চয়পত্রমুখী। কিন্তু সঞ্চয়পত্রে টাকা রাখার পরও মানুষের হাতে অতিরিক্ত সঞ্চয় থাকতে পারে। সে হিসাবে জীবন বীমা কোম্পানিতেও টাকা রাখার কথা চিন্তা করতে পারেন তাঁরা।

বেশির ভাগ বিমা কোম্পানিরই রয়েছে একক (সিঙ্গেল) প্রিমিয়াম পলিসি। এককালীন এক লাখ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ যেকোনো পরিমাণ টাকা এই পলিসিতে রাখা যায়। পলিসির মেয়াদ শেষে ব্যাংকের মতোই এককালীন টাকা পাওয়া যায়।

তবে ব্যাংকের এফডিআরের সঙ্গে একক প্রিমিয়াম পলিসির পার্থক্য রয়েছে। এফডিআর থেকে মাসিক সুদ যেমন নেওয়া যায়, মেয়াদ শেষে সুদসহ পুরো টাকাও নেওয়া যায়। এফডিআরের বিপরীতে ঋণও নেওয়া যায় ব্যাংক থেকে। আর একক প্রিমিয়াম পলিসির ক্ষেত্রে মুনাফাসহ টাকা তো বটেই, পলিসি সুবিধাও পাওয়া যায়। তিন বছর পর অনেক বিমা কোম্পানি বোনাসও দেয় গ্রাহককে।

একক প্রিমিয়াম পলিসিকে অবশ্য একেক জীবনবিমা কোম্পানি একেক নাম দিয়েছে। কেউ বলছে টার্ম পলিসি, যেগুলো ৫ থেকে ১০ বছর মেয়াদি। আবার কারও রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি (লং টার্ম) পলিসি। এগুলো ১০ থেকে ১৫, এমনকি ২০ বছর মেয়াদিও রয়েছে।

বিমা খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের সব এমএলএম কোম্পানি এখন বন্ধ। অনেক সমবায় সমিতির বিরুদ্ধেও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। আবার কোন সমবায় সমিতি কেমন, তা যাচাইয়েরও সুযোগ থাকে না অনেক সময়। মানুষের থেকে টাকা নিয়ে হঠাৎ হঠাৎ সমিতির লোকেরা উধাও হয়ে যাচ্ছেন।

ফলে সময় এখন বিমা খাতের। দেশে বিমা খাতের শক্তিশালী কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা ছিল না একসময়। ছিল বিমা অধিদপ্তর নামে একটি সংস্থা। ২০১০ সালে আইন করে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা (আইডিআরএ) গঠন করে সরকার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে পুরো খাতটিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আওতায় নিয়ে আসে।

আইডিআরএর চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন বলেন, আইডিআরএ গ্রাহকবান্ধব। কোনো কোম্পানি টাকা পরিশোধ করতে না চাইলে গ্রাহকেরা আইডিআরএর কাছে আসতে পারেন। আইডিআরএ তখন ব্যবস্থা নেবে, যা খুব একটা নিতে পারত না বিলুপ্ত বিমা অধিদপ্তর।

বিজ্ঞাপন
default-image

বিনিয়োগ করতে পারেন বিল-বন্ডেও

সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়, আবার বিল ও বন্ডের মাধ্যমেও অর্থ সংগ্রহ করে। এদিকে ব্যাংকগুলোও বন্ড ছেড়ে বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করে। এই বিল ও বন্ডও হতে পারে আপনার বিনিয়োগের অন্যতম জায়গা। শিগগিরই এসব বিল ও বন্ড কেনা যাবে ব্যাংকগুলোর শাখা থেকে। বর্তমানে অন্য ব্যাংকের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকে হিসাব খুলে এই বিল ও বন্ড কেনা যায়। এসব বন্ডে বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্য মুনাফায় কর ছাড়ও রয়েছে।

বিভিন্ন মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদ ৪ দশমিক ১১ থেকে ৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ পর্যন্ত। আর বিলের সুদ ১ দশমিক শূন্য ৭ থেকে ৩ দশমিক ১৫ শতাংশ।

এদিকে রাষ্ট্রমালিকানাধীন অগ্রণী ব্যাংক সম্প্রতি ‘অগ্রণী মুদারাবা সঞ্চয়ী বন্ড’ নামে নতুন বন্ড ছেড়েছে। এ বন্ডে বিনিয়োগের মেয়াদ ৫ ও ৮ বছর।

সরকারের ইস্যু করা বিল এবং বন্ডকে ট্রেজারি বিল ও ট্রেজারি বন্ড বলা হয়। কোনো বিনিয়োগকারী যেকোনো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকে ‘সিকিউরিটিজ হিসাব’ খুলে ১ লাখ টাকা বা তার গুণিতক যেকোনো অঙ্ক বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করতে পারেন। নির্দিষ্ট সময় অন্তর বাংলাদেশ ব্যাংকে নিলাম হয়। এটি প্রাথমিক বাজার। ব্যক্তি বিনিয়োগকারীরা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় প্রাথমিক বা সেকেন্ডারি বাজার থেকে বিল বা বন্ড কিনতে পারেন। তবে বিল ও বন্ডে সাধারণ বিনিয়োগকারী নেই বললেই চলে। মূলত ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো এসব বিল-বন্ডে বিনিয়োগ করেছে।

বর্তমানে তিন মেয়াদের ট্রেজারি বিল ও পাঁচ মেয়াদের ট্রেজারি বন্ড প্রচলিত আছে। ট্রেজারি বিলের মেয়াদ ৯১ দিন, ১৮২ দিন ও ৩৬৪ দিন। ট্রেজারি বন্ড ২,৫, ১০,১৫ ও ২০ বছর মেয়াদি।

এদিকে রাষ্ট্রমালিকানাধীন অগ্রণী ব্যাংক সম্প্রতি ‘অগ্রণী মুদারাবা সঞ্চয়ী বন্ড’ নামে নতুন বন্ড ছেড়েছে। এ বন্ডে বিনিয়োগের মেয়াদ ৫ ও ৮ বছর। ৫ বছরে সুদ সাড়ে ৬ শতাংশ ও ৮ বছরে সাড়ে ৭ শতাংশ। অগ্রণী ব্যাংকের যেকোনো শাখা, উইন্ডো ও বিদেশের এক্সচেঞ্জ হাউসের মাধ্যমে এই বন্ড কেনা যায়।

মন্তব্য করুন